তিনি আসল বিষয়ে আসতে বেশি সময় নিলেন না। ডিআরডিএলে নারায়ণন ও তার দলের বিপুল সাফল্য অর্জন সত্ত্বেও ডেভিল ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি বন্ধ রাখা হয়েছিল। সামরিক রকেটের পুরো কর্মসূচি গুটিয়ে যাচ্ছিল অটল অনীহার নিচে। ডিআরডিওর প্রয়োজন তাদের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচির কমান্ড নিতে পারবে এমন এক ব্যক্তি, এই কর্মসূচি কিছুদিন ধরে পড়ে ছিল ড্রয়িং বোর্ডের মধ্যেই। অধ্যাপক রামান্না আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, আমি ডিআরডিএলে যোগ দিতে এবং তাদের গাইডেড মিসাইল ডেভলপমেন্ট প্রোগ্রাম (জিএমডিপি) রূপায়নের দায়িত্ব নিজ কাঁধে তুলে নিতে ইচ্ছুক কিনা। অধ্যাপক রামান্নার প্রস্তাবে আমি আবেগ বিহ্বল হয়ে পড়লাম।
আমাদের রকেটবিদ্যার জ্ঞান প্রয়োগের এমন সুযোগ আমি আর কবে পেতাম? অধ্যাপক রামান্না আমাকে যে রকম উচ্চমূল্য বলে গণ্য করেছিলেন তাতে আমি সম্মানিত বোধ করলাম। পোখারান পারমাণবিক পরীক্ষার পেছনে তিনি ছিলেন উজ্জীবনী শক্তি, এবং বহির্বিশ্বে প্রাযুক্তিক ক্ষেত্রে ভারতের ভাবমূর্তি গড়ে তুলতে তার অবদানের কথা ভেবে আমি রোমাঞ্চিত হই। আমি যে তার কথা প্রত্যাখ্যান করতে পারব না, তা জানতাম। অধ্যাপক রামান্না আমাকে পরামর্শ দিলেন এ ব্যাপারে অধ্যাপক ধাওয়ানের সঙ্গে কথা বলতে, যাতে করে তিনি আইএসআরও থেকে ডিআরডিএলে আমাকে বদলির ব্যবস্থা নিতে পারেন। এ অধ্যাপক ধাওয়ানের সঙ্গে আমি দেখা করলাম ১৪ জানুয়ারি ১৯৮১ তারিখে। তিনি ধৈর্যের সঙ্গে আমার কথা শুনলেন, তার সবকিছু সতর্কতার সঙ্গে মাপার স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে, যাতে করে কোনো পয়েন্ট মিস না করেন। তার অভিব্যক্তিতে লক্ষ্যণীয় আনন্দের ভাব ফুটে উঠল। তিনি বললেন, আমার লোকের কাজের যে মুল্যায়ন তারা করেছে তাতে আমি খুশি। তিনি তারপর হাসলেন। অধ্যাপক ধাওয়ানের মতো হাসতে কাউকে দেখিনি কখনও-যেন এক কোমল শাদা মেঘদল-যেমন ইচ্ছা তেমন আকারে এর ছবি তুমি কল্পনা করতে পার।
আমি অবাক হয়ে ভাবছিলাম কীভাবে এগোব। আমি কি ওই পদের জন্য আনুষ্ঠানিক আবেদন জানাব, যাতে করে ডিআরডিএল নিয়োগপত্র পাঠাতে পারে? অধ্যাপক ধাওয়ানের কাছে আমি জানতে চাইলাম না। তাদের ওপর চাপ দেওয়ার দরকার নেই। নতুন দিল্লিতে আমার পরবর্তী সফরের সময় টপ-লেভেল ম্যানেজমেন্টের সঙ্গে আমি এ বিষয়ে কথা বলব। অধ্যাপক ধাওয়ান বললেন, আমি জানি আপনার একটা পা সবসময়ই ডিআরডিওতে দিয়ে রেখেছেন, এখন আপনার পুরো মধ্যাকর্ষণ কেন্দ্র তাদের দিকে আপনাকে টেনে নিতে চাইছে।
অধ্যাপক ধাওয়ান যা বলছিলেন তার মধ্যে সত্যের উপাদান হয়তো ছিল, কিন্তু আমার হৃদয়খানা সবসময়ই ছিল আইএসআরওতে। তিনি কি তা সত্যিকারার্থেই বুঝতে পারেননি?
