ফন ব্রাউনের মধ্যে আমি অধ্যাপক বিক্রম সারাভাইয়ের কিছু দেখলাম ভাবতেই আমার আনন্দ হয়েছিল।
.
পরিবারে তিনটি মৃত্যুর পর নিজের কাজ চালিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার করা দরকার হলো আমার মনের কাছে। আমার সম্পূর্ণ সত্ত্বাটাকে এসএলভি সৃষ্টিতে নিমগ্ন রাখতে চেয়েছিলাম আমি। যে পথ আমাকে অনুসরণ করতে হবে সেই পথ যেন আবিষ্কার করেছি বলে আমার মনে হলো। আর সে পথ হলো আমার জন্য আল্লাহর মিশন এবং তার পৃথিবীতে আমার উদ্দেশ্য। এই সময়কালে আমি যেন যন্ত্রচালিত হয়ে গিয়েছিলাম সন্ধ্যাবেলায় ব্যাডমিন্টন খেলতাম, ছুটির দিনগুলো উদযাপন করতাম না, পরিবারের সঙ্গে বা আত্মীয়দের সঙ্গে যোগাযোগ ছিল না, এমনকি এসএলভি পরিমন্ডলের বাইরে কারো সঙ্গে বন্ধুত্বও ছিল না।
তোমার মিশন সফল করতে হলে, তোমাকে সব চিন্তা বাদ দিয়ে অবশ্যই একাগ্রচিত্ততার সঙ্গে নিজেকে উৎসর্গ করতে হবে তোমার লক্ষ্যের দিকে। আমার মতো ব্যক্তিদের প্রায়শই কর্মাসক্ত বলে অভিহিত করা হয়। এই টার্ম নিয়ে আমার প্রশ্ন আছে। কারণ এটা থেকে প্যাথলজিক্যাল অবস্থা বা অসুস্থতা বোঝান হয়। দুনিয়ায় অন্য আর কোনো কিছুর চেয়ে যা আমার অধিক কাঙ্খিত এবং যা আমাকে আনন্দিত করে তা যদি আমি করি, তাহলে সে কাজ কখনই বিপথগামিতা হতে পারে না। আমি যখন কাজ করি তখন বাইবেলের ছাব্বিশতম চরণ আমার মনে আসে: আমাকে পরীক্ষা কর, হে প্রভু, আর প্রমাণিত কর।
যারা নিজের পেশার সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছাতে চায় তাদের ক্ষেত্রে টোটাল কমিটমেন্ট একটা বড়ো রকমের কোয়ালিটি। আমার সঙ্গে এমন অনেকে ছিলেন যারা ৪০ ঘণ্টায় এক সপ্তাহ হিসাবে কাজ করতেন। কিন্তু অন্য অনেককে চিনতাম যারা কাজ করতেন সপ্তাহে ৬০, ৮০ এমনকি ২০০ ঘণ্টা পর্যন্ত। কারণ তারা কাজের মধ্যে প্রাণের উত্তেজনা ও পুরস্কার খুঁজে পেয়েছিলেন। সমস্ত সফল নারীপুরুষের মধ্যে একটা সাধারণ বিষয় এই টোটাল কমিটমেন্ট। একজন উদ্যমী ও একজন বিভ্রান্ত মানুষের মধ্যে পার্থক্য হচ্ছে, তাদের অভিজ্ঞতাকে তাদের মন যেভাবে ব্যবহার করে তার মধ্যে পার্থক্য। মানুষের প্রতিবন্ধকতা দরকার, কারণ সাফল্য উপভোগের জন্য এর প্রয়োজন। আমাদের সবার মধ্যেই এক ধরনের সুপার-ইন্টেলিজেন্স আছে। একে সঞ্চারিত করা উচিৎ যাতে আমরা পরীক্ষা করতে সমর্থ হই আমাদের গভীর ভাবনা, আকাঙ্ক্ষা ও বিশ্বাস।
তোমার এজন্য আরও প্রয়োজন সুস্বাস্থ্য আর সীমাহীন শক্তি! শীর্ষে উঠতে হলে। শক্তি লাগবে, সে এভারেস্ট পর্বতের শীর্ষই হোক আর তোমার ক্যারিয়ারের শীর্ষই হোক। লোকেরা বিভিন্ন প্রকার শক্তির মজুত নিয়ে জন্মায় এবং যারা ক্লান্ত হয় প্রথমে আর সহজেই নিঃশেষিত হয় তারা প্রথম দিকেই নিজ নিজ জীবন ভালোভাবে পুনর্গঠিত করতে পারে।
