প্রকল্প ব্যবস্থাপনার সবচেয়ে বড়ো সমস্যা হচ্ছে বিভিন্ন ব্যক্তি ও কর্মকেন্দ্রের মধ্যে নিয়মিত ও দক্ষ ইন্টারফেসিং প্রতিষ্ঠা করা। এই কঠিন বিষয়টা আমরা শিখেছিলাম। যথাযথ সমন্বয়ের অনুপস্থিতিতে কঠিন কাজ অবজ্ঞা করা যেতে পারে।
সেই সময়টাতে আইএসআরওর ওয়াইএস রাজনকে আমার বন্ধু হিসাবে পাওয়ার সৌভাগ্য ঘটেছিল। রাজন ছিলেন (এবং আছেন) এক সর্বজনীন বন্ধু। টার্নার, ফিটার, ইলেকট্রিশিয়ান, ড্রাইভার থেকে শুরু করে বিজ্ঞানী, প্রকৌশলী, কন্ট্রাক্টর, আমলা প্রমুখ সবার বন্ধু ছিলেন তিনি। আজ যখন সংবাদ মাধ্যম আমাকে জনতার ঢালাইকর হিসাবে আখ্যায়িত করে, তখন আমি এই স্বীকৃতি উৎসর্গ করি রাজনকে। বিভিন্ন কর্মকেন্দ্রের সঙ্গে তার নিবিড় মিথস্ক্রিয়া এসএলভিতে এমন এক ঐকতান সৃষ্টি করেছিল যে ব্যক্তি প্রচেষ্টার সুতোয় বোনা হয়েছিল বিশাল শক্তির এক বিপুল বস্ত্র।
.
১৯৭৬ সালে আমার পিতা ইন্তেকাল করলেন। তিনি বেশ কিছুদিন ধরে বার্ধক্যজনিত সমস্যায় ভুগছিলেন। তার স্বাস্থ্য ভেঙে পড়ার আরও একটা কারণ ছিল জালালুদ্দিনের মতো। তিনি বেঁচে থাকার আকাক্ষা হারিয়ে ফেলেছিলেন, যেন জালালুদ্দিনকে তার দিব্যজগতে ফিরে যেতে দেখে তিনিও সেখানে ফিরে যাবার জন্য উতলা হয়ে উঠেছিলেন।
আমি যখনই বাবার শরীর খারাপের কথা জানতে পারতাম তখনই শহর থেকে একজন ভালো ডাক্তার নিয়ে যেতাম রামেশ্বরমে। বাবা আমার অপ্রয়োজনীয় উদ্বেগের কারণে ভর্ৎসনা করতেন আর ডাক্তারের পেছনে অর্থব্যয় সম্পর্কে বক্তৃতা শোনাতেন। তোমার আসাটাই আমার সুস্থ হয়ে ওঠার জন্য যথেষ্ট, ডাক্তার এনে তার ফি বাবদ অত টাকা খরচ করার দরকার কি? তিনি বলতেন। এবার তার অবস্থা চলে গিয়েছিল যে কোনো ডাক্তারের সামর্থ্যের বাইরে। আমার বাবা জয়নুলাবদিন, রামেশ্বরম দ্বীপে যিনি জীবন কাটিয়েছেন ১০২ বছর, তিনি পরলোক গমন করেন আর পেছনে রেখে যান পনেরোজন নাতিনাতনি, একজন প্রতি। তিনি একটা দৃষ্টান্তমূলক জীবনযাপন করেছিলেন। তাকে কবর দেবার পর রাতের বেলা একা বসে আমি একটি কবিতার কথা স্মরণ করলাম, অডেন তার বন্ধু ইয়েটস্-এর মৃত্যুতে সে কবিতা লিখেছিলেন, আর অনুভব করলাম যেন সে। কবিতা লেখা হয়েছে আমার বাবার জন্যই:
Earth, receive an honoured guest:
William Yeats is laid to rest :
…….
In the prison of his days
Teach the free man how to praise.
