এসএলভি-৩ হার্ডওয়ারের উত্থানের যখন শুরু হয়, তখন আমাদের একাগ্রচিত্ততার সামর্থ্য বেড়ে গিয়েছিল লক্ষ্যণীয়ভাবে। আমি বিপুল আত্মবিশ্বাস অনুভব করতাম, নিজের ও এসএলভি-৩ প্রকল্পের প্রতি। প্রবাহ হচ্ছে নিয়ন্ত্রিত সক্রিয়তার একটা বাই-প্রডাক্ট। প্রথম চাহিদা হলো, যতটা পার কঠোর কাজ কর যা তোমার কাছে চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। আরেকটি বিষয় হলো বাধাবিঘ্নহীন সময়। আমার অভিজ্ঞতায় দেখেছি, আধঘন্টার কম সময়ের মধ্যে প্রবাহে ঢুকে পড়া কঠিন। আর বাধাবিঘ্ন থাকলে তো প্রায় অসম্ভব।
ফলপ্রসূভাবে শিক্ষা গ্রহণের জন্য যেমন একটা অবস্থা আমরা সৃষ্টি করি, তেমনভাবে কী এক ধরনের কন্ডিশনিং ডিভাইস ব্যবহার করে আমরা প্রবাহের মধ্যে ঢুকে পড়তে পারি? উত্তর হলো-হা, আর এর গুপ্তকথা হলো তুমি আগে যে প্রবাহের মধ্যে ছিলে সেই প্রবাহ বিশ্লেষণ করা। তুমি নিজেই শনাক্ত করতে পার সাধারণ বিভাজকগুলো। এই বিভাজকগুলো যদি বিচ্ছিন্ন করে ফেলতে পার, তাহলে তুমি প্রবাহের জন্য মঞ্চ তৈরি করতে পারবে।
এই অবস্থার অভিজ্ঞতা হয়েছে আমার বহুবার। এসএলভি মিশনে প্রায় প্রতিদিন গবেষণাগারে ঘন্টার পর ঘন্টা গেছে যখন আমি চোখ তুলে দেখেছি গবেষণাগার ফাঁকা, তখন বুঝতে পেরেছি কাজের সময় শেষ হয়েছে অনেক আগেই আর সবাই চলে গেছে। আবার অন্যান্য দিনে দেখেছি, আমার দলের সদস্যরা ও আমি কাজে এমনই আটকা পড়ে গেছি যে আমাদের মধ্যাহ্নভোজের সময় পেরিয়ে গেলেও কেউ বুঝতেই পারিনি আমরা ক্ষুধার্ত।
প্রকল্প যতই শেষের দিকে যাচ্ছিল ততই আমাদের এই অভিজ্ঞতা হচ্ছিল। আমি এও উপলব্ধি করেছিলাম যে, অফিস যেদিন আপাত শান্ত থাকে সেদিনও এই ঝোঁক থাকে প্রবলভাবে। এরকম প্রভাব ফ্রিকোয়েন্সিতে বর্ধিত হয়েছিল দারুণভাবে, এবং এসএলভি-৩ এর স্বপ্ন শেষ পর্যন্ত সত্য হলো ১৯৭৯ সালের মাঝামাঝিতে।
আমরা এসএলভি-৩ এর প্রথম পরীক্ষামূলক উড্ডয়নের তারিখ নির্ধারণ করেছিলাম ১০ অগাস্ট ১৯৭৯। মিশনের প্রাথমিক লক্ষ্য ছিল একটা পুরোপুরি ইন্টিগ্রেটেড লঞ্চ ভেহিকল প্রস্তুত করা; স্টেজ মোটর, গাইডেন্স অ্যান্ড কন্ট্রোল সিস্টেম ও ইলেকট্রনিক সাবসিস্টেমের মতো অন-বোর্ড সিস্টেমগুলোর মূল্যায়ন করা; আর গ্রাউন্ড সিস্টেম মূল্যায়ন করা, যেমন চেকআউট, ট্র্যাকিং, টেলিমেট্রি ও শ্রীহরিকোটা লঞ্চ কমপ্লেক্সে তৈরি লঞ্চ অপারেশনের রিয়াল-টাইম ডাটা ফ্যাসিলিটিজ। ২৩ মিটার লম্বা, ১৭ টন ওজনের ফোর-স্টেজ এসএলভি রকেট শেষ পর্যন্ত ০৭৫৮ ঘন্টায় চমৎকারভাবে উড্ডয়ন করল এবং অনতিবিলম্বে পূর্ব নির্ধারিত ট্রাজেক্টরিতে চলতে শুরু করল।
