ড. ব্রহ্ম প্রকাশের উপদেশ প্রতিধ্বনিত হয় ব্রহ্মাকে নিয়ে লেখা এমারসনের কবিতায়:
If the red slayer think he slays,
Or, if the slain think he is slain,
They know not well, the subtle ways
I keep, and pass, and turn again.
শুধু অজানা কোনো ভবিষ্যতের জন্য বেঁচে থাকা উপরিগত ব্যাপার। এটা হলো পার্শ্বস্থিত স্থান বাদ দিয়ে পাহাড় চূড়ায় ওঠা। পাহাড়ের পার্শ্বদেশই জীবনকে টিকিয়ে রাখে, চূড়া নয়। এখানেই সবকিছু জন্মায়, অভিজ্ঞতা অর্জিত হয়, টেকনোলজির দক্ষতা শেখা যায়। চূড়ার গুরুত্ত্ব হলো, সে পার্শ্বদেশকে স্থির রাখে। তাই আমি চুড়ার দিকে যাচ্ছিলাম, তবে পার্শ্বদেশের অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে। আমাকে যেতে হবে অনেক দূর, কিন্তু আমি তাড়াহুড়োর মধ্যে ছিলাম না। আমি যাচ্ছিলাম ছোটো ছোটো পা ফেলে ঠিক এক পা এক পা করে কিন্তু প্রতিটা পদক্ষেপেই চূড়ার দিকে।
.
প্রতিটা পর্যায়েই এসএলভি-৩ দল আশীর্বাদপুষ্ট হয়েছিল কিছু অনন্যসাধারণ সাহসী মানুষের দ্বারা। সুধাকর ও শিবরামকৃষ্ণনের পাশাপাশি আরও ছিলেন শিবকামিনাথন। এসএলভি-৩ এর ইন্টিগ্রেশনের জন্য ত্রিবান্দ্রাম থেকে এসএইচএআরে সি-ব্যান্ড ট্রান্সপোন্ডার হচ্ছে একটা ডিভাইস যা রকেট সিস্টেমে যুক্ত করা হয় রাডার সংকেত দেওয়ার জন্য, উৎক্ষেপণস্থল থেকে চূড়ান্ত ইম্প্যাক্ট পয়েন্ট পর্যন্ত ভেহিকল ট্র্যাক করার পক্ষে যা যথেষ্ট শক্তিশালী। এসএলভি-৩ উৎক্ষেপণ শিডিউল নির্ভরশীল ছিল। এই যন্ত্রের আগমন ও ইন্টিগ্রেশনের ওপর। যে বিমানে চড়ে শিবকামি আসছিল সেটা মাদ্রাজ বিমান বন্দরে অবতরণ করতে গিয়ে বেকায়দায় পড়ে স্কিড করল আর রানওয়েতে আছড়ে পড়ল। বিপুল ধোয়ায় ঢাকা পড়ে গেল বিমানটি। এমারজেন্সি এগজিট দিয়ে সবাই লাফিয়ে নেমে গেল, নিজেদের বাঁচানোর জন্য তারা বেপরোয়া চেষ্টা চালাচ্ছিল। কিন্তু একমাত্র ব্যতিক্রম শিবকামি, তার মালপত্র থেকে ট্রান্সপোন্ডারটা সরিয়ে না নেওয়া পর্যন্ত সে বিমান ত্যাগ করল না। সর্বশেষ যে কজন ব্যক্তি ধোয়ার ভেতর থেকে অবশেষে বেরিয়ে এল, অন্যরা সবাই ছিল বিমানের ক্রু, তাদের একজন ছিল সে এবং ট্রান্সপোন্ডারটা বুকে চেপে ধরে রেখেছিল।
