এসএলভি প্রকল্পের প্রথম তিনটে বছর ছিল বিজ্ঞানের অসংখ্য অজানা রহস্যের উন্মোচনের কাল। যেহেতু মানুষ, সুতরাং অজ্ঞতা সবসময়ই লেগে আছে। আমাদের সঙ্গে, এবং থাকবেও সর্বদা। এ ব্যাপারে আমার সচেতনতায় নতুন যা যোগ হয়েছিল তা হলো; এর অতল মাত্রায় আমার জেগে ওঠা। আমার প্রান্ত ধারণা ছিল যে, বিজ্ঞানের কাজ হলো সবকিছু ব্যাখ্যা করা, আর অব্যাখ্যাত প্রপঞ্চ ছিল আমার বাবা ও লক্ষ্মণা শাস্ত্রীর মতো মানুষদের এলাকা। এ বিষয় নিয়ে আমার সহকর্মীদের সঙ্গে আলোচনা করা থেকে আমি সবসময় বিরত থাকতাম, আমার ভয় ছিল যে এতে করে তাদের সংগঠিত দৃষ্টিভঙ্গির নেতৃত্ব হুমকিতে পড়তে পারে।
ক্রমশ আমি সচেতন হয়ে উঠলাম বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, গবেষণা ও উন্নয়ন ইত্যাদির মধ্যে বিদ্যমান পার্থক্য সম্পর্কে। বিজ্ঞান হচ্ছে ওপেন-এন্ডেড আর আবিষ্কারমূলক। উন্নয়ন হচ্ছে একটা আঁটো ফাস। উন্নয়নের ক্ষেত্রে ভুলভ্রান্তি হচ্ছে অনুজ্ঞামূলক আর নিত্যকার ব্যাপার। কিন্তু প্রতিটা ভুল থেকে ক্রমোন্নতি সাধন করা যায়। স্রষ্টা সম্ভবত প্রকৌশলীদের সৃষ্টি করেছেন বিজ্ঞানীরা যাতে আরও বেশি সাফল্য অর্জন করতে পারে সেই কারণে। প্রতিবারই বিজ্ঞানীরা সব ক্ষেত্রে আগাগোড়াগবেষণা সম্পন্ন করে পূর্ণ সমাধান বের করে, প্রকৌশলীরা তাদের দেখায় আরও জ্যোতিষ্ক, আরও সম্ভাবনা। আমি আমার দলকে সাবধান করে। দিয়েছিলাম যেন তারা বিজ্ঞানীতে পরিণত না হয়। বিজ্ঞান হচ্ছে এক প্যাসন প্রতিশ্রুতি ও সম্ভাবনার জগতে এক অনন্ত যাত্রা। আমাদের সময় ও তহবিল সীমিত। আমাদের এসএলভি নির্মাণ নির্ভর করছে আমাদের সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে সচেতনতার ওপর। আমার পছন্দ কর্মযোগ্য বিদ্যমান সমাধান যা হতে পারে সর্বোত্তম সুযোগ। নির্দিষ্ট সময়-নির্ধারিত প্রকল্পে নতুন কোনো কিছু করতে গেলে তাতে সমস্যা সৃষ্টি হবেই। আমার মতে, একজন প্রকল্প নেতাকে যতদূর সম্ভব বেশিরভাগ পদ্ধতিতে প্রমাণিত প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করতে হবে এবং নিরীক্ষা চালাতে হবে কেবলমাত্র বহুবিধ উৎস থেকে।
.
৮.
