ভুলভ্রান্তি ব্যক্তি মানুষের বা সংগঠনের অর্জনগুলোর পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে, বা অর্জন বিলম্ব করতে পারে। কিন্তু অধ্যাপক সারাভাইয়ের মতো দ্রষ্টা সেই ভুলভ্রান্তিকেই নতুন আইডিয়া বাস্তবায়নের সুযোগ হিসাবে কাজে লাগাতে পারেন। তিনি টাইমার সার্কিটের ভুল সম্পর্কে বিশেষ করে উদ্বিগ্ন ছিলেন না, এ জন্যে নূ্যনতম দোষারোপও করেননি। এ ব্যাপারে তার মতামত ছিল যে, ভুলভ্রান্তি অপরিহার্য, তবে তা সংশোধন করে নেওয়া যায়। আমি পরবর্তীকালে অভিজ্ঞতায় বুঝেছিলাম যে, ভুল প্রতিরোধের সর্বোত্তম পন্থা হলো সেগুলো আগেই উপলব্ধি করা। কিন্তু এ যাত্রা, ভাগ্যের এক অদ্ভুত ঘূর্ণনে, টাইমার সার্কিটের ভুল থেকে জন্ম নিল একটা রকেট ইঞ্জিনিয়ারিং ল্যাবরেটরি।
মিসাইল প্যানেলের প্রতিটা বৈঠকের পর অধ্যাপক সারাভাইকে ব্রিফ করা আমার একটা নিয়মে পরিণত হয়েছিল। ১৯৭১ সালের ৩০ ডিসেম্বর দিল্লিতে অনুরূপ এক বৈঠকে উপস্থিতির পর আমি ত্রিবান্দ্রামে ফিরছিলাম। ঠিক ওই দিনই এসএলভি ডিজাইন পর্যালোচনা করার জন্য অধ্যাপক সারাভাই সফর করছিলেন থুম্বা। এয়ারপোর্ট লাউঞ্জ থেকে টেলিফোনে আমি তার সঙ্গে কথা বললাম প্যানেল মিটিঙে উত্থাপিত মূল বিষয়গুলো সম্পর্কে। তিনি আমাকে নিদের্শ দিলেন দিল্লি ফ্লাইট থেকে অবতরণের পর আমি যেন ত্রিবান্দ্রাম বিমান বন্দরে অপেক্ষা করি, এবং ওই রাতেই তার বোম্বাই চলে যাওয়ার আগে সেখানে তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করি। আমি যখন ত্রিবান্দ্রামে পৌঁছলাম তখন সেখানে থমথমে পরিবেশ বিরাজ করছিল। বিমানের ল্যাডার অপারেটর কুট্টি ভাঙা গলায় আমাকে জানাল, অধ্যাপক সারাভাই আর নেই। কয়েক ঘন্টা আগে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে তিনি মারা গেছেন। আমি স্তম্ভিত হয়ে গেলাম; এটা ঘটেছিল আমাদের আলাপের পর ঘন্টাখানেকের মধ্যে। এটা ছিল আমার জন্য প্রচণ্ড এক আঘাত আর ভারতীয় বিজ্ঞান ক্ষেত্রে বিশাল ক্ষতি। সেই রাতটা কেটে গিয়েছিল শেষকৃত্যের জন্য অধ্যাপক সারাভাইয়ের মরদেহ বিমানযোগে আহমেদাবাদে নিয়ে যাওয়ার জোগাড়যন্ত্র করতে।
১৯৬৬ থেকে ১৯৭১ পর্যন্ত পাঁচ বছরের মধ্যে প্রায় ২২ জন বিজ্ঞানী ও প্রকৌশলী ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করেছিলেন অধ্যাপক সারাভাইয়ের সঙ্গে। পরবর্তী সময়ে তারা গুরুত্ত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক প্রকল্পের দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন। অধ্যাপক সারাভাই শুধু একজন মহান বিজ্ঞানীই ছিলেন না, তিনি ছিলেন বড়ো একজন নেতাও। আমার এখনও মনে পড়ে ১৯৭০ সালের জুনে তিনি এসএলভি-৩ ডিজাইন প্রকল্পের পাক্ষিক অগ্রগতি পর্যালোচনা করছেন। ১নং ও ৪ নং স্টেজের বিষয়গুলো উপস্থাপনার আয়োজন করা হয়েছে। প্রথম তিনটি উপস্থাপনা মসৃণভাবে সম্পন্ন হলো। আমার পালা সব শেষে। আমি আমার দলের পাঁচ সদস্যকে পরিচয় করিয়ে দিলাম, যারা বিভিন্ন দিক থেকে ডিজাইনে তাদের অবদান রেখেছিলেন। সবাইকে অবাক করে দিয়ে দৃঢ়তা ও আস্থার সঙ্গে তারা নিজ নিজ কাজের অংশ উপস্থাপন করলেন। এই উপস্থাপনাগুলোর ওপর বিস্তারিত আলোচনা হলো এবং উপসংহার করা হলো যে, সন্তোষজনক অগ্রগতি সাধিত হয়েছে।
