চতুর্থ স্টেজ অ্যাপোজি মোটর প্রয়োজন মতো বেগমাত্রা প্রয়োগ করেছে রোহিনী স্যাটেলাইটকে কক্ষপথে স্থাপন করতে। আনন্দ ধ্বনি শোনা যাচ্ছিল সবখানে। আমি যখন ব্লক হাউজ থেকে বেরিয়ে এলাম, তখন আমার তরুণ সহকর্মীরা আমাকে তাদের কাঁধে তুলে নিল আর এগিয়ে চলল মিছিল করে।
গোটা জাতি উত্তেজিত হয়ে পড়েছিল। যে সব রাষ্ট্র স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের সামর্থ্য রাখে তাদের সংখ্যা খুবই কম, আর সেই নগন্যসংখ্যক রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে এখন ভারতের নামও অন্তর্ভুক্ত হলো। সংবাদপত্রগুলো এ ঘটনাকে শিরোনাম করে সংবাদ পরিবেশন করল। রেডিও ও টেলিভিশনে প্রচারিত হলো বিশেষ অনুষ্ঠান। ডেস্ক চাপড়ে অভিনন্দন জানাল পার্লামেন্ট। এটা ছিল একই সঙ্গে জাতীয় স্বপ্নের বাস্তবায়ন, আর আমাদের ইতিহাসে একটা গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ের সূচনা। অধ্যাপক সতীশ ধাওয়ান, আইএসআরওর চেয়ারম্যান, তার রীতিমাফিক কথাবার্তার সতর্কতা হাওয়ায় ছুঁড়ে দিয়ে ঘোষণা করলেন, মহাকাশে স্থান নেওয়ার বিষয়টি এখন আমাদের সাধ্যের মধ্যে। প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী কেবল করে তার অভিনন্দন জানালেন। কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিক্রিয়া ছিল ভারতীয় বিজ্ঞানীদের প্রত্যেকেই গর্বিত হয়েছিল এই একশভাগ দেশীয় প্রচেষ্টায়।
আমার অভিজ্ঞতা হলো মিশ্র অনুভূতির। সাফল্য অর্জনে আমি আনন্দিত ছিলাম, যা কৌশলে আমাকে এড়িয়ে যাচ্ছিল গত দুই দশক ধরে; কিন্তু আমি ব্যথিত হয়েছিলাম, কারণ যারা আমাকে অনুপ্রাণিত করেছিলেন তারা কেউ আর বেঁচে ছিলেন না আমার আনন্দ ভাগ করে নেবার জন্য। আমার বাবা, আমার ভগ্নিপতি জালালুদ্দিন, এবং অধ্যাপক সারাভাই।
এসএলভি-৩ এর সফল উৎক্ষেপণের কৃতিত্ব প্রথমে ভারতের মহাকাশ কর্মসূচির মহানায়কদের, সুনির্দিষ্টভাবে অধ্যাপক সারাভাইয়ের; তারপর ভিএসএসসির কয়েকশ কর্মীবৃন্দের, এবং অধ্যাপক ধাওয়ান ও ড. ব্রহ্ম প্রকাশের।
সেই সন্ধ্যায় আমাদের রাতের খাবার খেতে দেরি হলো। ক্রমে ক্রমে শান্ত হয়ে এল উৎসবের আনন্দধ্বনি। আমি প্রায় শক্তিহীনভাবে বিছানায় গেলাম। খোলা জানলা দিয়ে আমি মেঘের ভেতর চাঁদ দেখতে পেলাম। শ্রীহরিকোটা দ্বীপে আজ সমুদ্রের বাতাস মনে হলো প্রতিফলন ঘটাচ্ছে প্রাণবন্ততা।
.
