জনতার ভিড় ফাঁকা হয়ে যেতে সহযোগীর দিকে তাকিয়ে বললেন ট্রিবিউন ফ্লেভিয়াস, তাহলে মেরুলাস, আপনি রাজধানীর দিকেই যান।
মেরুলাস বললেন, সে না হয় যাচ্ছি। আপনি তো ধমক দিয়ে সবাইকে বাড়ি পাঠালেন। এবার কী করবেন। আপনি?
ফ্লেভিয়াস উত্তর দিলেন, আমি শুনেছি কিছু লোক নাকি শহরের মধ্যে সিজারের একটা মূর্তি বসিয়ে তাকে ফুল-মালায় সাজিয়েছে। আমি চাই মূৰ্তিটা খুঁজে বের করে সেটা ভেঙে দিয়ে আসতে।
যাই করুন না কেন, সেটা চিন্তা-ভাবনা করে করবেন, তাকে সাবধান করে বললেন মেরুলাস, আজ আবার লুপারকাল উৎসবের দিন। শহরের সব বাড়িতেই ভালোমত খানাপিনা হবে।
সে যাই হোক, তাতে আমার কিছু আসে যায় না, বললেন ফ্লেভিয়াস, আমি আপনাকে বলে দিচ্ছি। রোমের রাস্তা-ঘাটে সিজারের মূর্তি দেখতে পেলে আমি তা ভেঙে গুড়িয়ে দেব। আমি চাই আপনিও তা করুন। সিজারের সম্মানের জন্য কোথাও সাজ-সজ্জার ব্যবস্থা হয়েছে দেখলে আপনি তা টেনে ছিড়ে ফেলে দেবেন। সিজারের বড় বড় বেড়েছে। ওর ক্ষমতা বেড়ে যাবার আগেই ধ্বংস করতে হবে তাকে। নইলে ঝামেলায় পড়ে যাব আমরা। এসব কথা বলতে বলতে দু-জন দু-দিকে চলে গেলেন।
রাজধানী রোম শহরের মধ্যে সাধারণত যে জায়গায় সভাসমিতি হয়, জুলিয়াস সিজার চলে এলেন সেখানে, সাথে পত্নী কালফুর্নিয়া, মার্ক অ্যান্টনি, ব্রুটাস, ক্যাসিক, সিসেরো ও ডেসিয়াস। সিজারের পেছন পেছন এল জনতার এক বিশাল বাহিনী। তাদের মধ্যে ছিলেন দুই ট্রিবিউন ফ্রেভিয়াস আর মেরুলাস। সেই সাথে ছিল ভবিষ্যৎবক্তা এক জ্যোতিষী।
স্ত্রীকে ডেকে সিজার বললেন, কালফুর্নিয়া! তুমি গিয়ে সোজাসুজি দাঁড়াও অ্যান্টনির যাবার পথে। আর অ্যান্টনি! তুমি কিন্তু ভুলে যেও না যাবার পথে কালফুর্নিয়াকে একবার ছুঁয়ে যেতে। কিন্তু দুজনের কেউ বুঝতে পারল না একথা বলার মানে কী। তারা অবাক হয়ে চেয়ে রইল সিজারের দিকে।
মৃদু হেসে বললেন, বুঝতে পারছি না, তাই না? পুরনো দিনের লোকেরা বলতেন লুপারকাল উৎসবের তারিখে যাবার পথে যদি কোনও বীর যোদ্ধা বন্ধ্যা নারীকে ছুঁয়ে দেয়, তাহলে সে নারী গৰ্ভবতী হয়ে ওঠে।
সিজারের আদেশ শুনে অ্যান্টনি বললেন, আমি অবশ্যই আপনার কথা মনে রাখব। সিজার। সে সময় ভিড়ের মাঝ থেকে চেঁচিয়ে বলে উঠল। সেই ভবিষ্যৎবক্তা জ্যোতিষী, মহামান্য সিজার। আইডস অব মার্চ (১৫ মার্চ) দিনটা আপনার পক্ষে অশুভ! আগে থেকেই আপনি সে ব্যাপারে সাবধান হবেন।
কে বলল কথাটা? জানতে চাইলেন সিজার। আজ্ঞে, ও একজন জ্যোতিষী, জবাব দিলেন ব্রুটাস, ও বলছে আইডস অব মার্চ দিনটি আপনার পক্ষে অশুভ। তাই আগে থেকে ও ব্যাপারে আপনাকে সাবধান করে দিচ্ছে সে।