প্রকল্প এমনভাবে গঠন করা হয়েছিল যে প্রধান টেকনোলজি সেন্টারগুলো, ভিএসএসসি এবং এসএইচএআর, উভয় স্থানেই পরিচালনা করতে পারে প্রোপেল্যান্ট প্রডাকশন, রকেট মোটর টেস্টিং ও যে কোনো বড়ো ডায়ামিটার সম্পন্ন রকেট উৎক্ষেপণ। এসএলভি-৩ প্রকল্পে অংশগ্রহণকারী হিসাবে আমরা নিজেদের জন্য তিনটে মাইলস্টোন নির্ধারণ করেছিলাম: ১৯৭৫ সালের মধ্যে সাউন্ডিং রকেটের মাধ্যমে সকল সাবসিস্টেমের ডেভলপমেন্ট ও ফ্লাইট কোয়ালিফিকেশন; ১৯৭৬ সালের মধ্যে সাব-অর্বিটাল ফ্লাইট; এবং ১৯৭৮ সালের মধ্যে চূড়ান্ত অর্বিটাল ফ্লাইট। ইতোমধ্যে কাজের গতি ও ছন্দ বেড়ে গিয়েছিল আর উত্তেজনায় ভরপুর হয়ে উঠেছিল পরিবেশ। যেখানেই আমি গেছি, সেখানেই আমাদের দল চিত্তাকর্ষক কিছু
কিছু আমাকে দেখিয়েছে। দেশে প্রথমবারের মতো বিপুল পরিমাণ কাজ করা হচ্ছে এবং গ্রাউন্ড-লেভেল টেকনিশিয়ানদের হাতে এ ধরনের কাজের নমুনা আগে কখনও ছিল না। আমি লক্ষ করলাম, কর্মকুশলতার নতুন মাত্রা সৃষ্টি হচ্ছে আমার দলের সদস্যদের মধ্যে।
কর্মকুশলতার মাত্রা একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যা নিয়ে যায় সৃষ্টির দিকে। ব্যক্তির জ্ঞান আর দক্ষতার মতো উপযুক্ততাও ছাড়িয়ে যায় তা। কোনো ব্যক্তি যা অবশ্যই জানবে আর নিজের কাজ সুচারুভাবে করতে সমর্থ হবে তার চেয়েও কর্মকুশলতার মাত্রা ব্যাপক ও গভীর। এতে থাকে মনোভাব, মূল্যবোধ ও চারিত্র লক্ষণ। এর অস্তিত্ব বিদ্যমান থাকে মানব ব্যক্তিত্বের বিভিন্ন স্তরে। আচরণগত স্তরে আমরা দক্ষতা পর্যবেক্ষণ ও জ্ঞান পরিমাপ করতে পারি। মধ্যবর্তী স্তরে দেখা যায় সামাজিক ভূমিকা এবং ভাবমূর্তির মাত্রা। উদ্দেশ্য ও লক্ষণ নিহিত থাকে একেবারে ভেতরের স্তরে। আমরা যদি ওইসব কর্মকুশলতার মাত্রা শনাক্ত করতে পারি, তাহলে সেগুলো একটা নীলনকশার মতো একত্র সন্নিবিষ্ট করে আমাদের চিন্তা ও কাজে ব্যবহার করতে পারি।
এসএলভি-৩ তখনও ছিল ভবিষ্যতের মধ্যে। কিন্তু এর সাবসিস্টেম ইতোমধ্যেই তৈরি হয়ে গিয়েছিল। ১৯৭৪ সালের জুন মাসে আমরা কয়েকটি সূক্ষ সিস্টেম পরীক্ষার জন্য সাউন্ডিং রকেট কেন্টর উৎক্ষেপণ করি। এই রকেটটির সঙ্গে সংযোজন করা হয়েছিল এসএলভির একটা তাপ নিরোধক আবরণ, রেট জাইরো ইউনিট, আর ভেহিকল অ্যাটিচিউড প্রোগ্রামার। ব্যাপক পাল্লার বিশেষজ্ঞ মূল্যায়ণের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট তিনটে পদ্ধতি কম্পোজিট ম্যাটারিয়াল, কন্ট্রোল ইঞ্জিনিয়ারিং ও সফটওয়ার, আমাদের দেশে এগুলোর কোনোটাই এর আগে এ উদ্দেশ্যে চেষ্টা করে দেখা হয়নি। পরীক্ষা সফল হলো পুরোপুরি। এর আগে পর্যন্ত ভারতীয় মহাকাশ কর্মসূচি সাউন্ডিং রকেটের বাইরে যেতে পারেনি আর জ্ঞাত ব্যক্তিরাও আবহাওয়া বিষয়ক যন্ত্রপাতির চেয়ে সিরিয়াস কিছু পাঠানোর কথা ভাবতে পারেনি। প্রথমবারের মতো আমরা জাতির প্রত্যয়কে অনুপ্রাণিত করলাম। প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী ১৯৭৪ সালের ২৪ জুলাই তারিখে পার্লামেন্টকে বললেন, প্রাসঙ্গিক প্রযুক্তি, সাবসিস্টেম ও হার্ডওয়ার ভারতের প্রথম স্যাটেলাইট লঞ্চ ভেহিকল নির্মাণের জন্য উন্নয়ন ও নির্মাণের কাজ সন্তোষজনকভাবে এগিয়ে চলেছে। কিছু সংখ্যক শিল্পপ্রতিষ্ঠান নিযুক্ত আছে বিভিন্ন অংশ নির্মাণে। ভারতের প্রথম অর্বিটাল ফ্লাইট শুরু হবে ১৯৭৮ সালে।
