ডিআরডিএলে আরঅ্যান্ডডি-এর গতি সঞ্চারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক, কারিগরি ও প্রযুক্তিগত সমস্যাগুলোর ব্যাপারে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন হয়ে পড়েছিল। আমার ক্যারিয়ার জুড়ে আমি বৈজ্ঞানিক বিষয়ে খোলামেলা নীতি অনুসরণ করেছি। ম্যানেজমেন্ট রুদ্ধদ্বার আলোচনা ও গোপন বৈঠক করে যেসব সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের চেষ্টা করেছে, আমি খুব কাছ থেকে তার ক্ষয় দেখতে পেয়েছি। আমি এ ধরনের চেষ্টার বিরোধীতা করেছি সবসময়। সুতরাং প্রথম যে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত আমরা নিয়েছিলাম তা হলো সিনিয়র বিজ্ঞানীদের নিয়ে একটা ফোরাম গঠন করা, যে ফোরামে যৌথ উদ্যোগ হিসাবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা ও বিতর্ক হবে। এভাবে ডিআরডিএলের মধ্যেই একটা উঁচু পর্যায়ের বডি গঠন করা গেল, যাকে বলা হলো মিসাইল টেকনোলজি কমিটি। এর ফলে ম্যানেজমেন্টের গবেষণাগারের কর্মতৎপরতার মধ্যে টেনে আনা গেল মধ্য স্তরের বিজ্ঞানী ও প্রকৌশলীদের।
অনেক দিনের বিতর্ক ও অনেক সপ্তাহের চিন্তাভাবনা শেষ পর্যন্ত সর্বোচ্চ পর্যায়ে পরিণত হলো দীর্ঘমেয়াদী গাইডেড মিসাইল ডেভলপমেন্ট প্রোগ্রাম। কোথাও আমি পড়েছিলাম, কোথায় যাচ্ছ তা জান। দুনিয়ার সবচেয়ে বড়ো কাজ এ নয় কোথায় আছি তা জানা, আসল ব্যাপার হলো আমরা কোথায় যাচ্ছি। দেশীয় মিসাইল উৎপাদনের জন্য একটা স্পষ্ট ও সুনির্ধারিত মিসাইল কর্মসূচি তৈরি করতে আমার সভাপতিত্বে একটা কমিটি গঠিত হলো। এর সদস্য ছিলেন জেডপি মার্শাল, ভারত ডাইনামিকস লিমিটেডের তৎকালীন প্রধান, এনআর আয়ার, একে কাপুর ও কেএস ভেঙ্কটরমন। ক্যাবিনেট কমিটি ফর পলিটিক্যাল অ্যাফেয়ার্স (সিসিপিএ)-এর পর্যবেক্ষণের জন্য আমরা একটা খসরা তৈরি করলাম। এই খসরা চূড়ান্ত করা হয়েছিল তিন প্রতিরক্ষা বাহিনীর প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনার পর। আমরা খরচের হিসাব ধরেছিলাম প্রায় ৩৯০ কোটি রূপি, বারো বছর সময়কালের জন্য। ডেভলপমেন্ট প্রোগ্রাম অধিকাংশ সময় আটকা পড়ে থাকে অর্থের অভাবে। আমরা অর্থ চেয়েছিলাম দুটো ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির জন্য একটা লো-লেভেল কুইক রিঅ্যাকশন ট্যাকটিক্যাল কোর ভেহিকল এবং একটা মিডিয়াম রেঞ্জ সারফেস-টু-সারফেস উইপন সিস্টেম। আমরা একটা মাল্টি-টার্গেট হ্যান্ডলিং ক্ষমতাসম্পন্ন মাঝারি পাল্লার সারফেস-টু-এয়ার ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির পরিকল্পনা করেছিলাম দ্বিতীয় পর্যায়ে। ডিআরডিএল পরিচিত ছিল ট্যাংকবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির ক্ষেত্রে অগ্রদূতের ভূমিকা পালনের জন্য। আমরা প্রস্তাব করলাম ফায়ার-অ্যান্ড-ফরগেট ক্ষমতাসম্পন্ন একটা তৃতীয় প্রজন্মের ট্যাংকবিধ্বংসী গাইডেড মিসাইল তৈরি করার। এই প্রস্তাবে খুশি ছিল আমার সমস্ত সহকর্মী। তারা দেখতে পেল, নতুন উদ্যমে কর্মতৎপরতা শুরু করার এটা একটা সুযোগ। তবে আমি পুরোপুরি সন্তুষ্ট ছিলাম না। আমার আকাঙ্ক্ষা ছিল রি-এন্ট্রি এক্সিপেরিমেন্ট লঞ্চ ভেহিকল (আরইএক্স)-এর স্বপ্ন পুনরুজ্জীবিত করা। আমার সহকর্মীদের পরামর্শ দিলাম তাপ-নিরোধক ডিজাইনে ব্যবহারের জন্য ডাটা তৈরির একটা টেকনোলজি ডেভলপমেন্ট প্রকল্প গ্রহণ করতে। ভবিষ্যতে দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির ক্ষমতা গড়ে তোলার জন্য প্রয়োজন ছিল এই তাপনিরোধক।
.