এসএলভি-৩ এর সাফল্যের এক মাসের মধ্যে আমি এক দিনের জন্য গেলাম বোম্বাইয়ে অবস্থিত নেহরু বিজ্ঞান কেন্দ্রে। সেখানে এসএলভি-৩ এর অভিজ্ঞতা বর্ণনা করার জন্য আমন্ত্রণ জানান হয়েছিল আমাকে। সেখানে আমাকে দিল্লি থেকে ফোন করলেন অধ্যাপক ধাওয়ান। পরদিন সকালে তার সঙ্গে যোগ দিতে বললেন। প্রধানমন্ত্রী মিসেস ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে আমাদের সাক্ষাতের কথা ছিল। নেহরু কেন্দ্রে আমার আমন্ত্রণকারীরা আমাকে দিল্লির টিকেট জোগাড় করে দিলেন, কিন্তু আমার একটা ছোটো সমস্যা ছিল। সেটা পোশাকের। আমি অভ্যাসমতো একেবারে ক্যাজুয়াল পোশাক পরতাম আর স্লিপার। কোনোভাবেই অমন পোশাকে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করা যায় না। এ সমস্যার কথা যখন বললাম অধ্যাপক ধাওয়ানকে, তিনি আমাকে পোশাক নিয়ে উৎকণ্ঠিত হতে নিষেধ করলেন। সাফল্যের সুন্দরতম পোশাকে আপনি আবৃত, তিনি সরস জবাব দিলেন।
অধ্যাপক ধাওয়ান ও আমি পার্লামেন্ট ভবন অ্যানেক্সে উপস্থিত হলাম পরদিন সকালে। প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ক পার্লামেন্টারি প্যানেলের একটা মিটিং নির্ধারিত ছিল। কামরায় লোকসভা ও রাজ্যসভার প্রায় ৩০ জন সদস্য ছিলেন, আর সেখানে জ্বলছিল বিশাল এক ঝাড়বাতি। সেখানে আরও উপস্থিত ছিলেন অধ্যাপক এমজিকে মেনন ও ড, নাগ চৌধুরী। শ্রীমতি গান্ধী এসএলভি-৩ এর সাফল্য সম্পর্কে সদস্যদের বললেন আর আমাদের অর্জনকে উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করলেন। অধ্যাপক ধাওয়ান দেশের মহাশূন্য গবেষণায় উৎসাহদানের জন্য সমবেতদের ধন্যবাদ জানালেন আর আই এসআরওর বিজ্ঞানী ও প্রকৌশলীদের কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করলেন। অকস্মাৎ আমি দেখতে পেলাম শ্রীমতি গান্ধী আমাকে লক্ষ করে হাসি মুখে বলছেন, কালাম, আমরা আপনার কথা শুনতে চাই।
অধ্যাপক ধাওয়ান সমবেতদের উদ্দেশ্যে আগেই যেহেতু বক্তৃতা দিয়েছেন, তাই আমি অবাক হলাম এই অনুরোধে।
ইতস্তত করে আমি উঠে দাঁড়িয়ে বললাম, এই সমাবেশে উপস্থিত হতে পেরে আমি সম্মানিত বোধ করছি। আমি একটা জিনিসই জানি যে আমাদের দেশে কীভাবে একটা রকেট নির্মাণ করতে হবে, যা দেশে তৈরি স্যাটেলাইট স্থাপন করতে পারবে, ঘন্টায় ২৫০০০ কিলোমিটার বেগমাত্রা প্রয়োগ করে। বজ্রধ্বনির মতো হাততালি পড়তে লাগল। এসএলভি-৩ এর মতো একটা প্রকল্পে কাজ করার আর আমাদের দেশের বৈজ্ঞানিক শক্তি প্রমাণের সুযোগ দেওয়ার জন্য সদস্যদের আমি ধন্যবাদ জানালাম আনন্দে ভরপুর হয়ে উঠল সমস্ত কক্ষ।
সাফল্যের সঙ্গে এসএলভি-৩ প্রকল্প সম্পূর্ণ হয়ে যাওয়ার পর, ভিএসএসসির দরকার হয়ে পড়ল লক্ষ্য পুনর্নির্ধারণ ও সম্পদ পুনর্গঠনের। আমি প্রকল্পের কাজ থেকে অবসর চেয়েছিলাম। আমার দলের বেদ প্রকাশ স্যান্ডলাসকে এসএলভি-৩ কন্টিনুয়েশন প্রজেক্টের প্রকল্প পরিচালক করা হলো। এই প্রকল্পের লক্ষ্য ছিল একই শ্রেণির অপারেশনাল স্যাটেলাইট লঞ্চ ভেহিকল তৈরি করা। নির্দিষ্ট প্রযুক্তি উদ্ভাবনের সাহায্যে এসএলভি-৩ এর আরও উন্নতির দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে কিছু সময়ের জন্য কাজ করা হচ্ছিল অগমেন্টেড স্যাটেলাইট লঞ্চ ভেহিকল (এএসএলভি নিয়ে। লক্ষ্য ছিল এসএলভি-৩ এর পেলোড বহনের ক্ষমতা ৪০ কেজি থেকে ১৫০ কেজিতে উন্নীত করা। আমার দলের এমএসআর দেবকে এএসএলভির প্রকল্প পরিচালক করা হলো। সান-সিনক্রোনাস অর্বিট (৯০০ কিলোমিটার)-এ পৌঁছাতে একটা পিএসএলভি তৈরির প্রয়োজন হয়েছিল। জিও স্যাটেলাইট লঞ্চ ভেহিকল (জিএসএলভি) নিয়েও বিবেচনা করা হচ্ছিল, যদিও সেটা ছিল অনেক দূরের স্বপ্ন। আমাকে অ্যারোস্পেস ডাইনামিকস অ্যান্ড ডিজাইন গ্রুপের পরিচালক নিযুক্ত করা হলো, যাতে করে আমি লঞ্চ ভেহিকল গঠন করতে পারি আর প্রযুক্তির উন্নয়ন ঘটাতে পারি।
