ভারতে মহাকাশ গবেষণা সংগঠিত করার দায়িত্ব নেওয়ার আগে এবং ইনকসপারের চেয়ারম্যান হওয়ার আগে অধ্যাপক সারাভাই সাফল্যের সঙ্গে কয়েকটি শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছিলেন। তিনি এ ব্যাপারে সচেতন ছিলেন যে, শিল্প থেকে দূরে অবস্থান নিয়ে বিচ্ছিন্নতার মধ্যে বিজ্ঞান গবেষণা টিকে থাকতে পারবে না। অধ্যাপক সারাভাই যে সব শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছিলেন সেগুলো হচ্ছে সারাভাই কেমিক্যালস, সারাভাই গ্লাস, সারাভাই গেইগি লিমিটেড, সারাভাই মার্ক লিমিটেড এবং দ্য সারাভাই ইঞ্জিনিয়ারিং গ্রুপ। তেল বীজ থেকে তেল বের করার কাজে এবং কসমেটিকস ও সিনথেটিক ডিটারজেন্ট তৈরিতে তার স্তক অয়েল মিলস অগ্রপথিকের কাজ করেছিল। বড়ো আকারে পেনিসিলিন প্রস্তুত করতে তিনি চালু করেছিলেন স্ট্যান্ডার্ড ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেড, সেই সময়ে প্রচুর অর্থব্যয় করে বিদেশ থেকে পেনিসিলিন আমদানি করা হতো। এখন আরএটিওর স্বদেশীকরণের ফলে তার মিশনে যোগ হয়েছিল নতুন এক যাত্রা। সামরিক সরঞ্জাম তৈরিতে স্বনির্ভরতা এবং কোটি কোটি বৈদেশিক মুদ্রা রক্ষা করা। এসব আমার মনে পড়ে গিয়েছিল আরএটিও সিস্টেমের সফল ট্রায়ালের দিনে। ট্রায়ালের খরচাদিসহ পুরো প্রকল্পে আমাদের ব্যয় হয়েছিল ২৫ লাখ রুপিরও কম। ভারতীয় আরএটিও প্রতিটা উৎপাদন করা যেত ১৭০০০ রুপি খরচ করে, অন্যদিকে আমদানি করা প্রতিটা আরএটিওর জন্য খরচ হতো ৩৩০০০ রুপি। বিক্রম সারাভাই স্পেস সেন্টারে এসএলভির কাজ পুরোদমে এগিয়ে চলল। সমগ্র সাবসিস্টেম ডিজাইন করা হয়েছিল, প্রযুক্তি চিহ্নিত করা হয়েছিল, প্রক্রিয়া প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছিল, কর্মকেন্দ্র নির্বাচন করা হয়েছিল, জনশক্তি চিহ্নিত করা হয়েছিল এবং শিডিউল নির্ধারণ করা হয়েছিল। একমাত্র সমস্যা ছিল এই মেগা প্রজেক্ট কার্যকর ভাবে চালানোর জন্য একটা ব্যবস্থাপনা অবকাঠামোর অভাব এবং কর্মতৎপরতা সমন্বয়ের অভাব।
অধ্যাপক ধাওয়ান ড. ব্রহ্ম প্রকাশের সঙ্গে পরামর্শ করে এই কাজের জন্য আমাকে ঠিক করলেন। আমাকে এসএলভি প্রকল্পের ব্যবস্থাপক হিসাবে নিয়োগ দেওয়া হলো, আমাকে সরাসরি রিপোর্ট করতে হতো ভিএসএসসির পরিচালকের কাছে। আমার প্রথম কাজ ছিল একটা প্রকল্প ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা প্রস্তুত করা। আমি অবাক হয়েছিলাম গোয়ারিকর, মুগুনায়াগাম এবং কুরুপের মতো প্রতিভাবানরা থাকতে আমাকে কেন এই কাজের জন্য নির্বাচিত করা হয়েছিল। ঈশ্বরদাস, আরাভামুড়ান এবং এসসি গুপ্তের মতো সংগঠক থাকতে আমি ভালো করতে পারতাম কীভাবে? ডক্টর ব্ৰহ্ম প্রকাশের কাছে আমার এই সন্দেহের কথা প্রকাশ করলাম। তিনি আমাকে বললেন অন্যের সঙ্গে নিজেকে তুলনা না করে তাদের সামর্থ্য সম্প্রসারিত করার উদ্যোগ নিতে।
ডক্টর ব্রহ্ম প্রকাশ আমাকে উপদেশ দিলেন অধস্তনদের কর্মকুশলতার যত্ন নিতে এবং অংশগ্রহণরত কর্মকেন্দ্রগুলোর কাছ থেকে অতিমাত্রায় দক্ষতা সন্ধানের ব্যাপারে আমাকে সতর্ক করে দিলেন। প্রত্যেকেই কাজ করবে এসএলভির তাদের অংশ তৈরি করার জন্য; আপনার সমস্যাটা হতে যাচ্ছে অন্যদের ওপর আপনার নির্ভরতা। আপনাকে প্রচুর ধৈর্য ও সহনশীলতা দেখাতে হবে, তিনি বললেন। এতে আমার মনে পড়ে গিয়েছিল ঠিক ও বেঠিকের মধ্যে পার্থক্য সম্পর্কে আমার বাবা যা পড়ে শোনাতেন পবিত্র কুরআন থেকে আমরা আপনার আগে কোনো নবীকে পাঠাইনি যিনি খাবার গ্রহণ করতেন না বা বাজারচত্বরে হেঁটে বেড়াতেন না। আমরা আপনাকে পরীক্ষা করি একটার পর অন্য উপায়ে। আপনি কি ধৈর্যশীল হবেন না?
