১৯৭৫ সালের ১ ও ২ জানুয়ারিতে আমরা মিলিত হলাম ডিআরডিএলে। প্রায় ছয় সপ্তাহ পর দ্বিতীয় সেশনটি অনুষ্ঠিত হলো। আমরা পরিদর্শন করলাম বিভিন্ন ডেভলপমেন্ট ওয়ার্ক সেন্টার আর সেখানকার বিজ্ঞানীদের সঙ্গে আলোচনা করলাম। আমি ভীষণভাবে আলোড়িত হলাম এভি রঙ্গ রাওয়ের ভবিষ্যৎ দর্শনে, উইং কমান্ডার আর গোপালস্বামীর গতিশীলতায়, ড, আই অচ্যুত রাওয়ের পুঙ্খানুপুঙ্খতায়, জি গণেশনের কর্মপ্রচেষ্টায়, এস কৃষ্ণনের চিন্তার স্বচ্ছতায় আর বালকৃষ্ণনের সমগ্রতার প্রতি সুক্ষ দৃষ্টিতে। ভীষণ জটিলতার মুখেও জেসি ভট্টাচার্য ও লেফটেন্যান্ট কর্ণেল স্বামীনাথনের শান্ত থাকার বিষয়টি ছিল চমকপ্রদ। লেফটেন্যান্ট কর্ণেল ভিজে সুন্দরমের গভীর উদ্দীপনা ও আবেদন ছিল দৃষ্টি-আকর্ষক। তারা ছিলেন একদল অতিশয় বুদ্ধিমান ও প্রতিশ্রুতিবদ্ধ মানুষ, সার্ভিস অফিসার ও বেসামরিক বিজ্ঞানীদের একটা মিশ্রণ-তারা নিজেদের প্রশিক্ষিত করেছিলেন একটা ভারতীয় মিসাইল উৎক্ষেপণের নিজস্ব আগ্রহ থেকে।
১৯৭৫-এর মার্চে ত্রিবান্দ্রামে আমাদের উপসংহারমূলক বৈঠক অনুষ্ঠিত হলো। আমরা অনুভব করলাম যে প্রকল্প সম্পাদনের অগ্রগতি হার্ডওয়ার ফেব্রিকেশনের বিচারে যথেষ্ট, মিসাইল সাবসিস্টেমের ওয়ান-টু-ওয়ান প্রতিস্থাপনার দর্শন রূপায়িত করতে, কেবল লিকুইড রকেট ক্ষেত্র বাদ দিয়ে, ওখানে সাফল্য অর্জনের জন্য আরও কিছু সময় প্রয়োজন ছিল। কমিটি সর্বসম্মতিক্রমে মতামত দিল যে, হার্ডওয়ার ফেব্রিকেশন ও গ্রাউন্ড ইলেকট্রনিক্স কমপ্লেক্স ডিজাইন ও নির্মাণে সিস্টেম অ্যানালিসিসের দুটো লক্ষ্যই ডিআরডিএল পূরণ করেছে।
আমরা লক্ষ করলাম, ওয়ান-টু-ওয়ান প্রতিস্থাপনা দর্শন ডিজাইন ডাটা সঞ্চালনের ওপর অধিকতর মর্যাদা দখল করে আছে। অনেক ডিজাইন ইঞ্জিনিয়ার প্রয়োজনীয় অ্যানালাইসিসের ওপর পর্যাপ্ত মনোযোগ দিতে পারেনি, যে অনুশীলনটা আমরা অনুসরণ করতাম ভিএসএসসিতে। তখনও পর্যন্ত চালানো সিস্টেম অ্যানালাইসিস অনুশীলন ছিল কেবলমাত্র প্রাথমিক প্রকৃতির। মোট কথা, ফলাফল দাঁড়িয়েছিল অভূতপূর্ব, কিন্তু আমাদের তখনও আরও অনেক দীর্ঘ পথ যেতে হবে। আমার মনে পড়েছিল স্কুলের একটা কবিতা:
Dont worry and fret, fainthearted,
The chances have just begun,
For the best jobs havent been started,
The best work hasnt been done.
