আমার ভেতরের একটা কণ্ঠস্বর বলল, অনেক দিন ধরে অনুভূত কিন্তু অবহেলিত পুনরারম্ভের সময় এসেছে। আমাকে প্লেট পরিষ্কার করে নতুন অংক কষতে হবে। আগের অংকগুলো কি সঠিকভাবে কষা হয়েছিল? জীবনে নিজস্ব অগ্রগতির মূল্যায়ন নিজে করা খুব কঠিন কাজ। এখানে ছাত্রকে নিজেই প্রশ্নপত্র তৈরি করতে হয়েছে, নিজেই সে সব প্রশ্নের উত্তর পেতে হয়েছে আর নিজের তৃপ্তির জন্য তার মূল্যায়ন করতে হয়েছে। বিচার এক পাশে থাক, আইএসআরওতে আঠার বছর কাটিয়ে এখন সেখান থেকে চলে যাবার সময় মনে ব্যথা জাগবে না তা অসম্ভব। আর আমার ব্যথাতুর বন্ধুদের ক্ষেত্রে মনে হয়েছিল লিউইস ক্যারোলের কবিতার লাইনগুলোই সবচেয়ে উপযোগী:
You may charge me with murder
Or want of sense
(We are all of us weak at times):
But the slightest approach to a false pretence
Was never among my crimes!
৩. অর্ঘ্য [১৯৮১-১৯৯১]
৩. অর্ঘ্য [১৯৮১-১৯৯১]
Let craft, ambition, spite,
Be quenched in Reasons night,
Till weakness turn to might,
Till what is dark be light,
Till what is wrong be right!
-Lewis Carroll
১০.
এ সময় আমার চাকরি নিয়ে একটু কুশতাকুশতি শুরু হয়েছিল আইএসআরও এবং ডিআরডিওর মধ্যে। আইএসআরও আমাকে ছেড়ে দিতে খানিকটা ইতস্তত করছিল, অন্যদিকে ডিআরডিও আমাকে নিয়ে নিতে চাইছিল। অনেকগুলো মাস কেটে গেল, আর অনেক পত্রবিনিময় হলো আইএসআরও এবং ডিআরডিওর মধ্যে। অন্যদিকে পারস্পরিক সমঝোতার ভিত্তিতে একটা সিদ্ধান্তে আসার জন্য অনেকবার বৈঠক অনুষ্ঠিত হলো ডিফেন্স আরঅ্যান্ডডি এবং ডিপার্টমেন্ট অব স্পেসের সচিবালয়ের মধ্যে। ইতোমধ্যে অধ্যাপক রামান্না অবসর গ্রহণ করলেন প্রতিরক্ষা মন্ত্রীর বৈজ্ঞানিক উপদেষ্টার দপ্তর থেকে। অধ্যাপক রামান্নার জায়গায় এলেন ড, ভিএস অরুণাচলম, তখন পর্যন্ত তিনি ছিলেন হায়দারাবাদে অবস্থিত ডিফেন্স মেটালার্জিক্যাল রিসার্চ ল্যাবরেটরি (ডিএমআর এল)-এর পরিচালক। ড. অরুণাচলম তার আত্মবিশ্বাসের জন্য পরিচিত ছিলেন, আর তিনি জটিলতা ও বৈজ্ঞানিক আমলাতন্ত্রের অতিসূক্ষ্ম তারতম্য খুব সামান্যই পরোয়া করতেন। ইতোমধ্যে আমি বুঝতে পেরেছিলাম সেই সময়কার প্রতিরক্ষা মন্ত্রী আর ভেঙ্কটরমন আমার ক্ষেপণাস্ত্র গবেষণাগারের দায়িত্ব নেওয়ার ব্যাপারে অধ্যাপক ধাওয়ানের সঙ্গে আলোচনা করেছেন। অধ্যাপক ধাওয়ানকেও মনে হয়েছিল যেন প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের উচ্চ পর্যায়ের একটা নিস্পত্তিমূলক পদক্ষেপ নেবার অপেক্ষায় আছেন। অবশেষে সন্দেহের অবসান ঘটিয়ে ১৯৮২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে আমাকে ডিআরডিএলের পরিচালক পদে নিয়োগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হলো।