সিজার আদেশ দিলেন, যাও, লোকটাকে ধরে নিয়ে এস আমার সামনে। আমি দেখতে চাই তাকে সিজারের কথা শেষ হতে না হতেই ভিড়ের মাঝ থেকে লোকটাকে টানতে টানতে সিজারের সামনে এনে হাজির করল কাসকা।
সিজার বললেন, তুমি জ্যোতিষী? আবার বল তো কিছুক্ষণ আগে তুমি আমায় যা বলছিলে।
জ্যোতিষী বলল, গণনায় দেখতে পাচ্ছি। আইডস অব মার্চ দিনটি আপনার পক্ষে অশুভ। তাই সাবধান হতে বলেছি আপনাকে।
ভালোভাবে লোকটির মুখখানা দেখে সিজার বললেন, বেচারা বোধহয় স্বপ্ন দেখছে। যাই হোক আমি এখন যাচ্ছি। উৎসবের যেন কোনও ত্রুটি না হয়।
কথা শেষ হবার পর পত্নী কালফুর্নিয়া আর মার্ক অ্যান্টনিকে সাথে নিয়ে অন্যদিকে চলে গেলেন সিজার। শুধু ব্রুটাস আর ক্যাসিয়াস সেখানে দাঁড়িয়ে নিজেদের মধ্যে আলোচনা করতে লাগল সিজারকে নিয়ে।
এবার ব্রুটাসের দিকে তাকিয়ে বললেন ক্যাসিয়াস, যাও হে, উৎসবের বাকিটুকু দেখে এস।
নিষ্পৃহ গলায় উত্তর দিল ব্রুটাস, না ভাই, ও সব হইচই খেলাধুলা, অ্যান্টনির ভালো লাগতে পারে, ওতে আমার কোনও উৎসাহ নেই। তুমি যা বলতে চাও, এইবেলা বলে ফেল। আমায় আর উৎকণ্ঠার মাঝে রেখা না। এখন আমায় বাড়ি যেতে হবে।
কাতর স্বরে বলল ক্যাসিয়াস, আজি-কাল দেখছি তুমি আমায় দেখতে পেলেই বেশ গভীর হয়ে যাও। আরও লক্ষ করেছি আমার প্রতি তোমার স্নেহ-ভালোবাসাও সেরূপ নেই। দয়া করে এর কারণটা বলবে কি?
অবাক হয়ে বলল ব্রুটাস, কী বলছি তুমি? তোমায় দেখলে আমি গভীর হয়ে যাই? নিশ্চয়ই তুমি আমায় ভুল বুঝেছ ক্যাসিয়াস।
তোমাকে দেখে গম্ভীর হবার কোনও কারণ এখনও ঘটেনি। আসলে ব্যাপারটা হচ্ছে মনের ভেতর যে অন্তৰ্দ্ধন্দ্ব হচ্ছে তাতেই ক্ষত-বিক্ষত হচ্ছি আমি। এসব নিয়ে এত বিব্রত আমি যে কোনও বন্ধুর সাথে দেখা হলেও বন্ধুসুলভ আচরণ করা হয়ে ওঠে না তার সাথে।
মানসিক অস্তদ্বন্দ্বে ক্ষত-বিক্ষত ব্রুটাস? এতো সোনায় সোহাগা! যে বিষয়ে আলোচনা করতে চায় ক্যাসিয়াস, তার দরজা নিজেই খুলে দিল ব্রুটাস। হঠাৎ বলে উঠলেন ক্যাসিয়াস, আচ্ছা! ব্রুটাস, তুমি কি নিজের মুখ নিজে দেখতে পাও?
পালটা প্রশ্ন করলেন ব্রুটাস, তা কী সম্ভব? আরসি ছাড়া কি নিজের মুখ দেখা যায়?
সায় দিয়ে ক্যাসিয়াস বললেন, এবার একটা খাঁটি কথা বলেছ তুমি। এমন কোনও আরসি। নেই যার মধ্যে তুমি দেখতে পাবে তোমার ভেতরের যোগ্যতা আর গুণাবলি। আমি নিজে দেখেছি এই শহরে সিজার ছাড়া বহু নামি লোক আছেন যাদের মুখে অহরহ শোনা যায় ব্রুটাসের নাম। তারা সবাই মানসিক-দ্বন্দ্বের শিকার। এতে কোনও দ্বিরুক্তি নেই যে ব্রুটাসের মন জয় করার উদ্দেশ্যেই এ সব কথা বলছে ক্যাসিয়াস।
