ভিএসএসসির বিদ্যমান অবকাঠামো ভবিষ্যৎ লঞ্চ ভেহিকল সিস্টেমের আয়তন ও ওজনের পক্ষে অপর্যাপ্ত হয়ে পড়েছিল। এসব প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য দরকার ছিল উচ্চতর বিশেষায়িত স্থাপনা। ভিএসএসসির সম্প্রসারিত কর্মকান্ডের জন্য নতুন স্থান ঠিক করা হলো ভাটিয়ুরকাভু ও ভালিয়ামালায়। ড. শ্রীনিবাসন একটা বিস্তারিত পরিকল্পনা তৈরি করলেন এই স্থাপনাগুলোর। ইতোমধ্যে, শিবাথানু পিল্লাইয়ের সঙ্গে মিলে আমি একটা অ্যানালাইসিস করলাম এসএলভি-৩ ও এর থেকে জাত অন্যান্য নমুনার প্রয়োগ সম্পর্কে মিসাইল ব্যবহারের জন্য বিদ্যমান দুনিয়ার লঞ্চ ভেহিকলের সঙ্গে তুলনামূলক বিশ্লেষণ ছিল সেটা। আমরা দেখলাম যে, এসএলভি-৩ সলিড রকেট সিস্টেম নিকট ও মধ্যম পাল্লার (৪০০০ কিলোমিটার) পেলোড ডেলিভারি ভেহিকলের জাতীয় চাহিদা পূরণ করবে। এসএলভি-৩ সাবসিস্টেমে ৩৬ টন প্রোপেল্যান্টের সঙ্গে ১.৮ মিটার ডায়ামিটারের একটা অতিরিক্ত সলিড বুস্টার জুড়ে দিতে পারলে আইসিবিএম-এর চাহিদাও (১০০০ কেজি পেলোডের জন্য ৫০০০ কিলোমিটার উর্ধ) পূরণ করা সম্ভব। কিন্তু এই প্রস্তাব কখনও বিবেচনা করা হয়নি। তা সত্ত্বেও এটা রি-এন্ট্রি এক্সপেরিমেন্ট (আরইএক্স) রূপদানের পথ করে দিয়েছিল, যার থেকে পরে সৃষ্টি হয় অগ্নি!
পরবর্তী এসএলভি-৩ ফ্লাইট, এসএলভি-৩-ডি, উৎক্ষেপণ করা হয় ১৯৮১ সালের ৩১ মে। দর্শকদের গ্যালারি থেকে এই ফ্লাইট আমি অবলোকন করলাম। এই প্রথমবার আমি কন্ট্রোল সেন্ট্রালের বাইরে বসে উৎক্ষেপণ প্রত্যক্ষ করলাম। একটা তিক্ত সত্যের মুখোমুখি আমাকে হতে হয়েছিল যে, সংবাদমাধ্যমের মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হওয়ায় আমার ব্যাপারে আমার কয়েকজন সিনিয়র সহকর্মীর মনে ঈর্ষা জেগেছিল, যারা সবাই সমানভাবে অবদান রেখেছিলেন এসএলভি-৩ এর সাফল্যে। নতুন পরিবেশের শীতলতায় আমি কি আহত হয়েছিলাম? হয়তো হ্যাঁ, কিন্তু যা পরিবর্তন করতে পারব না তা গ্রহণ করতে আমার আপত্তি ছিল না।
অন্যদের লাভে ভাগ বসিয়ে আমি জীবনধারণ করি না। আমার প্রকৃতির মধ্যেই ও জিনিস নেই। নির্মম মুনাফাখখার আমি নই। এসএলভি-৩ জোর খাঁটিয়ে বা স্বীয় উদ্দেশ্যসাধনের নিমিত্তে তৈরি হয়নি, বরং সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় তৈরি হয়েছে। তাহলে কেন এই তিক্ততা? এটা কি ভিএসএসসির শীর্ষ পর্যায়ের বৈশিষ্ট্য ছিল, নাকি এক সর্বজনীন বাস্তবতা? একজন বিজ্ঞানী হিসাবে, বাস্তবতার কারণ খুঁজে বের করার শিক্ষাই আমি পেয়েছিলাম। বিজ্ঞানে বাস্তবতা হলো তাই যার অস্তিত্ব আছে এবং যেহেতু এই তিক্ততা ছিল বাস্তব, সুতরাং এর কারণ আমাকে খুঁজে বের করতে হবে। কিন্তু এই ধরনের কোনো কিছুর কী কারণ থাকে? আমার এসএলভি-পরবর্তী অভিজ্ঞতা কি আমাকে কোনো