.
সৃষ্টির যে কোনো ক্রিয়ার মতো, এসএলভি-৩ সৃষ্টিতেও ছিল বেদনা। একদিন, যখন আমি ও আমার দল পুরোপুরি ব্যস্ত ছিলাম ফাস্ট স্টেজ মোটর পরীক্ষার প্রস্তুতিতে, তখন পরিবারের একটা মৃত্যুর খবর এসে পৌঁছাল আমার কাছে। আমার ভগ্নিপতি ও বিজ্ঞ পরামর্শদাতা জনাব আহমেদ জালালুদ্দিন আর নেই। কয়েক মিনিট আমি পাথরের মতো দমে গেলাম, আমি ভাবতে পারছিলাম না, কিছুই অনুভব করতে পারছিলাম না। যখন আরও একবার আমার চারপাশে তাকালাম আর কাজে অংশ নেওয়ার চেষ্টা করলাম, তখন আবিষ্কার করলাম আমি অসংলগ্ন কথা বলছি আর তখনই আমি উপলব্ধি করলাম যে, জালালুদ্দিনের সঙ্গে আমার নিজেরও একটা অংশ মারা গেছে। আমার শৈশব স্মৃতির একটা দৃশ্য পুনরায় ভেসে উঠল চোখের সামনে রামেশ্বরম মন্দিরের চারপাশে সন্ধ্যা বেলায় হাঁটাহাঁটি, চন্দ্রালোকে চিকচিক করতে থাকা বালি আর ঢেউয়ের নাচ, অমাবস্যার আকাশ থেকে তারার দৃষ্টিপাত, জালালুদ্দিন আমাকে দেখাচ্ছে দূর সমুদ্রে ডুবে গেছে। দিকচক্রবাল, আমার বই কেনার জন্য সে টাকা জোগাড় করছে, আর আমাকে বিদায় জানাচ্ছে সান্তা ক্রুজ বিমানবন্দরে। আবিষ্কার করলাম, স্থান ও কালের এক ঘূর্ণীচক্রে ফেলে দেওয়া হয়েছে আমাকে। আমার পিতার বয়স ততদিনে একশ বছর পেরিয়েছে, তার বয়সের অর্ধেক বয়সি জামাইয়ের খাঁটিয়া তাকে বহন করতে হলো; আমার বোন জোহরা, তার চার বছরের পুত্রের পিতাকে হারানোর ক্ষত এখনও দগদগে। এসব চিত্র আমার চোখের সামনে ভেসে এসেছিল মুহূর্তে, সহ্য করা ভয়ানক ছিল আমার জন্য। আমি ঠেশ দিয়েছিলাম অ্যাসেম্বলি জিগের ওপর, নিজেকে সামলে নিয়ে কয়েকটি নির্দেশ দিয়েছিলাম ডেপুটি প্রজেক্ট ডিরেক্টর ড. এস শ্রীনিবাসনকে, আমার অনুপস্থিতিতে কাজ চালিয়ে যাওয়ার জন্য।
সারারাত বিভিন্ন জেলা বাসে ভ্রমণ করে পরদিন আমি রামেশ্বরম পৌঁছালাম। এই সময়ের মধ্যে জালালুদ্দিনের সঙ্গে শেষ হয়ে যাওয়া স্মৃতি থেকে নিজেকে মুক্ত করতে আমি অনেক চেষ্টা করলাম। কিন্তু যে মুহূর্তে আমি বাড়িতে পৌঁছালাম, দুঃখ আবার আমাকে ধরাশায়ী করে ফেলল। জোহরা বা আমার ভাগ্নে মেহবুবকে বলার মতো কোনো কথা আমার ছিল না, দুজনেই তারা কাঁদছিল। আমার চোখে জল ছিল না ফেলার মতো। আমরা বেদনাহতভাবেই জালালুদ্দিনকে কবর দিয়েছিলাম।
আমার পিতা দীর্ঘ সময় আমার হাত ধরে রেখেছিলেন। তার চোখেও জল ছিল না। তুমি কি দেখতে পাও না, আবুল, প্রভু কেমন দীর্ঘ করেছেন ছায়া? যদি তিনি ইচ্ছা করতেন, তাহলে তা তিনি স্থির করে দিতে পারতেন। কিন্তু সূর্যকে তিনি ছায়ার পথপ্রদর্শক করেছেন, ধীরে ধীরে ছায়া হ্রাস করেন তিনি। তিনিই তোমার জন্য রাতকে আবরণ করেছেন, নিদ্রাকে বিশ্রাম। জালালুদ্দিন এক দীর্ঘ নিদ্রায় নিদ্রিত হয়েছে। স্বপ্নহীন নিদ্রা, অচেতনতার মধ্যে তার সমস্ত সত্ত্বার পরিপূর্ণ বিশ্রাম। আল্লাহ যা নির্ধারণ করেন তা ব্যতীত আর কিছুই আমাদের ঘটবে না। তিনিই আমাদের অভিভাবক। আল্লাহর প্রতি তোমার আস্থা রাখো। তিনি ধীরে ধীরে চোখের পাতা বন্ধ করলেন এবং ধ্যানমগ্নের মতো হয়ে পড়লেন।