ডেভিলকে আরও এগিয়ে নেবার জন্য সরকারের কাছে জোর সুপারিশ করল কমিটি। আমাদের সেই সুপারিশ গ্রহণ করা হলো আর প্রকল্প এগিয়ে চলল।
এদিকে ভিএসএসসিতে আকার নিচ্ছিল এসএলভি। ডিআরডিএলের বিপরীতে আমরা এগোচ্ছিলাম খুবই ধীর গতিতে। নেতাকে অনুসরণ করার বদলে আমার দল কয়েকটি ব্যক্তিগত পথে এগিয়ে যাচ্ছিল সাফল্যের দিকে। আমাদের কর্মপদ্ধতির প্রান ছিল যোগাযোগ, বিশেষভাবে নির্দিষ্ট পার্শ্বিক লক্ষ্যে, দলগুলোর মধ্যে আর দলের মধ্যে। এক দিক থেকে, এই দানবীয় প্রকল্প ম্যানেজ করার জন্য আমার মন্ত্র ছিল যোগাযোগ। আমার দলের সদস্যদের কাছ থেকে সর্বোত্তম কাজ বের করে নিতে আমি প্রায়ই তাদের সঙ্গে কথা বলতাম সংস্থার বিষয় ও লক্ষ্য সম্পর্কে, এসব লক্ষ্য বাস্তবায়নে প্রতিটি সদস্যের নির্দিষ্ট অবদানের গুরুত্বের কথা তুলে ধরতাম। একই সঙ্গে আমার অধীনস্থদের গঠনমূলক আইডিয়াগুলোও গ্রহণের চেষ্টা করতাম আমি। সেই সময়ে আমার ডাইরির কোনো খানে লিখেছিলাম:
If you want to leave your footprints
On the sands of time
Do not drag your feet.
অধিকাংশ সময় যোগাযোগ বিভ্রান্ত হয়ে পড়ত আলাপচারিতায়। আসলে দুটো বিষয়ই আলাদা। আমি ছিলাম (এখনও আছি) ভীষণ আলাপচারী মানুষ, কিন্তু নিজেকে মনে করি একজন ভালো যোগযোগকারী। হাস্যকৌতুকে ভরা আলাপচারিতা বেশির ভাগ সময় এড়িয়ে যায় গুরুত্বপূর্ণ তথ্য, অন্যদিকে যোগাযোগের অর্থ হলো কেবলমাত্র তথ্য বিনিময়। এটা বোঝা খুব জরুরি যে, যোগযোগ হচ্ছে দুই পক্ষের ঘটনা যার লক্ষ্য নির্দিষ্ট তথ্য আদান-প্রদান।
এসএলভিতে কাজ করার সময়, আমি যোগাযোগের বিষয়টিকে ব্যবহার করতাম সমঝোতা চালু করার জন্য এবং সমস্যা নিরসনে সহকর্মীদের সঙ্গে ঐকমত্যে আসার জন্য। স্পেস সায়েন্স কাউন্সিল (এসএসসি)-এর একটা রিভিউ মিটিঙে. প্রকিউরমেন্টের বিলম্বে হতাশ হয়ে, আমি একেবারে অভিযোগের তোড়ে ফেটে পড়লাম উদাসীনতা ও ভিএসএসসির কন্ট্রোলার অব অ্যাকাউন্ট ও অর্থনৈতিক উপদেষ্টার বিরুদ্ধে। আমি বললাম যে অ্যাকাউন্টের কর্মীদের কাজের ধারা বদলাতে হবে, এবং প্রকল্প দলে তাদের প্রতিনিধি দাবি করলাম। ড, ব্ৰহ্ম প্রকাশ আমার আচরণে একেবারে হতেচকিত হয়ে পড়লেন। তিনি সিগারেট রেখে মিটিং থেকে বেরিয়ে গেলেন।
সারা রাত অনুতাপে আমি কাতর হলাম, আমার কর্কশ কথায় যন্ত্রণা পেয়েছেন ড, ব্রহ্ম প্রকাশ। যাহোক আমি পরাস্ত হবার আগেই পন্থা-পদ্ধতির মধ্যে ঢুকে পড়া কুঁড়েমির বিরুদ্ধে লড়াই করতে স্থিরচিত্ত ছিলাম। একটা বাস্তব প্রশ্ন করলাম আমি নিজেকে: কেউ কি এইসব নির্বোধ আমলাদের সঙ্গে বসবাস করতে পারে? উত্তর হচ্ছে-একটা বড়ো না। তারপর নিজেকে একটা ব্যক্তিগত প্রশ্ন করলাম: ড, ব্রহ্ম প্রকাশকে বেশি আঘাত করবে কি আমার এখনকার কর্কশ কথাগুলো, নাকি পরবর্তী পর্যায়ে এসএলভির কবর? আমার হৃদয় ও মন সম্মত বুঝতে পেরে আমি সাহায্যের জন্য খোদার কাছে প্রার্থনা করলাম। আমার জন্য সৌভাগ্য, ড. ব্রহ্ম প্রকাশ পরবর্তী সকালে প্রকল্পের অর্থনৈতিক প্রতিনিধিত্ব করলেন।