এ ধরনের পরিস্থিতিতে প্রায়ই যা ঘটে সেই দ্বন্দ্ব সম্পর্কে আমি সচেতন ছিলাম। যারা দলকে পরিচালনা করে প্রায়শ তারা দুটো বিষয়ের একটি অনুসরণ করে : কারো কারো কাছে কাজ হচ্ছে সবচেয়ে জরুরি প্রেষণা; অন্যদের কাছে তাদের কর্মীরাই সকল আগ্রহের বিষয়। আবার আরও অনেকে আছে যারা হয় এই দুই বিষয়ের মধ্যে পড়েছে, নয়তো এর বাইরে। যারা কাজ কিংবা কর্মী কারো প্রতিই আগ্রহী ছিল না তাদের এড়িয়ে চলা ছিল আমার কাজ। যে কোনো একটা চরমপন্থা গ্রহণ করা থেকে লোকদের ঠেকাতে আমি দৃঢ়প্রত্যয়ী ছিলাম! আর কাজ ও কর্মী যাতে চলতে পারে একত্রে সে অবস্থা চালু করতেও আমার দৃঢ়তা ছিল।
এসএলভি প্রকল্পের প্রাথমিক বিষয় ছিল ডিজাইন, উন্নয়ন ও একটা স্ট্যান্ডার্ড এসএলভি সিস্টেম পরিচালনা, এসএলভি-৩, পৃথিবীর চারদিকে ৪০০ কিলোমিটার সার্কুলার অরবিটে ৪০ কেজি ওজনের একটা স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের স্বতন্ত্র অভিযান সম্পন্ন করার সামর্থ্য।
প্রথম পদেক্ষপ হিসাবে, প্রাথমিক প্রকল্প বিষয়গুলোকে আমি কয়েকটি প্রধান কাজে বিভক্ত করি। ওই ধরনের একটা কাজ ছিল, ভেহিকলের চতুর্থ স্টেজের জন্য একটা রকেট মোটর সিস্টেম তৈরি করা। এ কাজ সম্পূর্ণ করার পথে জটিল সমস্যা ছিল: ৪.৬ টনের একটা প্রোপেল্যান্ট আর একটা হাই ম্যাস রেসিও অ্যাপোজি রকেট মোটর সিস্টেম তৈরি করা। আরেকটা কাজ ছিল ভেহিকল কন্ট্রোল এবং গাইডেন্স। তিন ধরনের কন্ট্রোল সিস্টেম সংশ্লিষ্ট ছিল এই কাজে অ্যারোডাইনামিক সারফেস কন্ট্রোল, থ্রাস্ট ভেক্টর কন্ট্রোল এবং প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্টেজের জন্য রিঅ্যাকশন কন্ট্রোল। আর চতুর্থ স্টেজের জন্য স্পিন-আপ মেকানিজম। অপ্রতিরোধী পরিমাপের মাধ্যমে কন্ট্রোল সিস্টেম ও গাইডেন্সের জন্য অপ্রতিরোধী রেফারেন্সও ছিল একান্ত প্রয়োজনীয়। এছাড়াও আরেকটা প্রধান কাজ ছিল এসএইচএআরে উৎক্ষেপণ সুবিধাদি বাড়ানো। ৬৪ মাসের মধ্যে একটা অল লাইন উডডয়ন পরীক্ষার লক্ষ্য নির্ধারণ হয়ে গিয়েছিল ১৯৭৩ সালের মার্চে।