হঠাৎ করে একজন সিনিয়র বিজ্ঞানী, যিনি অধ্যাপক সারাভাইয়ের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করেছেন, আমার দিকে ফিরে জিজ্ঞেস করলেন, আচ্ছা, আপনার প্রকল্পের বিষয়গুলো উপস্থাপন করলেন আপনার দলের সদস্যরা তাদের নিজ নিজ কাজের ভিত্তিতে। কিন্তু প্রকল্পের জন্য আপনি কী করেছেন? সেই প্রথম আমি অধ্যাপক সারাভাইকে বাস্তবিকই বিরক্ত হতে দেখলাম। তিনি তার সহকর্মীকে বললেন, প্রকল্প ব্যবস্থাপনাটা কী নিয়ে সেটা আপনার জানা উচিৎ। আমরা একটা অসাধারণ উদাহরণ প্রত্যক্ষ করেছি। টিম ওয়ার্কের এটা এক অভূতপূর্ব প্রদর্শনী। আমি প্রকল্প নেতাকে সবসময় লোকজনের ইন্টিগ্রেটর হিসাবে বিবেচনা করি, আর কালাম হচ্ছে ঠিক সেটাই। আমি অধ্যাপক সারাভাইকে ভারতীয় বিজ্ঞানের মহাত্মা গান্ধী বলে মনে করি। তার দলে সঞ্চালন করছেন নেতৃত্বের গুণাবলী আর আইডিয়া ও উদাহরণ দিয়ে তাদের অনুপ্রাণিত করছেন।
অধ্যাপক এমজিকে মেননকে চালিকাশক্তির প্রধান হিসাবে রেখে একটা মধ্যবর্তী ব্যবস্থার পর, সতীশ ধাওয়ানকে আইএসআরও প্রধানের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। থুম্বায় পুরো কমপ্লেক্স, যার মধ্যে ছিল টিইআরএলএস, স্পেস সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি সেন্টার (এসএসটিসি), আরপিপি, রকেট ফেব্রিকেশন ফ্যাসিলিটি (আরএফএফ) এবং প্রোপেল্যান্ট ফুয়েল কমপ্লেক্স, ইত্যাদি সবগুলোর একত্রীকরণ ঘটেছিল একটা অখন্ড স্পেস সেন্টার গড়ে তুলতে এবং এর নামকরণ করা হয়েছিল বিক্রম সারাভাই স্পেস সেন্টার (ভিএসএসসি), সেই মানুষটার স্মরণে যার কল্যাণে সম্ভব হয়েছিল এটা। প্রখ্যাত ধাতুবিদ ড. ব্রহ্ম প্রকাশ ভিএসএসসির প্রথম পরিচালক নিযুক্ত হয়েছিলেন।
উত্তর প্রদেশের বেরেলি এয়ার ফোর্স স্টেশনে ১৯৭২ সালের ৮ অক্টোবর আরএটিও সিস্টেম পরীক্ষা করা হয়েছিল সফল ভাবে, এতে একটা সুখোই-১৬ জেট বিমান ১২০০ মিটার রান করার পর শূন্যে ভেসে ওঠে, সাধারণভাবে যেটার শূন্যে উঠতে ২ কিলোমিটার রান করতে হয়। পরীক্ষার সময় আমরা ৬৬তম আরএটিও মোটর ব্যবহার করেছিলাম। এই প্রদর্শন প্রত্যক্ষ করেছিলেন এয়ার মার্শাল শিবদেব সিং এবং ড. বিডি নাগ চৌধুরী, প্রতিরক্ষা মন্ত্রীর তৎকালীন বৈজ্ঞানিক উপদেষ্টা। এই চেষ্টা থেকে প্রায় ৪ কোটি বৈদেশিক মুদ্রা বাঁচানো গিয়েছিল। ইন্ডাস্ট্রিয়ালিস্ট সায়েন্টিস্টের স্বপ্নদর্শন শেষ পর্যন্ত ফল দিল।
