১৯৮২ সালের ১ জুন তারিখে আমি যোগদান করলাম ডিআরডিএলে। শীঘ্রই উপলব্ধি করলাম যে এই গবেষণাগার এখনও ডেভিল মিসাইল প্রজেক্টের উপসংহারেই তাড়িত হয়ে আছে। অনেক উৎকর্ষসম্পন্ন প্রফেশনাল তখনও হতাশা কাটিয়ে উঠতে পারেনি। বিজ্ঞানীর কাজের নাড়ি হঠাৎ ছিঁড়ে গেলে তার যেমন লাগে। ডিআরডিএলে সাধারণ মেজাজ আর কাজের ছন্দ আমার মনে পড়িয়ে দিয়েছিল স্যামুয়েল টেইলর কোলরিজ-এর কবিতা The Rime of the Ancient Mariner:
Day after day, day after day.
We stuck, nor breath, nor motion;
As idle as a painted ship.
Upon a painted ocean.
আমি দেখলাম আমার সিনিয়র সহকর্মীরা প্রায় সবাই মুখ থুবড়ে পড়া আশার যন্ত্রণা নিয়ে জীবনযাপন করছে। একটা ব্যাপক ধারণা ছিল যে, এই গবেষণাগারের বিজ্ঞানীরা প্রতারিত হয়েছে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র কর্মকর্তাদের দ্বারা। আমার কাছে এটা পরিষ্কার হয়ে গেল যে, আশা ও ভবিষ্যৎ দৃষ্টি জাগিয়ে তুলতে হলে ডেভিল কে অবশ্যই কবর দিতে হবে।
যখন প্রায় এক মাস পর তঙ্কালীন নৌবাহিনী প্রধান অ্যাডমিরাল ওএস ডসন ডিআরডিএল সফরে এলেন, তখন সেটাকে আমি দলে যুক্তি প্রতিষ্ঠার একটা সুযোগ হিসাবে ব্যবহার করলাম। ট্যাকটিক্যাল কোর ভেহিকল (টিসিভি) প্রকল্প বেশ কিছুদিন ধরে আগুনের ওপর ঝুলছিল। সাধারণ সাবসিস্টেমসহ এটা ছিল সিঙ্গল কোর ভেহিকল। সামরিক বাহিনীর চাহিদা ছিল একটা কুইক রিঅ্যাকশন সারফেস টু-এয়ার মিসাইল, একটা অ্যান্টি-রেডিয়েশন এয়ার-টু-সারফেস মিসাইল যা নিক্ষেপ করা যাবে হেলিকপ্টার অথবা ফিক্সড উইং এয়ারক্র্যাফট থেকে। অ্যাডমিরাল ডসনের কাছে আমি জোরালভাবে কোর ভেহিকলের ভূমিকা তুলে ধরলাম। আমি শুধু এর কারিগরি জটিলতাই ব্যাখ্যা করলাম তা নয়, যুদ্ধক্ষেত্রে এর সামর্থ্যও ব্যাখ্যা করলাম; এবং আমি হাইলাইট করলাম উৎপাদন পরিকল্পনা। আমার নতুন সহযোগীদের কাছে বার্তাটা ছিল স্পষ্ট ও পরিষ্কার এমন কোনো কিছু তৈরি কর না যা তুমি বিক্রি করতে পারবে না পরে, এবং শুধু একটা জিনিস তৈরি করেই জীবন খরচ কর না। মিসাইল নির্মাণ একটা বহুমাত্রিক ব্যাপার তুমি যদি একটা মাত্রাতেই থেকে যাও দীর্ঘকাল, তাহলে তুমি নিশ্চল হয়ে যাবে।
ডিআরডিএলে আমার প্রথম কয়েক মাস ছিল ব্যাপকভাবে মিথস্ক্রিয়ামূলক। আমি সেন্ট জোসেফ’স-এ পড়েছিলাম যে, একটা ইলেকট্রন একটা ক্ষুদ্র কণা কিংবা ঢেউ হিসাবেও মনে হতে পারে, এটা নির্ভর করে ওই ইলেকট্রনের দিকে তুমি কীভাবে তাকাচ্ছ তার ওপর। তুমি যদি একটা ক্ষুদ্র প্রশ্ন কর, ওটা তোমাকে একটা ক্ষুদ্র উত্তর দেবে; তুমি যদি ঢেউ প্রশ্ন কর, ওটা তোমাকে ঢেউ উত্তর দেবে। আমি শুধু আমাদের লক্ষ্যের কথাই বর্ণনা ও ব্যাখ্যা করিনি, ওগুলোকে আমাদের কাজ ও আমাদের সত্ত্বার মধ্যে একটা পারস্পরিক ক্রিয়াপ্রতিক্রিয়া হিসাবেও দেখিয়েছি। এখনও আমার একটা মিটিঙে রোনাল্ড ফিশার থেকে উদ্ধৃতি দেওয়ার কথা মনে আছে, এক টুকরো চিনিতে যে মিষ্টতার স্বাদ আমরা পাই, তা চিনির সম্পদ নয় আবার আমাদের সম্পদও নয়। চিনির সঙ্গে মিথস্ক্রিয়ার প্রক্রিয়ায় আমরা মিষ্টতার অভিজ্ঞতা উৎপাদন করছি।
