আমরা SLV-IV স্টেজটি ডায়মন্ট এয়ারফ্রেমের সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর জন্য প্রয়োজনীয় রদবদল করলাম। ২৫০ কেজি, ৪০০ এমএম ডায়ামিটার স্টেজ থেকে ৬০০ কেজি, ৬৫০ এমএম ডায়ামিটার স্টেজে সেটা রূপান্তরিত করলাম। দুবছরের চেষ্টার পর যখন সেটা আমরা CNES-এর কাছে হস্তান্তর করতে উদ্যত, ঠিক তখনই ফরাসিরা হঠাৎ করে তাদের ডায়মন্ট বিসি কর্মসূচি বাতিল করে দিল। তারা আমাদের বলল যে, আমাদের স্টেজ ফোর তাদের আর প্রয়োজন নেই। ঘটনাটা ছিল বিশাল আঘাত, দেরাদুনে যেমনটা আমি ব্যর্থ হয়েছিলাম বিমান বাহিনীতে ঢুকতে, আর ব্যাঙ্গালোরে নন্দী প্রকল্প বিলুপ্ত হয়েছিল এডিইতে, সে সব যেন আবার জীবন্ত হয়ে উঠল।
আমি স্টেজ ফোর নির্মাণে বিশাল আশা রেখেছিলাম, সেই সঙ্গে ছিল আপ্রাণ চেষ্টা, যাতে করে এটা উড়তে পারে একটা ডায়মন্ট রকেটে। এসএলভির অন্য তিনটে স্টেজ ছিল অন্ততপক্ষে পাঁচ বছর দূরে। যাহোক, ডায়মন্ট বিসির স্টেজ ফোরের হতাশা শিকেয় তুলে রাখতে আমার বেশি সময় লাগেনি। আমি অন্তত এ প্রকল্পের কাজটা আগাগোড়া উপভোগ করেছিলাম। ডায়মন্ট বিসি স্টেজের কারণে আমার মধ্যে শূন্যতা সৃষ্টি হয়েছিল, যথা সময়ে তা পূরণ করল আরএটিও।
আরএটিও প্রকল্প যখন চলছিল, তখন ধীরে ধীরে আকার নিতে শুরু করেছিল এসএলভি প্রকল্প। একটা লঞ্চ ভেহিকলের সকল প্রধান পদ্ধতির সক্ষমতা ততদিনে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল গুম্বায়। বসন্ত গোয়ারিকর, এমআর কুরুপ ও মুথুনায়াগাম তাদের অনন্যসাধারণ প্রচেষ্টায় প্রস্তুত করেছিলেন টিইআরএলএস।
অধ্যাপক সারাভাই দলগঠন শিল্পে হয়ে উঠেছিলেন একটা উদাহরণ। একবারের ঘটনায় তাকে একজন যোগ্য ও দায়িত্বশীল এক ব্যক্তিকে যাচাই করে নিতে হয়েছিল, এসএলভির টেলিকমান্ড সিস্টেম তৈরির জন্য। এ কাজে দুজন ব্যক্তি ছিলেন যোগ্যতাসম্পন্ন। একজন ইউআর রাও, অন্যজন অপেক্ষাকৃত অপরিচিত একজন এক্সপেরিমেন্টার জি মাধবন নায়ার। এই মাধবন নায়ারের আত্মোৎসর্গ ও সক্ষমতায় আমি গভীরভাবে মুগ্ধ হলেও, আমার মনে হয়নি তার সুযোগের মাত্রা খুব ভালো। অধ্যাপক সারাভাইয়ের নিয়মিত পরিদর্শনের সময় একদিন মাধবন নায়ার অতিশয় সাহসিকতার সঙ্গে প্রদর্শন করলেন তার অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য টেলিকমান্ড সিস্টেম। অধ্যাপক সারাভাই একজন প্রতিষ্ঠিত এক্সপার্টের বদলে একজন তরুণ এক্সপেরিমেন্টারকে পৃষ্ঠপোষকতা দিতে বেশি সময় নেননি। মাধবন নায়ার তার নেতার প্রত্যাশা শুধু যে পূরণ করেছিলেন তাই নয়, ছাড়িয়েও গিয়েছিলেন তা। পরে তিনি পোলার স্যাটেলাইট লঞ্চ ভেহিকল (পিএসএলভি)-এর প্রকল্প পরিচালক হয়েছিলেন।
এসএলভি ও মিসাইলকে বলা যেতে পারে জ্যেঠতুত ভাই: ধারণায় ও উদ্দেশ্যে আলাদা হলেও এরা এসেছে রকেট বিজ্ঞানের একই রক্ত থেকে। হায়দারাবাদে অবস্থিত ডিফেন্স রিসার্চ অ্যান্ড ডেভলপমেন্ট ল্যাবরেটরি (ডিআরডিএল)-এ ডিআরডিও কর্তৃক একটা বিপুল মিসাইল উন্নয়ন প্রকল্প গৃহীত হয়েছিল। এই সারফেস-টু-এয়ার মিসাইল উন্নয়ন প্রকল্পের গতি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মিসাইল প্যানেলের বৈঠক আর গ্রুপ ক্যাপ্টেন নারায়ণনের সঙ্গে আমার মিথস্ক্রিয়াও সমান মাত্রায় বেড়ে গিয়েছিল।
