মূলত দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনায় ওই ডিজাইন অনুকূল ছিল বলে আমাদের কনফিগারেশন গৃহীত হয়। প্রফেসর ধাওয়ান দূরদর্শী ছিলেন বলেই আগামী ৫০ বছরের সময়োপযোগী ওই কনফিগারেশন নির্মাণের জন্য আমাদের নির্দেশ দিয়েছিলেন। আমি ও প্রফেসর নরসিমা ডেভেলপমেন্ট ইন ফ্লুইড মেকানিকস অ্যান্ড স্পেস টেকনোলজি নামে একটি বই লিখেছি। সে বইতে পিএসএলভির কনফিগারেশন নিয়ে লেখাসহ প্রফেসর ধাওয়ানর ১৫ বছর ধরে হাতে লেখা স্পেস প্রোফাইল প্রকাশ করেছি।
১৯৮২ সালের ৩১ মে আমার জীবনের একটি স্মরণীয় দিন। প্রফেসর ধাওয়ান আইএসআরওর একটি কাউন্সিল মিটিং ডাকলেন ভবিষ্যত রকেট উৎক্ষেপন বিষয়ে আলোচনা করার জন্য। সে মিটিংয়ে উপস্থিত ছিলেন পরিচালকবৃন্দ। আমি আমাদের লঞ্চ ভেইকলের ব্যয়ভার ও কাজের অগ্রগতি সম্পর্কে বক্তব্য দিলাম।
আমার বক্তব্য শেষ হবার পর প্রফেসর ধাওয়ান কোন পূর্ব ঘোষণা ছাড়াই জানালেন, আমাকে ডিআরডিওর দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তার এই সিদ্ধান্ত আমার ক্যারিয়ারে ব্যাপক পরিবর্তন আনে এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রে আমার অগ্রগতি হতে থাকে।
আজ আমরা যে স্বয়ংক্রিয় লঞ্চ ভেইকল বানাতে সক্ষম হয়েছি এবং যে পিএসএলভি অপারেশন সিস্টেম তৈরী করেছি তার প্রায় ৮০ শতাংশ কাজই করা হয়েছে ১৯৮০ সালে দেওয়া ধাওয়ানের ফর্মুলা অনুসরণ করে। শক্ত সাংগঠনিক ভিত্তি ও স্পেস প্রোফাইলের কারণে আইএসআরও সফল সংস্থা হিসেবে পরিচিত। এ পরিচিতির নেপথ্যেও ধাওয়ানের কৃতিত্ব রয়েছে।
এছাড়াও আইএসআরওর ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করেছেন অধ্যাপক ইউ.আর. রাও এবং ডক্টর কে কস্তুরিরঙ্গন। অবসর নেবার পরও প্রফেসর ধাওান স্পেস কমিশনের সদস্য ছিলেন এবং তার হাতে গড়া এ সংস্থার জন্য কাজ করেছেন আমরণ। তার জীবদ্দশাতেই তিনি আইএআরওর বহু ভবিষ্যত প্রোগ্রামের দিক নির্দেশনা দিয়ে গেছেন।
ডিআরডিওতে যোগ দিয়ে আমি ক্ষেপণাস্ত্র ডেভেলপমেন্টের কাজ শুরু করি। আইজিএমডিপি (ইন্টিগ্রেটেড গাইডেড মিসাইল ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রাম)র কাজ করার সময় আমি আমাদের স্থানীয় ডিজাইনের ওপর গুরুত্ব দিয়েছিলাম। এ ডিজাইনের আওতায় নির্মিত হয় ভূমি থেকে ভূমিতে উৎক্ষেপনযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র পৃথিবী। যথার্থ নির্ভুলতা, নির্ভরযোগ্য-কার্যপরিচালনা ও নির্ভুলভাবে ক্ষেপণাস্ত্রের বঙ্কিম পথ অনুসরণের জন্য পৃথিবী ভুবন বিখ্যাত মিসাইল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র অগ্নিতে এসএলভি-৩র প্রথম পর্যায়টি জুড়ে দেওয়া হয়। ১৯৮১ সালে আমার টিমের অনুমোদিত রেক্স (রিএন্ট্রি এক্সপেরিমেন্ট) প্রোগ্রামের ভিত্তিতে অগ্নি নির্মিত হয়। পৃথিবী ও অগ্নি দুটো ক্ষেপণাস্ত্রই আমাদের ডিআরডিওর প্রথম প্রোডাকশন।
এর ধারাবাহিকতায় পরবর্তীতে নির্মিত হয় ভূমি থেকে আকাশে উৎক্ষেপনযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র ত্রিশুল ও আকাশ।