১৯৭৯ সালে ছয় সদস্যের একটি দল স্ট্যাটিক টেস্ট ও মূল্যায়নের জন্য একটা জটিল সেকেন্ড স্টেজ কন্ট্রোল সিস্টেমের ফ্লাইট ভার্সন প্রস্তুত করছিল। টি১৫ মিনিটে (পরীক্ষার আগের ১৫ মিনিট) দল মনোযোগী ছিল কাউন্টডাউন মোডে। বারোটা ভালভের একটা চেকআউটের সময় সাড়া দিল না। দলের সদস্যদের মধ্যে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়ল। হঠাৎ করে রেড ফিউমিং নাইট্রিক এসিড (আরএফএনএ) পূর্ণ অক্সিডাইজারের ট্যাংক বিস্ফোরিত হলো, তাতে এসিড দগ্ধ হলো দলের সদস্যরা। তাদের ভোগান্তি দেখাটা ছিল এক নির্মম অভিজ্ঞতা। কুরুপ ও আমি দ্রুত ছুটে গেলাম ত্রিবান্দ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে আর আমাদের ছয় সহকর্মীকে ভর্তি করে নেবার আকুতি জানালাম; ওই সময়ে হাসপাতালে কোনো বেড খালি ছিল না।
এসিড দগ্ধদের একজন ছিলেন শিবরামকৃষ্ণন নায়ার। তার শরীরের অনেকগুলো স্থান পুড়ে গিয়েছিল। হাসপাতালে আমরা একটা বেডের ব্যবস্থা করছিলাম যখন, তিনি প্রচণ্ড যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছিলেন। আমি তার বেডের পাশে রাত জেগে বসে থাকলাম। রাত প্রায় ৩টার দিকে জ্ঞান ফিরে পেলেন শিবরামকৃষ্ণন। তখন তিনি প্রথমেই দুর্ঘটনার জন্য দুঃখ প্রকাশ করলেন এবং আমাকে আশ্বস্ত করে বললেন দুর্ঘটনার কারণে যে ভুলত্রুটি হয়েছে তা তিনি ঠিক করে দেবেন নির্ধারিত সময়ের ভেতরেই। ভয়ংকর যন্ত্রণার মধ্যেও তার সততা ও আশাবাদ আমাকে গভীর আলোড়িত করল।
শিবরামকৃষ্ণনের মতো লোকেরা জন্ম থেকেই আলাদা। এই ঘটনা আমার দলের প্রতি আমার আস্থা ভীষণভাবে বাড়িয়ে দিয়েছিল, যে দল সাফল্যে ও ব্যর্থতায় দাঁড়িয়ে থাকবে পাথরের মতো।
.
আমি অনেক জায়গায় প্রবাহ শব্দটা ব্যবহার করেছি এর আসল অর্থটা বিস্তারিত ব্যাখ্যা না করে। এই প্রবাহ জিনিসটা কী? আর এই আনন্দ? আমি এসবকে বলতে পারতাম জাদুর মুহূর্ত। প্রবাহ হচ্ছে একটা সেনসেশন, যখন আমরা সামগ্রিক সত্ত্বা দিয়ে কোনো কিছু করি তখন এর স্পর্শ পাই। প্রবাহের সময়, অভ্যন্তরীণ একটা যুক্তি অনুযায়ী ক্রিয়া অনুসরণ করে ক্রিয়াকে, কর্মীর কোনো অংশে সচেতন হস্তক্ষেপের যার প্রয়োজন নেই বলে মনে হয়। কোনো তাড়া নেই: কারোর মনোযোগের ওপর কোনো চাহিদা নেই, অতীত ও ভবিষ্যৎ উধাও হয়ে যায়, ব্যক্তি ও সক্রিয়তার মধ্যে পার্থক্যও তাই করে। আমরা সবাই এসএলভি প্রবাহের মধ্যে জড়ো হয়েছিলাম। যদিও আমরা কঠোর পরিশ্রম করছিলাম, তবুও আমরা অত্যন্ত রিলাক্স, উদ্যমী ও তাজা ছিলাম। কীভাবে এটা সম্ভব হয়েছিল? কে সৃষ্টি করেছিল এই প্রবাহ?? হয়তো এটা ছিল আমাদের কাঙ্খিত লক্ষ্যের অর্থপূর্ণ সংগঠন। আমরা বিস্তৃত লক্ষ্য চিহ্নিত করতাম, তারপর কাজ করতাম বিভিন্ন বিকল্প থেকে লক্ষ্য পূরণের। সমস্যা সমাধানে একটা সৃজনশীল পরিবর্তন আসত, তা আমাদের স্থাপন করত প্রবাহের মধ্যে।