মৃত্যু কখনও আমাকে শংকিত করেনি। যাই হোক না কেন, একদিন সবাইকে চলে যেতে হবে। কিন্তু জালালুদ্দিন হয়তো একটু আগেই চলে গেছে, বেশ একটু আগেই। আমি বাড়িতে দীর্ঘক্ষণ থাকতে পারলাম না। আমি অনুভব করলাম আমার ভেতরের সত্ত্বা এক ধরনের উদ্বিগ্নতায় ডুবে যাচ্ছে, অনুভব করলাম আমার ব্যক্তিগত ও পেশাগত জীবনের মধ্যে একটা দ্বন্দ্ব শুরু হয়েছে। অনেকদিন ধরে, থুম্বায়, একরকম তুচ্ছতা আমি অনুভব করছিলাম যার সঙ্গে আমার আগে পরিচয় ছিল না। যা করছিলাম তার সবকিছু সম্পর্কেই।
অধ্যাপক ধাওয়ানের সঙ্গে এ নিয়ে আমার দীর্ঘ আলাপ হয়েছিল। তিনি বলেছিলেন, আমার এসএলভি-৩ প্রকল্পের অগ্রগতিই আমার জন্যে সান্ত্বনা বয়ে আনবে। বিভ্রান্তি প্রথমে ঢিলে হয়ে যাবে, তারপর কেটে যাবে একেবারেই। তিনি আমার মনোযোগ টেনে নিয়ে গিয়েছিলেন প্রযুক্তির বিস্ময় ও এর অর্জনগুলোর দিকে।
ক্রমান্বয়ে ড্রয়িং বোর্ড থেকে উত্থিত হতে থাকল হার্ডওয়ার। শশী কুমার ফেব্রিকেশন ওয়ার্ক সেন্টারের একটা খুব কার্যকর নেটওয়ার্ক তৈরি করেছিলেন। একটা গঠনকর ড্রয়িং পাওয়ার কয়েক দিনের মধ্যেই যা পাওয়া যেত তা দিয়েই তিনি ফেব্রিকেশন শুরু করে দিতেন। চারটে রকেট মোটর তৈরির পেছনে নাম্বুদিরি ও পিল্লাই তাদের দিনরাতের পুরোটা সময় খরচ করছিলেন প্রপালসন গবেষণাগারে। এমএসআর দেব ও স্যান্ডলাস পরিকল্পনা তৈরি করেছিলেন ভেহিকলের যান্ত্রিক ও বৈদ্যুতিক ইন্টিগ্রেশনের। মাধবন নায়ার ও মূর্তি পরীক্ষা করতেন ভিএসএসসি ইলেকট্রনিক্স ল্যাবরেটরিতে সৃষ্ট পদ্ধতি এবং সেগুলো যেখানে সম্ভব সেখানে ফ্লাইট সাবসিস্টেমে প্রয়োগ করতেন। ইউএস সিং নিয়ে এসেছিলেন প্রথম লঞ্চ গ্রাউন্ড সিস্টেম, তার সঙ্গে টেলিমেট্রি, টেলিকমান্ড ও রাডার। ফ্লাইট ট্রায়ালের জন্য এসএইচএআরের একটা বিস্তারিত কর্ম পরিকল্পনাও তিনি তৈরি করেছিলেন। ড, সুন্দররাজন নিবিড়ভাবে মনিটর করতেন মিশনের বিষয়গুলো এবং সিস্টেম আপডেট করে রাখতেন। ড. শ্রীনিবাসন, একজন লঞ্চ ভেহিকল ডিজাইনার, এসএলভির ডেপুটি প্রজেক্ট ডিরেক্টর হিসাবে তিনি আমার সকল সৌজন্যমূলক ও সম্পূরক ক্রিয়াকলাপ খারিজ করে দিয়েছিলেন। আমি যা এড়িয়ে যেতাম তিনি তা লক্ষ করতেন, আমি যেসব পয়েন্ট শুনতে ব্যর্থ হতাম তিনি সেগুলো শুনতে পেতেন, আর যে সম্ভাবনা আমার নজর এড়িয়ে যেত সে সম্ভাবনা তিনি তুলে ধরতেন।