তৃতীয় পর্যায়ে আমরা বানিয়েছি নাগ মিসাইল যেটি বিশ্বের সর্বাধুনিক ক্ষেপণাস্ত্রের মধ্যে অন্যতম। বর্তমানে ক্ষেপণাস্ত্র বিজ্ঞানে ভারত পৃথিবীর যে কোন উন্নত দেশের সংগে প্রতিদ্বন্দ্বীতা করার ক্ষমতা রাখে।
ডিআরডিওতে দায়িত্বপালনকালে এক সময় আমার মনে হল ক্ষেপণাস্ত্র নির্মাণের ক্ষেত্রে আমাদের আইজিএমডিপির বাইরে চিন্তা করতে হবে। আমার এ ধারণা আমি সুপারসনিক ক্রুজ মিসাইল নির্মানের ক্ষেত্রে ব্যবহার করি। অনেক দেশের হাতেই এখন যেসব ক্রুজ মিসাইল রয়েছে তা শব্দের গতির চেয়ে ধীরগামী।
আমাদের এসোসিয়েশন রাশিয়ার অন্যতম ইনস্টিটিউট এনপিও মাসিনোন্ত্ৰোয়নিয়ার সংগে যৌথভাবে কাজ করে একটি সুপারসনিক ক্রুজ মিসাইলের ডিজাইন করে। বন্ধুত্ব ও সমানাধিকারের ভিত্তিতে রাশিয়ার সংগে আমাদের এ পার্টনারশীপ গড়ে ওঠে। আমি আমার সহকারীদের নিয়ে এনপিও মাসিনোস্ত্রোয়নিয়ার মহাপরিচালক ড. এইচএ ইয়েফ্রেমোভর সংগে দেখা করি। এরিমভ আমাদের সময়ের সর্বশ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানীদের একজন ছিলেন। তিনি প্রায় সাত প্রকারের ক্রুজ মিসাইল নির্মাণ করেন এবং সেগুলো রাশিয়ার নৌবাহিনীতে এখন ব্যবহৃত হচ্ছে। রাশিয়া ও ভারতের মধ্যকার মিসাইল প্রযুক্তি সংক্রান্ত যৌথ উদ্যোগ ১৯৯০ সালের একটি বিরাট ঘটনা যা আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে ব্যাপক প্রভাব ফেলেছিল। এ উদ্যোগ আমার ও ইয়েফ্রেমোভের জন্য ছিল এক বিরাট চ্যালেঞ্জও।
যখন আমি ইয়েফ্রেমোভের সংগে দেখা করি তখন আমার মনে হয় আমি যেন মহান বিজ্ঞানী ডক্টর সতীশ ধাওয়ান অথবা রকেট প্রযুক্তির পিতা ডক্টর ওয়ার্নার ভন ব্রাউনের সংগে কথা বলছি। ডক্টর ইয়েমোভ আমাকে তার টেকনোলজি সেন্টারে নিয়ে গেলেন। ওই সেন্টারে সাধারণত কোন বিদেশীকে ঢুকতে দেওয়া হয় না। তিনি সত্যিকার অর্থেই আমাকে তার বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন এবং তার ল্যাবরেটরিতেই ভারতীয় খাবারের আয়োজন করলেন। আমিও তাকে হায়দ্রাবাদের মিসাইল প্রযুক্তি গবেষণা কেন্দ্র ইমারত পরিদর্শনের সুযোগ দিই। আমাদের বন্ধুত্ব দৃঢ় হল।
আমরা আমাদের এ যৌথ প্রকল্পের নাম দিলাম ব্রাহমোস। আমাদের ব্ৰহ্মপুত্র নদ ও ওদের মস্কো নামের সংযোজন ঘটিয়ে এ নাম রাখা হল। শিবতনু পিল্লাই, রমানাথ, ভানুগোপাল এবং ভাইস অ্যাডমিরাল ভারত ভূষণ রুশ বিজ্ঞানীদের সংগে মিলিত হয়ে ভারত-রাশিয়ার যৌথ প্রোগ্রাম শুরু করেন। শিবতন পিল্লাইকে একই সংগে যৌথ প্রকল্পের ব্যাবস্থাপনা পরিচালক ও চীফ এক্সিকিউটিভ অফিসার ও ডিআরডিওর ক্ষেপনাস্ত্র বিভাগের চীফ কন্ট্রোলার নিয়োগ করা হয়। যৌথ উদ্যোগ সফল করার জন্য সরকার তাকে যুগপভাবে দুটো বিভাগের দায়িত্ব দিয়েছিল। ডিফেন্স রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ল্যাবরেটরি, ডিআরডিএলর অন্যতম বিজ্ঞানী ভানুগোপালকে যৌথ উদ্যোগের প্রকল্প পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হল।