স্টেজ ১ কাজ করল নিখুঁতভাবে। এই স্টেজ থেকে দ্বিতীয় স্টেজে অতিক্রমণ ঘটল মসৃণভাবে। এসএলভি-৩–এর আকার নিয়ে আমাদের স্বপ্ন আকাশে উড়ছে দেখে আমরা মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে পড়লাম। অকস্মাৎ জাদুমন্ত্র ভেঙে গেল। দ্বিতীয় স্টেজ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। এই ফ্লাইটের অবসান ঘটল ৩১৭ সেকেন্ড পর এবং ভেহিকলের অবশিষ্ট অংশ, পেলোডযুক্ত আমার প্রিয় চতুর্থ স্টেজসহ, সমুদ্রে নিক্ষিপ্ত হলো, শ্রীহরিকোটা থেকে ৫৬০ কিলোমিটার দূরে।
এ ঘটনায় আমরা দারুণভাবে হতাশ হয়েছিলাম। ক্রোধ আর হতাশার অদ্ভুত এক মিশ্র অনুভব করলাম আমি। হঠাৎ আমি অনুভব করলাম, আমার পা এমনভাবে শক্ত হয়ে গেছে যে যন্ত্রণা করছে। সমস্যাটা আমার দেহে ছিল না। সমস্যাটা ছিল আমার মনে। আমার মনের মধ্যে কিছু একটা ঘটেছিল।
আমার হোভারক্র্যাফট নন্দীর অকালমৃত্যু, আরএটিও পরিত্যাগ, এসএলভি ডায়মন্ট ফোর্থ স্টেজের ব্যর্থতা। সবকিছু যেন জীবন্ত হয়ে উঠল চোখের সামনে, যেন অনেকদিন আগে কবর দেওয়া কোনো ফিনিক্স পাখি আচমকা উঠে এল ছাই থেকে। বিগত বছরগুলোয় আমি কোনো রকমে এসব ব্যর্থ প্রচেষ্টা আত্মভূত করতে শিখেছিলাম, ওগুলো ভুলে নতুন স্বপ্ন বাস্তবায়নে মগ্ন হয়েছিলাম। কিন্তু এইবার আমার চরম নৈরাশ্যের মধ্যে সেইসব বাধাবিপত্তিগুলোর প্রত্যেকটি আবার জীবন্ত হতে দেখলাম।
এর কারণ কী হতে পারে বলে আপনি মনে করেন? ব্লক হাউজে কেউ আমাকে জিজ্ঞেস করলেন।
আমি একটা উত্তর খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা করলাম, কিন্তু এ নিয়ে ভাবার বা উত্তর খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা করার মতো অবস্থা আমার ছিল না, তাই ওটা বাদ দিলাম। উৎক্ষেপণ পরিচালিত হয়েছিল খুব সকালে, সারা রাত কাউন্ট-ডাউনের পর। অধিকন্তু, তার আগের এক সপ্তাহ আমি ঘুমানোর সুযোগ পাইনি। আর তাই যেমন মানসিকভাবে ঠিক তেমনি শারীরিকভাবেও ক্লান্তিতে পুরোপুরি নিঃশেষিত হয়ে গিয়েছিলাম। তাই সোজা নিজের কামরায় ফিরে গিয়ে বিছানায় ধপাস করে শুয়ে পড়লাম।
আমার কাঁধে কোমল একটা স্পর্শে আমি জেগে উঠলাম। তখন অপরাহ্ন পেরিয়ে গেছে, প্রায় সন্ধ্যার কাছাকাছি। ড. ব্রহ্ম প্রকাশকে দেখতে পেলাম বসে আছেন আমার বিছানার পাশে। লাঞ্চ খেতে যাবেন না? তিনি জিজ্ঞেস করলেন। তার স্নেহপরায়ণতা ও উদ্বিগ্নতায় গভীরভাবে আলোড়িত হলাম। পরবর্তীতে আমি আবিষ্কার করেছিলাম, ড. ব্রহ্ম প্রকাশ তার আগে আমার কামরায় আরও দুবার এসেছিলেন, কিন্তু আমাকে ঘুমন্ত দেখে চলে গিয়েছিলেন। কখন ঘুম থেকে জেগে তার সঙ্গে লাঞ্চ করব তারই অপেক্ষায় ছিলেন তিনি সেই পুরো সময়টা। আমি ব্যথিত ছিলাম, কিন্তু এককভাবে নয়। ড. ব্রহ্ম প্রকাশের সঙ্গ আমাকে নতুন এক আত্মবিশ্বাসে পূর্ণ করে তুলল। তিনি খাবার সময় হালকা কথাবার্তা বললেন, সতর্কতার সঙ্গে এসএলভি-৩ প্রসঙ্গ এড়িয়ে গেলেন, কিন্তু কোমলভাবে তার কথাবার্তা আমাকে প্রবোধ দিচ্ছিল।
