পরদিন সকালে আমি ফিরে এসেছিলাম থুম্বায়, শারীরিক ভাবে ক্লান্ত, আবেগের দিক থেকে ভগ্ন, কিন্তু বিদেশের মাটিতে একটা ভারতীয় রকেট মোটর ওডানোর আমাদের উচ্চাকাঙ্খ পরিপূর্ণ করতে দৃঢ়প্রত্যয়ী।
এসএলভি-৩ অ্যাপোজি মোটরের সফল পরীক্ষার পর ফান্স থেকে আমি ফিরে এলে ড. ব্ৰহ্ম প্রকাশ আমাকে একদিন ভের্নার ফন ব্রাউনের আগমন সম্পর্কে জানালেন। রকেট বিজ্ঞানে কর্মরত প্রত্যেকেই ফন ব্রাউন সম্পর্কে জানতেন। তিনি মারাত্মক V-2 ক্ষেপণাস্ত্র প্রস্তুত করেছিলেন যা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে লন্ডনকে বিধ্বস্ত করেছিল। যুদ্ধের চূড়ান্ত পর্যায়ে মিত্রবাহিনীর হাতে ধরা পড়েন ফন ব্রাউন। তার প্রতিভার প্রতি সম্মান দেখিয়ে ফন ব্রাউনকে নাসার রকেটবিজ্ঞান কর্মসূচিতে শীর্ষপদে বসান হয়। মার্কিন সেনাবাহিনীর পক্ষে কর্মরত ফন ব্রাউন যুগান্তকারী জুপিটার ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করেন, যেটা ছিল ৩০০০ কি.মি. পাল্লার প্রথম আইআরবিএম। উ, ব্রহ্ম প্রকাশ যখন মাদ্রাজে ফন ব্রাউনকে গ্রহণ করে থুম্বায় এস্কর্ট করে নিয়ে যাবার জন্য বললেন আমাকে, আমি তখন স্বাভাবিকভাবেই উত্তেজিত হয়ে পড়লাম।
V-2 মিসাইল (জার্মান শব্দ Vergeitungswaffe-এর সংক্ষেপ) ছিল রকেট ও মিসাইলের ইতিহাসে বিশালতম একক অর্জন। ১৯২০-এর দশকে ভিএফআর (সসাসাইটি ফর স্পেস ফ্লাইট)-এ ফন ব্রাউন ও তার দলের প্রচেষ্টায় এই অর্জন সম্ভব হয়েছিল। বেসামরিক প্রচেষ্টা হিসাবে যা আরম্ভ হয়েছিল, শীঘ্রই তা পরিণত হলো সামরিক বাহিনীর কর্মকান্ডে, এবং ফন ব্রাউন পরিণত হলেন কুমেডর্ফে অবস্থিত জার্মান মিসাইল ল্যাবরেটরির টেকনিক্যাল ডিরেক্টর। প্রথম V-2 মিসাইল পরীক্ষা করা হয় ১৯৪২ সালের জুন মাসে। ওই পরীক্ষা ছিল অসফল। মিসাইলটা একপাশে কাত হয়ে পড়ে বিস্ফোরিত হয়েছিল। কিন্তু ১৯৪২ সালের ১৬ অগাস্ট এটা পরিণত হয় শব্দের গতি ছাড়িয়ে যাওয়া প্রথম মিসাইলে। ফন ব্রাউনের তত্ত্বাবধানে, জার্মানির নর্ডহাউসেনের কাছে বিশাল ভূগর্ভস্থ উৎপাদন ইউনিটে, ১৯৪৪ সালের এপ্রিল থেকে অক্টোবরের মধ্যে ১০ হাজারেরও বেশি v-2 মিসাইল নির্মাণ করা হয়েছিল। সেই মানুষটার সঙ্গে আমি ভ্রমণ করব একজন বিজ্ঞানী, একজন ডিজাইনার, একজন প্রডাকশন ইঞ্জিনিয়ার, একজন প্রশাসক, একজন টেকনোলজি ম্যানেজার সবকিছু। আমি বেশি আর কী চাইতে পারতাম? আমরা একটা অ্যাভ্র বিমানে চড়ে প্রায় ৯০ মিনিট আকাশভ্রমণ শেষে মাদ্রাজ থেকে ত্রিবান্দ্রামে পৌঁছলাম। ফন ব্রাউন আমাদের কাজ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলেন এবং আমার বর্ণনা শুনলেন যেন তিনি। রকেট বিজ্ঞানের একজন ছাত্র। আমি কখনই আশা করিনি যে, আধুনিক রকেট বিজ্ঞানের জনক অতটা বিনয়ী হবেন, অতটা গ্রহণশীল আর প্রেরণাদায়ক হবেন। পুরো বিমান ভ্রমণের সময়টায় তার আচরণে আমি স্বস্তি অনুভব করলাম। এটা কল্পনা করা কঠিন ছিল যে মিসাইল সিস্টেমের এক মহাপন্ডিতের সঙ্গে আমি কথা বলছিলাম।