সংকটজনক পরিস্থিতির দিকে ঠেলে দিচ্ছিল? হ্যাঁ আর না। হ্যাঁ, কারণ এসএলভি-৩ এর গৌরবের অধিকারী সবাই হয়নি। না, কারণ কোনো ব্যক্তির ক্ষেত্রে কোনো পরিস্থিতি কেবল তখনই সংকটজনক বলে বিবেচনা করা যাবে, যখন তার সত্ত্বার প্রয়োজনীয়তা বাস্তবায়ন অসম্ভব হয়ে উঠবে এবং নিশ্চয়ই সে রকম ছিল না ঘটনা। বস্তুত দ্বন্দ্বের ধারণা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এই মূল আইডিয়ার ওপর। অতীতের দিকে তাকিয়ে, আমি শুধু বলতে পারি পুনরারম্ভ আর বাস্তবায়নের বিশাল এক প্রয়োজনীয়তার ব্যাপারে আমি পূর্ণ সচেতন ছিলাম।
১৯৮১ সালের জানুয়ারি মাসে এসএলভি-৩ বিষয়ে একটা বক্তৃতা দেবার জন্য দেরাদুনে আমন্ত্রণ জানালেন হাই অ্যাল্টিচিউড ল্যাবরেটরির (এখন ডিফেন্স ইলেকট্রনিকস অ্যাপ্লিকেশনস ল্যাবরেটরি (ডিইএল)) ড, ভগীরথ রাও। প্রখ্যাত পরমাণু বিজ্ঞানী অধ্যাপক রাজা রামান্না সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন, তিনি ছিলেন তখন প্রতিরক্ষা মন্ত্রীর বৈজ্ঞানিক উপদেষ্টা। তিনি পরমাণু শক্তি সঞ্চালনে ভারতের চেষ্টা ও শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যে প্রথম পারমাণবিক পরীক্ষা চালানোর চ্যালেঞ্জ সম্পর্কে বক্তব্য রাখেন। যেহেতু এসএলভি-৩ এর সঙ্গে আমি ওতপ্রোত জড়িত ছিলাম, সুতরাং এ নিয়ে আমাকে বিস্তারিত বলতে হবে সেটাই ছিল স্বাভাবিক। পরে, অধ্যাপক রাজা রামান্না একটা ব্যক্তিগত চা-চক্রে আমাকে আমন্ত্রণ জানান।
অধ্যাপক রামান্নার সঙ্গে সাক্ষাতে প্রথম যে ব্যাপারটা আমাকে চমকিত করেছিল, তা হলো আমার সাক্ষাৎ পাওয়ায় তার অনাবিল আনন্দ। তার কথাবার্তায় ছিল সহজ-স্বাভাবিকতা, বিলম্বহীন ও সহানুভূতিশীল বন্ধু ভাবাপন্নতা। এই সন্ধ্যায় আমার মনে ভেসে উঠেছিল অধ্যাপক সারাভাইয়ের সঙ্গে আমার প্রথম সাক্ষাতের স্মৃতি মনে হয় এইতো যেন গতকালের ব্যাপার। অধ্যাপক সারাভাইয়ের জগৎ ভেতরে ছিল সাদামাটা আর বাইরে ছিল সহজ। তার সঙ্গে আমরা যারা কাজ করেছি, সবাই পরিচালিত হয়েছি এক মন নিয়ে, সৃষ্টির একাগ্রচিত্ততায়। সারাভাইয়ের জগৎ ছিল আমাদের স্বপ্নের পরিমাপে গঠিত।
কিন্তু আমার জগতে সরলতা, বলতে আর কিছু ছিল না। এটা পরিণত হয়েছিল ভেতরে জটিল আর বাইরে প্রতিবন্ধক। রকেট বিজ্ঞানে ও দেশীয় রকেট তৈরির লক্ষ্য পূরণে আমার প্রচেষ্টা বাইরের বাধাবিপত্তিতে ব্যাহত হয়েছিল আর অভ্যন্তরীণ দোদুল্যমানতায় জটিল হয়েছিল। সামনে এগিয়ে যাবার জন্য আমার ইচ্ছার বিশেষ চেষ্টা প্রয়োজন ছিল আর তাতে আমি সচেতন ছিলাম। আমার অতীতের সঙ্গে বর্তমানের সমন্বয় ইতোমধ্যেই বিপন্ন হয়ে পড়েছিল। আমার বর্তমানের সঙ্গে ভবিষ্যতের সমন্বয় আমার মনে সর্বাগ্রে স্থান নিয়ে ছিল যখন আমি অধ্যাপক রামান্নার চায়ের নিমন্ত্রণে গিয়েছিলাম।