সাউথ ব্লকে আমি পরিকল্পনা উপস্থাপনার একটা আয়োজন করলাম। এতে সভাপতিত্ব করলেন সেই সময়ের প্রতিরক্ষা মন্ত্রী আর ভেঙ্কটরমন এবং উপস্থিত ছিলেন তিন বাহিনীর প্রধানরা: জেনারেল কৃষ্ণ রাও, এয়ার চিফ মার্শাল দিলবাগ সিং এবং অ্যাডমিরাল ডসন। কেবিনেট সচিব কৃষ্ণ রাও সাহিব, প্রতিরক্ষা সচিব এসএম ঘোষ ও সচিব (ব্যয়) আর গণপতিও উপস্থিত ছিলেন। সবাইকেই মনে হচ্ছিল সব রকম সন্দেহে ভুগছেন আমাদের সামর্থ্য সম্পর্কে, চাহিদা অনুযায়ী প্রযুক্তিগত অবকাঠামোর প্রাপ্তিসাধ্যতা ও সাধনযোগ্যতা সম্পর্কে, টিকে থাকার সক্ষমতা, সময়সূচি ও ব্যয় সম্পর্কে। ড. অরুণাচলম পুরো প্রশ্নোত্তর পর্বে পাথরের মতো শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন আমার পাশে। যদিও কয়েকজন আমাদের উচ্চাকাঙ্খী প্রস্তাব নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন, তবুও প্রত্যেকেই, এমনকি সন্দেহবাদীরাও ভারতের মিসাইল সিস্টেমের কল্পনায় উদ্দীপনা অনুভব করেছিলেন। অনুষ্ঠান শেষে প্রতিরক্ষা মন্ত্রী ভেঙ্কটরমন প্রায় তিন ঘন্টা পর সন্ধ্যায় তার সঙ্গে আমাদের দেখা করতে বললেন।
মধ্যবর্তী সময়টা আমরা গাণিতিক বিন্যাস ও সংখ্যার রাশি সৃষ্টির কাজ করে কাটালাম। তারা যদি মাত্র ১০০ কোটি রুপি মঞ্জুর করে, তাহলে ওই অর্থ আমরা বন্টন করব কীভাবে? ধরা যাক, তারা আমাদের ২০০ কোটি রুপি দিল, তাহলে আমরা কী করব? প্রতিরক্ষা মন্ত্রীর সঙ্গে সন্ধ্যা বেলায় আমরা সাক্ষাৎ করলাম। আমার একটা অনুমান ছিল যে, যত অংকেরই হোক আমরা কিছু তহবিল পাব। কিন্তু তিনি যখন পরামর্শ দিলেন, মিসাইল তৈরি না করে আমরা একটা ইন্টিগ্রেটেড গাইডেড মিসাইল ডেভলপমেন্ট প্রোগ্রাম চালু করব, তখন আমাদের কানকেও আমরা বিশ্বাস করতে পারছিলাম না।
প্রতিরক্ষামন্ত্রীর পরামর্শে আমরা একেবারে বোবাকালা হয়ে গিয়েছিলাম। দীর্ঘ বিরতির পর ড. অরুণাচলম উত্তর দিলেন, আমরা পুনরায় চিন্তা করে আপনার সঙ্গে দেখা করার আর্জি জানাচ্ছি, স্যার!
