পুরো সিস্টেমকে চালানোর শক্তি ছাড়া লঞ্চ ডেহিকল ভূ-পৃষ্ঠেই থেকে যায়। সাধারণভাবে একটা প্রোপেল্যান্ট হচ্ছে একটা দহনযোগ্য বস্তু যা থেকে তাপ উৎপন্ন হয় এবং রকেট ইঞ্জিনে সরবরাহ করে অতিক্ষুদ্র নিক্ষেপণ কণিকা। একই সঙ্গে এটা হলো শক্তির উৎস আর বর্ধনশীল শক্তির ক্রিয়াশীল বস্তু। যেহেতু রকেট ইঞ্জিনে পার্থক্য অনেক বেশি নিষ্পত্তিমূলক, তাই প্রোপেল্যান্ট পরিভাষাটি প্রাথমিকভাবে ব্যবহৃত হয় কেমিক্যালের বর্ণনা দিতে, রকেট যে কেমিক্যাল বহন করে সামনে চালনামূলক কাজে।
প্রোপেল্যান্টকে সলিড বা লিকুইড হিসাবে শ্রেণিভাগ করাটাই রীতি। আমরা সলিড প্রোপেল্যান্টের ওপর মনোযোগ ঘনীভূত করেছিলাম। একটা সলিড প্রোপেল্যান্ট গঠন করতে তিনটি উপাদান অত্যাবশ্যক ও অক্সিডাইজার, জ্বালানি এবং অ্যাডিটিভ। সলিড প্রোপেল্যান্ট পরে আরও দুই শ্রেণিতে বিভক্ত হয়ে যায় ৪ কম্পোজিট এবং ডাল বেজ। আগেরটা গঠিতহয় অজৈব বস্তু (যেমন অ্যামোনিয়াম পারক্লোরেট) বা অক্সিডাইজারের জৈব জ্বালানির (যেমন সিনথেটিক রাবার) একটা পন্থায়। ডাবল বেজ প্রোপেল্যান্ট সেইসব দিনে ছিল দূরের স্বপ্ন, কিন্তু তবুও এ নিয়ে স্বপ্ন দেখার সাহস করেছিলাম আমরা।
.
এই পর্যাপ্ততা আর দেশীয় উৎপাদন ঘটেছিল ক্রমাগত ভাবে, আর সবসময় যে যন্ত্রণা ছাড়া তা নয়। আমরা ছিলাম একদল প্রায়-প্রশিক্ষিত প্রকৌশলী। আমাদের টিউটর বিহীন অধ্যবসায়, প্রতিভা, চরিত্র, আর আত্মনিবেদন এসএলভি তৈরির ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড়ো ভূমিকা রেখেছিল। সমস্যা দেখা দিত নিয়মিতই, আর তা প্রায়ই ঘটতো। একটা সমস্যার পর দেখা মিলত আরেকটার। আমার দলের সদস্যরা কখনও আমার ধৈর্য নিঃশেষিত হতে দেননি। আমার মনে পড়ে একবার নাইট শিফটের কাজ শেষ করার পর লিখেছিলাম:
Beautiful hands are those that do
Work that is earnest and brave and true
Moment by moment
The long day through.