অধ্যাপক ধাওয়ান প্রায় সময়ই আইএসআরও সদরদপ্তরে আমার কামরায় আসতেন আর স্পেস লঞ্চ ভেহিকল প্রকল্প নিয়ে ঘন্টার পর ঘন্টা আলাপ করতেন। এমন এক মহান বিজ্ঞানীর সঙ্গে কাজ করা, ছিল বিশাল এক সুবিধা। আমি আইএসআরও ছেড়ে যাবার আগে, অধ্যাপক ধাওয়ান আমাকে ২০০০ সাল নাগাদ ভারতের মহাকাশ কর্মসূচির ওপর বক্তব্য দিতে বললেন। প্রায় গোটা ম্যানেজমেন্ট ও স্টাফ আমার বক্তব্য শোনার জন্য হাজির হয়েছিল, যেটা এক দিক থেকে ছিল ফেয়ারওয়েল মিটিং।
১৯৭৬ সালে আমার দেখা হয়েছিল ড. ভিএস অরুণাচলমের সাথে, এসএলভির ইনার্শিয়াল গাইডেন্স প্ল্যাটফর্মের জন্য অ্যালুমিনিয়াম অ্যালয় ইনভেস্টমেন্ট কাস্টিংয়ের সাথে যুক্ত হয়ে যখন আমি ডিএমআরএলে গিয়েছিলাম সেই সময়। ড, অরুণাচলম ব্যক্তিগত চ্যালেঞ্জ হিসাবে নিয়ে দেশে প্রথমবারের মতো ইনভেস্টমেন্ট কাস্টিং করেছিলেন, তাও অবিশ্বাস্য সংক্ষিপ্ত সময়ে-মাত্র দুই মাসে। তার যৌবনদীপ্ত শক্তি আর উদ্যম আমাকে চমৎকৃত করেছিল। এই তরুণ ধাতুবিদ অতি অল্প সময়ের মধ্যে মেটাল-মেকিং বিজ্ঞানকে মেটাল-ফর্মিং টেকনোলজিতে এবং সেখান থেকে আর্ট অব অ্যালয় ডেভলপমেন্ট-এ উন্নীত করেছিলেন। লম্বা ও দেহের অধিকারী ড. অরুণাচলম ছিলেন বৈদ্যুতিক চার্জ দেওয়া একটা ডায়নামোর মতো। আমার কাছে তাকে মনে হতো শক্তিশালী আচরণের একজন অগতানুগতিক ধাচের বন্ধু ভাবাপন্ন ব্যক্তি। সেই সঙ্গে একজন অসাধারণ ওয়ার্কিং পার্টনার।
১৯৮২ সালের এপ্রিলে আমি ডিআরডিএলে গেলাম আমার কাজের জায়গার সঙ্গে পরিচিত হবার জন্য। ডিআরডিএলের তকালীন পরিচালক এমএল বানসাল আমাকে সবখানে ঘুরিয়ে দেখালেন আর গবেষণাগারের সিনিয়র বিজ্ঞানীদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলেন। ডিআরডিএল কাজ করছিল পাঁচটা স্টাফ প্রজেক্ট ও ষোলটি কমপিটেন্স বিল্ড-আপ প্রজেক্ট নিয়ে। এছাড়াও তারা বেশ কিছু টেকনোলজি ওরিয়েন্টেড কার্যক্রমের সঙ্গেও জড়িত ছিল; এক্ষেত্রে তাদের লক্ষ্য ছিল, ভবিষ্যতে দেশীয় মিসাইল সিস্টেম উন্নয়নে অগ্রবর্তী সময় জিতে নেওয়া। আমি বিশেষ করে প্রভাবিত হলাম তাদের টুইন ৩০-টন লিকুইড প্রোপেল্যান্ট রকেট ইঞ্জিন তৈরির চেষ্টা দেখে।
এরই মধ্যে মাদ্রাজের আন্না বিশ্ববিদ্যালয় আমাকে সম্মানসূচক ডক্টর অব সায়েন্স ডিগ্রি প্রদান করল। অ্যারোনটিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং-এ আমি ডিগ্রি অর্জনের … পর ইতোমধ্যে প্রায় কুড়ি বছর পেরিয়ে গেছে। আন্না বিশ্ববিদ্যালয় রকেট বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে আমার প্রচেষ্টাকে স্বীকৃতি দেওয়ায় আমি আনন্দিত হলাম, কিন্তু আমাকে সবচেয়ে যা বেশি আনন্দ দিয়েছিল তা হলো একাডেমিক সার্কেলে আমাদের কর্মমূল্যের স্বীকৃতি। আমাকে উৎফুল্ল করে সম্মানসূচক ডক্টরেট ডিগ্রি প্রদান করা হলো অধ্যাপক রাজা রামান্নার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বার্ষিক সমাবর্তন অনুষ্ঠানে।
