.
৯.
ড. ব্রহ্ম প্রকাশ এই প্রতিবন্ধকতার সময়টা কাটিয়ে উঠতে সাহায্য করেছিলেন। যুদ্ধ ক্ষেত্রের ক্ষতি নিয়ন্ত্রণের নীতি প্রয়োগ করেছিলেন তিনি। সাথীকে কেবল জীবন্ত অবস্থায় বাড়িতে পৌঁছে দাও। সে সুস্থ হয়ে উঠবে। তিনি এসএলভি টিমের সবাইকে এক সঙ্গে জড়ো করে আমাকে দেখালেন, ব্যর্থতার দুঃখে শুধু আমি একাই কাতর নই। আপনার সব কমরেড দাঁড়িয়ে আছে আপনার পাশেই, তিনি বললেন। এটা আবেগপূর্ণ সমর্থন ও উৎসাহ জাগাল আমার মনে, সেই সঙ্গে পথনির্দেশনা।
উড্ডয়ন-পরবর্তী একটা পর্যালোচনা অনুষ্ঠিত হলো ১১ অগাস্ট ১৯৭৯ তারিখে। এতে সত্ত্বরজনেরও বেশি বিজ্ঞানী উপস্থিত হলেন। ব্যর্থতার বিস্তারিত টেকনিক্যাল দিকগুলো নির্ধারণ করা হয়েছিল এতে। পরে এসকে আথিখানের নেতৃত্বে পোস্টফ্লাইট অ্যানালাইসিস কমিটি ভেহিকলের কাজ না করার কারণগুলো নিখুঁতভাবে চিহ্নিত করেছিল। সেকেন্ড স্টেজ কন্ট্রোল সিস্টেমের ব্যর্থতার কারণেই দুর্ঘটনা ঘটেছে-এটা বোঝা গেল। দ্বিতীয় স্টেজ উড্ডয়নের সময় কোনো কন্ট্রোল ফোর্স না থাকায় ভেহিকল অ্যারোডাইনামিক ভাবে অস্থিত হয়ে পড়েছিল, এতে উচ্চতা ও গতি দুটোই হারাতে থাকে। এ কারণেই ভেহিকলটি সমুদ্রে পতিত হয়। অন্য স্টেজগুলো প্রজ্বলিত হওয়ার আগেই।
সেকেন্ড-স্টেজ ব্যর্থতার আরও ইন-ডেপথ বিশ্লেষণে দেখা যায়, ওই পর্যায়ে জ্বালানি শক্তির জন্য অক্সিডাইজার হিসাবে ব্যবহৃত বিপুল পরিমাণ রেড ফিউমিং নাইট্রিক এসিড (আরএফএনএ) নিঃসরণের ফলে কন্ট্রোল ফোর্স যখন প্রয়োজন হলো তখন কেবল জ্বালানি প্রক্ষিপ্ত হয়েছিল, পরিণতিতে ফোর্স হলো শূন্য। অন্যদিকে আরএফএনএ নিঃসরণের কারণ শনাক্ত করা গেল যে, অক্সিডাইজার ট্যাংকে একটা সলেনয়েড ভালভ উন্মুক্ত ছিল, টি-৮ মিনিটে প্রথম কমান্ডের পর সংক্রমণের জন্য।
আইএসআরওর শীর্ষ বিজ্ঞানীদের একটা মিটিঙে অধ্যাপক ধাওয়ানের কাছে এই তথ্যগুলো উপস্থাপন করা হয়েছিল আর তা গৃহীত হয়েছিল। ব্যর্থতা সামাল দিতে যে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল তা নিয়ে মিটিঙের সবারই সাধারণভাবে সন্তোষজনক মনোভাব ছিল। আমি কিন্তু তখনও নিজেকে প্রবোধ দিতে পারছিলাম না আর অস্থিরতা অনুভব করছিলাম।
আমি উঠে দাঁড়িয়ে অধ্যাপক ধাওয়ানকে সম্ভাষণ করে বললাম, স্যার, যদিও আমার বন্ধুরা যান্ত্রিক দিক থেকে এই ব্যর্থতার বিচার করেছেন, তবু আরএফএনএ ছিদ্র কাউন্টডাউনের চূড়ান্ত পর্যায়ে উপেক্ষা করার দায়িত্ব আমি নিচ্ছি। মিশন ডিরেক্টর হিসাবে, আমার উচিৎ ছিল উৎক্ষেপণ স্থগিত রাখা আর সম্ভব হলে ফ্লাইটটা রক্ষা করা। বিদেশে এ ধরনের ঘটনা ঘটলে মিশন ডিরেক্টরকে অপসারণ করা হতো। সুতরাং এসএলভি-৩ ব্যর্থতার দায়ভার আমি নিচ্ছি।
বেশ কিছু সময় হলের মধ্যে পিনপতন নিরবতা বিরাজ করল। অধ্যাপক ধাওয়ান তারপর উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, আমি কালামকে কক্ষপথে স্থাপন করতে যাচ্ছি!