সেইসব দিনের আরও একটা ঘটনা আমার স্পষ্ট মনে আছে, সেটা এসএলভি-৩ অ্যাসেম্বলি ভবনে অধ্যাপক ধাওয়ানের ভিজিটের সঙ্গে সম্পর্কিত। অধ্যাপক ধাওয়ান, মাধবন নায়ার ও আমি আলোচনা করছিলাম এসএলভি-৩ ইন্টিগ্রেশনের কিছু অপেক্ষাকৃত ভালো অবয়ব নিয়ে। ভেহিকলটা লঞ্চারের ওপর রাখা ছিল আনুভূমিক অবস্থায়। আমরা যখন চারপাশে ঘুরে ঘুরে দেখছিলাম আর পরীক্ষা করছিলাম ইন্টিগ্রেটেড হার্ডওয়ারের দ্রুত সাধনযোগ্যতা, তখন আমি লক্ষ্য করলাম দুর্ঘটনা ঘটলে আগুন নেভানোর জন্য বড়ো ওয়াটার পোর্ট রাখা হয়েছে। কোনো কারণে, লঞ্চারে এসএলভি-৩ এর দিকে মুখ করে রাখা পোর্টগুলো দেখে আমি অস্বস্তি অনুভব করলাম। আমি মাধবনকে পরামর্শ দিয়ে বললাম, পোর্টের মুখ ১৮০ ঘুরিয়ে রাখতে পারি আমরা বিপরীত দিকে। এতে করে হঠাৎ পানি বেরিয়ে রকেটের ক্ষতি হবার সম্ভাবনা রোধ করা যাবে। মাধবন নায়ার পোর্টের মুখ রকেটের বিপরীত দিকে ঘুরিয়ে রাখার কয়েক মিনিটের মধ্যে, আমাদের বিস্মিত করে দিয়ে, প্রচণ্ড গতিতে পানির তোড় বেরিয়ে এল পোর্ট থেকে। ভেহিকল সেফটি অফিসার অগ্নিনির্বাপণ পদ্ধতির কাজ নিশ্চিত করেছিল, কিন্তু সে উপলব্ধি করতে পারেনি যে এতে রকেট ধ্বংস হয়ে যেতে পারে। এটা ছিল দূরদর্শিতার একটা শিক্ষা, নাকি আমরা রক্ষা পেয়েছিলাম ঐশ্বরিক মহিমায়?
১৯৮০ সালের ১৭ জুলাই দ্বিতীয় এসএলভি-৩ উৎক্ষেপণের ৩০ ঘন্টা আগে, সব ধরনের ভবিষ্যদ্বাণীতে পূর্ণ হয়ে প্রকাশিত হয়েছিল সংবাদপত্রগুলো। একটি কাগজে লেখা হলো, প্রকল্প পরিচালক নিখোঁজ, যোগাযোগের জন্য তাকে পাওয়া যায়নি। অধিকাংশ সংবাদে বর্ণনা করা হয়েছিল প্রথম এসএলভি-৩ এর ইতিহাস, আর জ্বালানি সংকটের কারণে কীভাবে তৃতীয় স্টেজ প্রজ্বলিত হতে ব্যর্থ হয়েছিল আর সমুদ্রে নাক থুবড়ে পড়েছিল রকেট সেই কাহিনি। কোনো কোনো কাগজে এসএলভি-৩ এর সামরিক কাজে ব্যবহারের সম্ভাবনা হাইলাইট করা হলো। আমি জানতাম আগামীকালের উৎক্ষেপণে নির্ধারিত হতে যাচ্ছে ভারতীয় মহাকাশ কর্মসূচির ভবিষ্যৎ। বস্তুত, সাদামাটা কথায়, সমগ্র জাতির দৃষ্টি আবদ্ধ ছিল আমাদের ওপর।
.
পরবর্তী দিনের প্রথম ভাগে, ১৮ জুলাই ১৯৮০-০৮০৩ ঘন্টায় ভারতের প্রথম স্যাটেলাইট লঞ্চ ভেহিকল এসএলভি-৩ উৎক্ষিপ্ত হলো এসএইচআর থেকে। টেক অফের আগে ৬০০ সেকেন্ডে আমি দেখলাম কম্পিউটার ডাটা দিচ্ছে, রোহিনী স্যাটেলাইটকে (পেলোড হিসাবে বাহিত) কক্ষপথে প্রবেশ করাতে প্রয়োজন মতো বেগমাত্রা প্রয়োগ করছে স্টেজ ৪। পরবর্তী দুই মিনিটের মধ্যেই রোহিনী নিজ কক্ষপথে স্থাপিত হয়ে পৃথিবী পরিক্রমণ শুরু করল। কর্কশ আওয়াজের মধ্যে আমার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শব্দগুলো আমি উচ্চারণ করলাম, মিশন ডিরেক্টর মনোযোগ আকর্ষণ করছি সমস্ত স্টেশনের। একটা জরুরি ঘোষণা দেওয়া হচ্ছে। মিশনের চাহিদামতো কাজ করেছে সমস্ত স্টেজ।