একটা ভার্টিক্যাল রাইজ-টার্ন স্ট্রেইট লাইন ক্লাইম্ব-ব্যালিস্টিক পথে একটা সারফেস-টু-সারফেস মিসাইলের ওপর অতিশয় চমৎকার কাজ করা হয়েছিল সেই সময়। আমি ডিআরডিএলের জনশক্তির দৃঢ় প্রত্যয় দেখে অবাক হয়ে গিয়েছিলাম, এরা তাদের পূর্ববর্তী প্রকল্পের ব্যর্থতা সত্ত্বেও সামনে এগিয়ে যেতে দৃঢ় ছিল। আমি পর্যালোচনার আয়োজন করেছিলাম এর বিভিন্ন সাবসিস্টেমের জন্য যথাযথ বৈশিষ্ট্য আলাদা করতে। ডিআরডিওর অনেক পুরনো কমরি মনে। আতংক সৃষ্টি করে আমি যেখানে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ পাওয়া যেতে পারে এমন সব স্থান থেকে লোকজনকে আমন্ত্রণ জানাতে শুরু করলাম, যেমন ইন্ডিয়ান ইন্সটিটিউট অব সায়েন্স, ইন্ডিয়ান ইন্সটিটিউট অব টেকনোলজি, কাউন্সিল ফর সায়েন্টিফিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল রিসার্চ, টাটা ইন্সটিটিউট এর ফান্ডামেন্টাল রিসার্চ এবং আরও অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। আমি অনুভব করেছিলাম, ডিআরডিএলের গুমোট কর্মকেন্দ্রগুলোয় তাজা বাতাসের প্রয়োজন। আমরা যদি জানলা পুরো খুলে দিই, তাহলে বৈজ্ঞানিক প্রতিভার আলো ভেতরে ঢুকতে শুরু করবে। আরও একবার কোলরিজের Ancient Mariner আমার মনে এল:
Swiftly, swiftly flew the ship,
Riding gently the oncoming tide.
১৯৮৩ সাল শুরুর দিকে কোনো এক সময়ে অধ্যাপক ধাওয়ান ভিজিটে এলেন। ডিআরডিএলে। প্রায় এক দশক আগে আমাকে দেওয়া তার উপদেশ আমি তাকেই স্মরণ করিয়ে দিলাম ও আপনার স্বপ্ন সত্যি হবার আগেই আপনাকে স্বপ্ন দেখতে হবে। কিছু লোক জীবনে যা চায় তার দিকে লাফিয়ে চলে; অন্যরা তাদের অদলবদল করে কিন্তু কখনও শুরু করতে পারে না কারণ তারা জানে তারা কী চায় এবং এও জানে না কীভাবে পেতে হবে। আইএসআরও ছিল ভাগ্যবান, কারণ অধ্যাপক সারাভাই ও অধ্যাপক ধাওয়ান তার হাল ধরেছিলেন। এমন নেতা যারা তাদের জীবনের চেয়ে মিশনকে বড়ো করে তুলেছিলেন, তারপর অনুপ্রাণিত করেছিলেন তাদের গোটা জনশক্তিকে। ডিআরডিএল অতটা ভাগ্যবান ছিল না। এই অসামান্য গবেষণাগার একটা অগ্রভাগ কর্তিত ভূমিকা রেখেছিল যা এর অস্তিত্বের অথবা বিপুল সামথ্যের প্রতিফলন ঘটাত না, এমনকি সাউথ ব্লকে এর প্রত্যাশাও পূরণ করত না। আমার প্রচণ্ড প্রফেশনাল, কিন্তু খানিকটা হতবুদ্ধি দল সম্পর্কে আমি অধ্যাপক ধাওয়ানকে জানিয়ে ছিলাম। অধ্যাপক ধাওয়ান তার উত্তরে স্বভাবসুলভ হাসি হেসেছিলেন, যেমন ইচ্ছা তেমন তার অর্থ করা যেত।