তারপর মিটিং শেষ করার সংকেত দিয়ে স্থান ত্যাগ করলেন।
.
বিজ্ঞানের অভীষ্ট বস্তু হচ্ছে পরমোল্লাস ও বিশাল হতাশার একটা সমন্বিতরূপ। এই রকম অনেক ঘটনার কথা আমার মনে পড়ে। জোহানেস কেপলারের তিন কক্ষ পথের সূত্র মহাকাশ গবেষণার ভিত্তি গড়েছিল। কিন্তু সূর্যের চারপাশে গ্রহসমূহের ঘূর্ণন সম্পর্কে তার প্রথম দুটো ধারণা সূত্রবদ্ধ করার পর তার তৃতীয় সূত্রটি ঘোষণা করতে সময় লেগেছিল ১৭ বছর। কতবার ব্যর্থতা আর হতাশার ভেতর দিয়ে যেতে হয়েছিল তাকে? রুশ গণিতবিদ কনস্তান্তিন সিওলকভস্কি মানুষের চাদে পদার্পণের ধারণা সম্প্রসারিত করেছিলেন, কিন্তু তা বাস্তবায়িত হয়েছিল প্রায় চার দশক পর এবং যুক্তরাষ্ট্রের দ্বারা। অধ্যাপক চন্দ্রশেখরকে তার আবিষ্কৃত চন্দ্রশেখর লিমিট-এর জন্য নোবেল পুরস্কার পেতে অপেক্ষা করতে হয়েছিল প্রায় ৫০ বছর, ১৯৩০-এর দশকে ক্যামব্রিজে স্নাতক ছাত্র থাকাকালে তিনি এটা আবিষ্কার করেছিলেন। তার কাজ যদি সেই সময় স্বীকৃত হতো, তাহলে ব্ল্যাক হোল আবিষ্কারকে কয়েক দশক এগিয়ে নিতে পারত তা। কতবার ফন ব্রাউনকে ব্যর্থ হতে হয়েছিল তার স্যাটার্ন লঞ্চ ভেহিকল মানুষকে চাঁদে পৌঁছে দেবার আগে? এইসব চিন্তা আমাকে আবার পুরোদমে উঠে দাঁড়াতে সাহায্য করেছিল।
১৯৭৯ সালের নভেম্বর মাসের প্রথম দিকে অবসরে গেলেন ড. ব্রহ্ম প্রকাশ। ভিএসএসসিতে তিনি সবসময় ছিলেন আমার বিক্ষুব্ধ জলস্রোতে বিশ্বস্ত নোঙ্গর! দলীয় মনোবল বিষয়ে তার বিশ্বাস অনুপ্রাণিত করেছিল এসএলভি প্রকল্পের ব্যবস্থাপনা সংশ্লিষ্টদের, পরে এই ব্যবস্থাপনা প্যাটার্ন সারা দেশের বৈজ্ঞানিক প্রকল্পগুলোয় একটা ব্লু-প্রিন্টে পরিণত হয়েছিল। ড, ব্ৰহ্ম প্রকাশ ছিলেন অত্যন্ত জ্ঞানী পরামর্শক, যিনি আমাকে দিয়েছিলেন মূল্যবান পথের নির্দেশ।
অধ্যাপক সারাভাইয়ের কাছ থেকে আমি যে লক্ষণ পেয়েছিলাম তাতে ড. ব্রহ্ম প্রকাশ নতুন শক্তি জুগিয়েছিলেন শুধু তাই নয়, তাতে নতুন মাত্রা যোগ করতেও তিনি আমাকে সাহায্য করেছিলেন। তিনি আমাকে তাড়াহুড়োর বিরুদ্ধে সবসময় সাবধান করে দিতেন।
বড়ো বৈজ্ঞানিক প্রকল্প হচ্ছে পর্বতের মতো, সেখানে উঠতে হবে যত কম চেষ্টায় সম্ভব এবং কোনো রকম তাড়াহুড়ো না করে। তোমার নিজের প্রকৃতির বাস্তবতা নির্ধারণ করবে তোমার গতি। যদি তুমি অস্থির হও, গতি বাড়াও। যখন পীড়িত থাকবে, গতি কমাও। তোমাকে পর্বতে আরোহণ করতে হবে একটা সম্ভার অবস্থায়। তোমার প্রকল্পের প্রতিটা কাজ সমাপ্তির জন্য হয়ে অনন্য ঘটনা হয়ে উঠবে, তখন তুমি তা চমঙ্কারভাবে তা করতে পারবে, তিনি আমাকে বলেছিলেন।