১৯৬৮ সালে অধ্যাপক সারাভাই তার একটা রুটিন ভিজিটে থুম্বায় এসেছিলেন। তাকে তখন দেখান হচ্ছিল নোজ-কোন জেটসনিং মেকানিজমের পরিচালন ক্রিয়া। সবসময়ের মতো সেবারও আমাদের কাজের ফলাফল নিয়ে আমরা উদ্বিগ্ন ছিলাম। অধ্যাপক সারাভাইকে আমরা অনুরোধ করলাম, একটা টাইমার সার্কিটের ভেতর দিয়ে রীতিমাফিক পাইরো সিস্টেম চালু করতে। অধ্যাপক সারাভাই মৃদু হাসলেন, এবং বোতামে চাপ দিলেন। আমরা আতংকিত হয়ে দেখলাম, কিছুই ঘটেনি। একেবারে নির্বাক হয়ে গেলাম আমরা। আমি তাকালাম প্রমোদ কালের দিকে, টাইমার সার্কিটটার নকশা ও প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছিলেন তিনিই। এক মুহূর্তের মধ্যে মনে মনে আমার এই ব্যর্থতার একটা বিশ্লেষণ করে ফেললাম। আমরা অধ্যাপক সারাভাইকে কয়েক মিনিট অপেক্ষা করার অনুরোধ জানালাম, তারপর টাইমার ডিভাইসটা সরিয়ে পাইরোর সঙ্গে সরাসরি সংযোগ দিয়ে দিলাম। অধ্যাপক সারাভাই আবার চাপ দিলেন বোতামে। পাইরো বিস্কুরিত হলো আর নোজ-কোন উৎক্ষিপ্ত হলো। অধ্যাপক সারাভাই আমাকে ও কালেকে অভিনন্দন জানালেন; কিন্তু অভিব্যক্তি দেখে বোঝা গেল তার মন রয়েছে অন্য কোথাও। আমরা অনুমান করতে পারলাম না তিনি কী ভাবছেন। তবে অনিশ্চয়তা বেশিক্ষণ থাকল না। অধ্যাপক সারাভাইয়ের সেক্রেটারি টেলিফোনে আমাকে জানালেন, জরুরি আলোচনার জন্য ডিনারের পর অধ্যাপক সারাভাই আমার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে চান।
অধ্যাপক সারাভাই অবস্থান করছিলেন কোভালাম প্যালেস হোটেলে, ত্রিবান্দ্রামে এলে সবসময় এই হোটেলেই তিনি থাকতেন। এখন তার কাছ থেকে তলব পেয়ে আমি খানিকটা হতবুদ্ধি হয়ে পড়েছিলাম। অধ্যাপক সারাভাই তার রীতিমাফিক উষ্ণতা সহযোগে আমাকে ভেতরে নিয়ে গেলেন। রকেট উৎক্ষেপণ কেন্দ্র, বিভিন্ন প্রকার সুযোগসুবিধা যেমন লঞ্চ প্যাড, ব্লক হাউজ, রাডার, টেলিমেট্রি ইত্যাদি বিষয়ে তিনি কথা বললেন। ভারতীয় মহাকাশ গবেষণায় যেসব বস্তু আজ মঞ্জুরি হিসাবে গৃহীত হয়েছে। তারপর তিনি সেই সকালের ঘটনা প্রসঙ্গে কথা তুললেন। ঠিক এ ভয়টাই আমি পেয়েছিলাম। যাহোক অধ্যাপক সারাভাই কিন্তু এটা উপসংহার করলেন না যে, তার লোকদের দক্ষতার অভাব এবং অপর্যাপ্ত জ্ঞানের কারণে পাইরো টাইমার সার্কিটে ব্যর্থতা ঘটেছে, কিংবা ডাইরেকশন স্টেজে তাদের ত্রুটিপূর্ণ বোঝাপড়ার জন্য এটা ঘটেছে। এসব কথার পরিবর্তে তিনি আমাকে বললেন, এই কাজটাতে যথেষ্ট চ্যালেঞ্জ ছিল না বলে কি আমরা তেমন। একটা কৌতূহলী ছিলাম না? তিনি আমাকে এও ভেবে দেখতে বললেন যে, যে সম্পর্কে সচেতন নই এমন কোনো সমস্যার দ্বারা কি আমার কাজ প্রভাবান্বিত হচ্ছে? তিনি শেষ পর্যন্ত মূল বিষয়ে আঙুল নির্দেশ করলেন। আমাদের সকল রকেট স্টেজ আর রকেট সিস্টেমের ইন্টিগ্রেশন পরিচালনার একটা একক আচ্ছাদনের অভাব আছে আমাদের। ইলেকট্রিক্যাল আর মেকানিক্যাল ইন্টিগ্রেশনের কাজ চলছে একটা বিশাল পার্থক্যের মধ্যে সময় আর স্থান উভয় ক্ষেত্রেই। এ দুটোর পার্থক্য খুঁচিয়ে একত্রিত করার কোনো চেষ্টা নেই। অধ্যাপক সারাভাই পরবর্তী ঘন্টা খরচ করলেন আমাদের কাজ পুনঃনির্ধারণ করে এবং একেবারে ভোরের দিকে একটা রকেট ইঞ্জিনিয়ারিং সেকশন স্থাপনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো।