১৯৮১ সালের প্রজাতন্ত্র দিবস আনন্দময় বিস্ময় নিয়ে এল। ২৫ জানুয়ারি সন্ধ্যায় অধ্যাপক ইউআর রাও-এর সচিব মহাদেবন দিল্লি থেকে ফোন করে জানালেন, আমাকে পদ্মভূষণ পুরস্কার দেওয়ার ঘোষণা প্রদান করা হয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে। পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ ফোনটি এল অধ্যাপক ধাওয়ানের কাছ থেকে, তিনি আমাকে অভিনন্দন জানালেন। আমি যেন গুরুর কাছ থেকে অভিনন্দন পাওয়ার পরম সুখ অনুভব করলাম। অন্যদিকে অধ্যাপক ধাওয়ান পদ্ম বিভূষণ পুরস্কার পাওয়ায় দারুণ উল্লাস হলো আমার, তাকে সর্বান্তকরণে আমি অভিনন্দন জানালাম। তারপর ড, ব্রহ্ম প্রকাশকে ফোন করে ধন্যবাদ দিলাম। ড. ব্রহ্ম প্রকাশ আমার এই আনুষ্ঠানিক ভদ্রতায় আমাকে ভর্ৎসনা করে বললেন, আমার অনুভূতি হচ্ছে যেন আমার সন্তান পুরস্কার পেয়েছে।
ড. ব্রহ্ম প্রকাশের স্নেহপরায়ণতা গভীর ভাবে আমাকে স্পর্শ করল, এতটা গভীর যে নিজের আবেগ আমি আর দমন করে রাখতে পারলাম না।
আমার ঘর আমি ভরিয়ে তুললাম বিসমিল্লাহ খাঁর সানাইয়ের সুরে। সে সুর আমাকে নিয়ে গেল আরেক সময়ে, আরেক জগতে। আমি চলে গেছি রামেশ্বরমে আর মাকে জড়িয়ে ধরেছি। আমার বাবা সযত্নে আঙুল বুলিয়ে দিচ্ছেন আমার চুলে। আমার প্রেরণাদাতা জালালুদ্দিন খবরটা ঘোষণা করছে মস্ক স্ট্রিটে জড়ো হওয়া লোকদের উদ্দেশ্যে। আমার বোন জোহরা আমার জন্য প্রস্তুত করছে বিশেষ মিষ্টান্ন। পক্ষী লক্ষ্মণ শাস্ত্রী আমার কপালে এঁকে দিচ্ছেন তিলক। ফাদার সলোমন পবিত্র কুশ ধরে আমাকে আশীর্বাদ করছেন। আমি দেখতে পাই অধ্যাপক সারাভাই লক্ষ্য পূরণের তৃপ্তি নিয়ে হাসছেন। যার বীজ তিনি বপণ করেছিলেন কুড়ি বছর আগে, তা শেষ পর্যন্ত ডালপালা ছড়ান বৃক্ষে পরিণত হয়েছে আর সে বৃক্ষের ফল উপভোগ করছে ভারতের জনগণ।
আমার পদ্মভূষণ পুরস্কার প্রাপ্তি ভিএসএসসিতে মিশ্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করল। অনেকে আমার আনন্দে শরিক হলো, অনেকে ভাবল আমাকে অসঙ্গতভাবে প্রত্যভিজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। আমার খুব ঘনিষ্ঠ কয়েকজন সহযোগী ঈর্ষান্বিত হলো। কিছু মানুষ কেন জীবনের মহান মূল্য দেখতে ব্যর্থ হয়? জীবনে সুখ, তৃপ্তি ও সাফল্য নির্ভর করে সঠিক পছন্দের ওপর, বিজয়ী পছন্দের ওপর। জীবনে অনেক শক্তি আছে যা তোমার পক্ষে ও বিরুদ্ধে কাজ করছে। ক্ষতিকর শক্তি থেকে কল্যাণকামী শক্তিকে অবশ্যই পৃথক করতে হবে। আর এ দুয়ের মধ্যে সঠিকভাবে একটিকে বেছে নিতে হবে।