প্রকৃতির নিয়মে এটা ছিল মাত্র আরেকজন বৃদ্ধ মানুষের মৃত্যু। সর্বসাধারণের কোনো শোকসভা আয়োজন করা হয়নি, কোনো পতাকা অর্ধনমিত রাখা হয়নি, কোনো সংবাদপত্র তার মৃত্যুসংবাদ প্রকাশ করেনি। তিনি কোনো রাজনীতিক, পন্ডিত বা ব্যবসায়ী ছিলেন না। তিনি ছিলেন সাদাসিধে ও স্বচ্ছ মানুষ। আমার বাবা অবলম্বন করেছিলেন সর্বোচ্চ মূল্যবোধ, সততা। তার জীবন তাদের বেড়ে ওঠায় অনুপ্রেরণা যুগিয়েছিল, যারা ছিল সদাশয়, দেবোপম, বিজ্ঞ ও মহৎ।
আমার বাবা সবসময় আমাকে মনে করিয়ে দিতেন কিংবদন্তির আবু বেন আদহামের কথা। আবু বেন আদহাম একরাতে শান্তির এক গভীর স্বপ্ন থেকে জেগে উঠে দেখতে পেল একজন ফেরেশতা সোনার একটা গ্রন্থে সেই ব্যক্তিদের নাম লিখছে যারা স্রষ্টাকে ভালোবাসে। আবু জানতে চাইল তালিকায় তার নাম আছে কিনা। ফেরেশতা নেতিবাচক উত্তর দিল। হতাশ হলেও তখনও উষ্ণু আবু বলল, সহগামী লোকদের ভালোবাসি এই হিসাবে আমার নাম লেখ। ফেরেশতা লিখল তার নাম, এবং অদৃশ্য হয়ে গেল। পরের রাতে আবারও সবকিছু আলোকিত করে ফেরেশতা এল। তারপর সেসব লোকের নামের তালিকা দেখাল যাদের প্রতি স্রষ্টার ভালোবাসা বর্ষিত হয়েছে। তালিকার প্রথমেই ছিল আবুর নাম।
আমি দীর্ঘ সময় মায়ের সঙ্গে বসে থাকলাম, কিন্তু কোনো কথা বলতে পারলাম না। ভাঙা গলায় তিনি আমাকে আশীর্বাদ করলেন যখন আমি থুম্বায় ফিরে যাবার জন্য তার কাছ থেকে বিদায় নিলাম। তিনি জানতেন যে, তার স্বামীর বাড়ি তিনি ছেড়ে যাবেন না, যে বাড়ির জামিনদার ছিলেন তিনি, আর আমিও তার সঙ্গে এখানে বসবাস করব না। আমাদের দুজনকেই যার যার নিয়তি অনুযায়ী ভিন্ন স্থানে জীবনযাপন করতে হবে। এসএলভি কি আমার ওপর অতিমাত্রায় চেপে বসেছিল? মায়ের কথা শোনার জন্য কিছু সময়ের জন্য কি আমার নিজের ব্যাপার ভুলে যেতে পারতাম না? অল্প কিছুদিন পর তিনি যখন পরলোকগমন করলেন, কেবল তখনই এটা আমি উপলব্ধি করেছিলাম।
সএলভি-৩ অ্যাপোজি রকেট উন্নত করা হয়েছিল ডায়মন্টের একটা কমন আপার স্টেজ হিসাবে। ফ্রান্সে এই রকেটটির পরীক্ষামূলক উড্ডয়নের শিডিউল ছিল। কিন্তু বেশ কয়েকটি জট-পাকান সমস্যার কারণে তাতে বিঘ্ন ঘটল। সমস্যাগুলো বের করতে আমাকে দ্রুত ছুটতে হলো ফ্রান্সে। আমি দেশ ছাড়ার আগে, শেষ বিকেলে, আমাকে জানান হলো যে আমার মা ইন্তেকাল করেছেন। নাগার কয়েলের প্রথম যে বাসটা পেলাম সেটাই ধরলাম। সেখান থেকে ট্রেনে পুরো একটা রাত খরচ করলাম। রামেশ্বরমে পৌঁছানোর জন্য, আর সেখানে পরদিন সকালে পৌঁছে দাফনের শেষ অংশে যোগ দিতে সক্ষম হলাম। যে দুজন মানুষ আমাকে গঠন করেছিলেন তারা দুজনেই আমাকে ছেড়ে চলে গেলেন তাদের দিব্যজগতে। পরলোকগতরা তাদের যাত্রার শেষ প্রান্তে পৌঁছে গিয়েছিলেন। বাকি আমাদের সবার যাত্রা চলতে থাকবে উৎকণ্ঠিত পথে আর জীবনও চলতে থাকবে। যে মসজিদে বাবা আমাকে প্রতি সন্ধ্যায় নিয়ে যেতেন সেখানে আমি প্রার্থনা করলাম। আমি স্রষ্টাকে বললাম যে, আমার মা পৃথিবীতে বেশিদিন জীবন যাপন করতে পারতেন না তার স্বামীর যত্ন ও ভালোবাসা ছাড়া, অতঃপর আকাঙ্ক্ষা করেছিলেন তার সঙ্গে মিলিত হওয়ার। আমি স্রষ্টার কাছে ক্ষমাপ্রার্থনা করলাম। আমি যে কাজের ডিজাইন করেছিলাম সে কাজ তারা সম্পূর্ণ করেছে বিপুল যত্ন, আত্মোত্সর্গ এবং সততা সহকারে এবং তারা আমার কাছেই ফিরে এসেছে। তাদের সম্পূর্ণতার দিনে তুমি কেন সন্তাপ করছ? তোমার প্রতি অর্পিত দায়িত্বের ওপর মনোযোগ কেন্দ্রীভূত কর, আর তোমার কাজের ভেতর দিয়ে আমার গৌরব ছড়িয়ে দাও! এই কথাগুলো কেউ বলেনি, কিন্তু আমি তা পরিষ্কার শুনতে পেলাম। মৃত্যুর পর দেহ ছেড়ে যাওয়া আত্মা সম্পর্কে কুরআনে বর্ণিত প্রেরণাদায়ক বাণীতে আমার মন পূর্ণ হয়ে উঠল: তোমাদের ধনসম্পদ ও সন্তান শুধুমাত্র পরীক্ষা, পক্ষান্তরে আল্লাহ! তিনিই অনন্ত পুরস্কার। আমি মসজিদ থেকে মনের শান্তি নিয়ে বেরিয়ে এলাম এবং এগিয়ে চললাম রেলওয়ে স্টেশনের দিকে। আমার সবসময় মনে পড়ে, যখনই আজান হতো তখনই আমাদের বাড়িটা একটা ছোটো মসজিদে রূপান্তরিত হতো। আমার বাবা ও আমার মা নেতৃত্ব দিতেন, আর তাদের সন্তান ও নাতিনাতনিরা তাদের অনুসরণ করত।