তিনি পর্যবেক্ষণ করলেন যে এসএলভি-৩-এর ডায়ামিটার LD অনুপাতের দৈর্ঘ্য, যা ডিজাইন করা হয়েছিল ২২ পর্যন্ত, তা ছিল উচ্চতর পাশে এবং তিনি আমাকে সাবধান করে দিলেন অ্যারো-ইলাস্টিক সমস্যা সম্পর্কে, উড্ডয়ন কালে যা অবশ্যই এড়িয়ে যেতে হবে।
তার কর্মজীবনের প্রধান অংশটা জার্মানিতে খরচ করার পর, আমেরিকায় তিনি কেমন বোধ করছিলেন? এই প্রশ্ন আমি করেছিলাম ফন ব্রাউনকে, এপোলো মিশনে স্যাটার্ন রকেট তৈরির পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে যিনি পরিণত হয়েছিলেন কাল্ট ফিগারে। এপোলো মিশন মানুষকে চাদে নিয়ে গিয়েছিল। আমেরিকা একটা বিশাল সম্ভাবনার দেশ, কিন্তু অ-আমেরিকান সবকিছুর প্রতি তারা সন্দেহ নিয়ে তাকায়। তারা সবসময় একটা NIHANot Invented HereHকমপ্লেক্সে ভোগে এবং বিদেশি প্রযুক্তির দিকে দৃষ্টিপাত করে। রকেট বিজ্ঞান নিয়ে যদি তুমি কিছু করতে চাও তাহলে তা নিজেই কর, ফন ব্রাউন আমাকে পরামর্শ দিলেন। তিনি মন্তব্য করলেন, এসএলভি-তে একেবারে বিশুদ্ধ ভারতীয় ডিজাইন এবং তুমি হয়তো তোমার নিজের সমস্যায় জড়াচ্ছ। কিন্তু তুমি সবসময় মনে রাখবে যে আমরা শুধু সাফল্যের ওপরেই গড়ি না, আমরা ব্যর্থতার ওপরেও গড়ি।
রকেট নির্মাণে অপরিহার্য কঠোর কাজ ও অঙ্গীকারের বিষয়ে তিনি হাসলেন আর চোখে দুষ্টুমির ভাব নিয়ে বললেন, কঠোর কাজই শুধু যথেষ্ট নয় রকেট বিজ্ঞানে। এটা কোনো খেলা নয় যেখানে কঠোর কাজ তোমাকে সম্মান এনে দেবে। এখানে, তোমার শুধু লক্ষ্য থাকলেই চলবে না, যত দ্রুত সম্ভব লক্ষ্য অর্জনের কৌশলও থাকতে হবে। পূর্ণ অঙ্গীকার ঠিক কঠোর কাজ নয়; এটা হচ্ছে পূর্ণ সংশ্লিষ্টতা। পাথরের দেওয়াল নির্মাণ হচ্ছে একটা হাড়ভাঙা কাজ। কিছু লোক আছে যারা সারা জীবন পাথরের দেওয়াল বানায়। আর তারা যখন মারা যায়, তখন দেখা যায় মাইলের পর মাইল দেওয়াল, ওই লোকেরা কি কঠোর কাজ করেছিল তার নীরব সাক্ষী।
তিনি বলতেই থাকলেন, কিন্তু অন্য মানুষও আছে, একটা পাথর আরেকটার ওপর স্থাপন করার সময় যাদের মনে থাকে একটা দৃশ্য, একটা লক্ষ্য। এটা হতে পারে একটা চত্বর, যেখানে পাথরের দেওয়ালের ওপর উঠেছে গোলাপ এবং গ্রীষ্মের অলস দিনের জন্য বাইরে পাতা হয়েছে চেয়ার। কিংবা পাথরের দেয়াল হয়তো, পরিবেষ্টন করতে পারে একটা আপেল বাগান অথবা একটা বাউন্ডারির চিহ্ন। যখন তারা কাজ শেষ করে, তখন একটা দেওয়ালের চেয়েও বেশি কিছু পায় তারা। এটা সেই লক্ষ্য যা পার্থক্য তৈরি করে। রকেট বিজ্ঞানকে তোমার পেশা কর না, কিংবা জীবিকা-এটাকে বানাও তোমার ধর্ম, তোমার মিশন।