আমাদের এসএলভির কাজের প্রায় সমান্তরালে, ডিআরডিও নিজেকে প্রস্তুত করছিল একটা দেশীয় সারফেস-টু-এয়ার মিসাইল নির্মাণের জন্য। আরএটিও প্রকল্প পরিত্যক্ত হয়েছিল, কারণ যে বিমানটার জন্য এর ডিজাইন করা হয়েছিল তা সেকেলে হয়ে পড়েছিল। নতুন এয়ারক্র্যাফটের জন্য আরএটিও দরকার ছিল প্রকল্প বন্ধ হয়ে যাওয়ায়, নারায়ণনের ওপর ডিআরডিও যুক্তিসঙ্গত ভাবে মিসাইল নির্মাতা দলের নেতৃত্বভার অর্পণ করতে চাইল। আইএসআরওতে আমরা যেমন করতাম তেমন না করে তারা প্রযুক্তি উন্নয়ন ও দক্ষতা বৃদ্ধির চেয়ে বরং ওয়ান-টু-ওয়ান প্রতিস্থাপনার দর্শন পছন্দ করেছিল। একটা পরীক্ষিত মিসাইলের সমস্ত ডিজাইন প্যারামিটারের যাবতীয় জ্ঞান আহরণের জন্য এবং সংস্থার চাহিদা মোতাবেক প্রয়োজনীয় অবকাঠাম স্থাপনের জন্য পছন্দ করা হয়েছিল রাশিয়াউদ্ভাবিত সারফেস-টু-এয়ার মিসাইল এসএ-২। ভাবা হয়েছিল যে একবার ওয়ানটু-ওয়ান স্বদেশীকরণ প্রতিষ্ঠিত হলে, গাইডেড মিসাইলের আধুনিকতম ক্ষেত্রটির পরবর্তী অগ্রগতিতে ঘটবে প্রাকৃতিক ফল আউট। ১৯৭২ সালের ফেব্রুয়ারিতে এই প্রকল্প অনুমোদিত হয়েছিল, এর সাংকেতিক নাম দেওয়া হয় ডেভিল এবং প্রথম তিন বছরের জন্য প্রায় ৫ কোটি রূপির তহবিল ধার্য করা হয়।
নারায়ণন ততদিনে পদোন্নতি পেয়ে এয়ার কমোডর হয়েছেন। তাকে ডিআরডি এলের পরিচালক নিযুক্ত করা হলো। এই বিশাল কাজের দায়িত্ব নেবার জন্য হায়দারাবাদের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের শহরতলীতে অবস্থিত আনকোরা এই গবেষণাগারটি সচল করলেন তিনি। সমাধি আর প্রাচীন দালানকোঠার ছাপযুক্ত ভূদৃশ্যে শুরু হলো নতুন জীবনের প্রতিধ্বনি। নারায়ণন ছিলেন বিপুল শক্তিসম্পন্ন সদা উদ্দীপিত একজন মানুষ। তিনি নিজের চারপাশে জড়ো করলেন উদ্যমী মানুষদের শক্তিশালী একটা দলকে, এই বেসামরিক গবেষণাগারে তুলে আনলেন অনেক সার্ভিস অফিসারকে। এসএলভির কাজে পুরোপুরি নিমগ্ন হয়ে পড়ায় মিসাইল প্যানেলের বৈঠকগুলোয় আমার অংশগ্রহণ ক্রমে হ্রাস পেয়েছিল, পরে তা একেবারেই বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। যাহোক, নারায়ণন ও তার ডেভিল-এর গল্প আসতে শুরু করেছিল ত্রিবান্দ্রামে। একটা নজিরবিহীন স্কেলের রূপান্তর ঘটছিল সেখানে।
আরএটিও প্রকল্পে নারায়ণনের সঙ্গে আমার কাজের সময় আমি আবিষ্কার করেছিলাম যে, তিনি একজন কঠিন কর্মবীর। এমন একজন যিনি নিয়ন্ত্রণ, প্রভুত্ব আর কর্তৃত্ব পুরোপুরি বাতিল করে দিয়েছিলেন। আমি বিস্ময়ে ভাবতাম, তার মতো ব্যবস্থাপকরা যারা মূল্যকে পাত্তা না দিয়ে ফলাফল পাওয়ার দিকেই লক্ষ্যস্থির করে, তারা দীর্ঘ যাত্রায় অসহযোগিতা আর নীরব বিদ্রোহের মুখোমুখি হয় কিনা।
১৯৭৫ সালের নববর্ষের দিনে নারায়ণনের নেতৃত্বে কাজ করার সুযোগ এলো। অধ্যাপক এমজিকে মেনন, সেই সময় তিনি প্রতিরক্ষা মন্ত্রীর বৈজ্ঞানিক উপদেষ্টা হিসাবে কাজ করছিলেন আর ডিআরডিওর প্রধান ছিলেন, ড, ব্ৰহ্ম প্রকাশের সভাপতিত্বে একটা রিভিউ কমিটি গঠন করলেন ডেভিল প্রকল্পের কাজের মূল্যায়ন করার জন্য। আমাকে ওই দলে রাখা হয়েছিল রকেট স্পেশালিস্ট হিসাবে অ্যারোডাইনামিকসের ক্ষেত্রগুলোয়, গঠনে ও মিসাইলের প্রপালসনে সাধিত অগ্রগতি মূল্যায়নের জন্য। আমাকে সহযোগিতা করার জন্য ছিলেন বিআর সোমাশেখর এবং উইং কমান্ডার পি কামারাজু। কমিটির সদস্যদের মধ্যে আরও ছিলেন ড, আরপি শেনয় এবং অধ্যাপক আইজি শর্মা, ইলেকট্রনিক সিস্টেমে যে কাজ করা হয়েছিল তার পর্যালোচনার দায়িত্ব ছিল তাদের।
