তা সেখানে কাজ-কম্মো কিছু করা? জিজ্ঞেস করলেন ক্লেভিয়াস।
উৎসাহিত হয়ে যুবকটি জবাব দিল, আজ্ঞে, গ্রামে আমার কামারশালা আছে, আমি তার দেখাশোনা করি।
চাপা গলায় তাকে ধমকে বললেন ক্লেভিয়াস, সাত-সকালে কাজ-কম্মো ছেড়ে বউকে নিয়ে এতদূর এসেছি কেন? আবার দুজনের হাতেই দেখছি সাজিভরা ফুল। তা কোন দেবতার চরণে দেবে এগুলি?
যুবতি বউটি হেসে জবাব দিল, জুলিয়াস সিজারকে। শুনেছি। অনেক দেশ জয় করে ফিরে আসছেন সিজার। একটু বাদেই নাকি তিনি রথে করে এপথ দিয়ে যাবেন। তাকে দেবার জন্যই গাছের এই সামান্য ফুলগুলি নিয়ে এসেছি আমরা।
চাপা গলায় বললেন ফ্লেভিয়াস, সিজারকে দেবে বলে এনেছ? তোমরা কি খোঁজ রাখি যুদ্ধে সিজার কাকে হারিয়েছেন?
হ্যাঁ জানি— জবাব দিল যুবকটি। যুদ্ধে পরাজিত করে পম্পিকে হত্যা করেছেন সিজার। তাকে শ্রদ্ধা জানাবার জন্যই দাঁড়িয়ে আছি এখানে।
এতক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে অধৈর্য হয়ে উঠেছেন ফ্লেভিয়াসের সঙ্গী ট্রিবিউন মেরুলাস। দু-জন গ্ৰাম্য যুবক-যুবতির সঙ্গে এত কী কথা থাকতে পারে ফ্লেভিয়াসের—একথা জানার কৌতূহল চাপতে না পেরে পায়ে পায়ে তিনি এগিয়ে এলেন তাদের দিকে। তাকে দেখতে পেয়ে উত্তেজিত হয়ে বললেন ফ্লেভিয়াস —এবার আপনিই দেখুন ব্যাপারটা! যুদ্ধে পম্পিকে হারিয়ে তাকে মেরে ফেলেছেন সিজার–এ খবর শুনে ওদের আর আনন্দের সীমা নেই। সিজার এদিক দিয়ে ফিরবেন শুনে সাত-সকলে গা ছেড়ে ওরা চলে এসেছে এখানে। এপথ দিয়ে যাবার সময় ওরা ফুল দিয়ে সিজারকে অভ্যর্থনা জানাবে।
ট্ৰিবিউন মেরুলাস বললেন, শুধু এরাই নয়, আরও শত শত মানুষ সে উদ্দেশে এখানে এসেছে, সে তো আপনি নিজের চোখেই দেখলেন।
আক্ষেপ করে বললেন ফ্লেভিয়াস, তাই তো দেখছি। যে পম্পিকে যুদ্ধে হারিয়ে তাকে হত্যা করেছেন সিজার, সেই পম্পিকে সম্মান জানাবার জন্য একদিন রোমের রাজপথে ভিড় জমাত আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা! আমি নিজে দেখেছি পম্পিকে সম্মান জানানোর জন্য দুধের বাচ্চাকে কোলে নিয়ে ফুলের সাজি হাতে যুবতিরা সকাল-সন্ধে অপেক্ষা করেছে। অদৃষ্টের পরিহাসে সে ছবিটা আজ পুরোপুরি পালটে গেছে। পম্পির হত্যাকারীকে সম্মান জানাতে তারা সব কাজ-কর্ম ফেলে দলে দলে ছুটে আসছে। যে গ্ৰাম্য-দম্পতিকে উদ্দেশ করে এসব কথা বলা, তারা তো অনেক আগেই চলে গেছে। তবুও ভিড়ের মাঝে অনেকেরই কানে এল ফ্লেভিয়াসের আক্ষেপ।
ভিড়ের মাঝে সমবেত লোকদের লক্ষ্য করে আপন মনে বলতে লাগলেন ফ্রেভিয়াস, এই সেদিন পর্যন্ত রোমের নিয়ন্ত্রক ছিলেন সেনাপতি পম্পি! আশ্চর্য! তোমরা কিনা এত সহজে তাকে ভুলে গেলে? সিজারের সাথে যুদ্ধে পম্পি হেরে যাওয়ায় আজ তোমরা সিজারের গুণ-গান করছা! পম্পির উপকারের কথা তোমরা এত সহজেই ভুলে গেলে? তোমরা নিশ্চয়ই জান উপকারীর উপকার যে স্বীকার করে না সে অকৃতজ্ঞ ছাড়া আর কিছু নয়। যাও, চলে যাও তোমরা। বাড়ি গিয়ে দেবতার সামনে হাঁটু গেড়ে পাপের প্রায়শ্চিত্ত কর তোমরা। নইলে দেবতার রোষে ধ্বংস হয়ে যাবে রোম।
কানুন, যার বলে তারা অসীম ক্ষমতার অধিকারী। রোমের সাধারণ মানুষেরা মনে করে তারা গরিব জনসাধারণের প্রতিনিধি। তাই ট্রিবিউন ফ্রেভিয়াসের ধমক খেয়ে আস্তে আস্তে ভিড় ফাকা হয়ে গেল। যারা সিজারকে সম্মান জানাতে এসেছিল, ফ্লেভিয়াসের ধমক খেয়ে মুখ কালো করে তারা সবাই ফিরে গেল। সাধারণ মানুষ মোটেও ভাবে না পম্পি বা সিজারকে তাদের জন্য কী করেছে। যে সব উচ্চাভিলাষী তাদের পথের বাধা দূর করে তাঁর তর করে এগিয়ে যেতে পারেতাকে নিয়েই মাতামাতি করে লোকেরা, মাথায় তুলে নাচে, ফুল দিয়ে সংবর্ধনা জানায় তাকে।
প্রায়-দু-হাজার বছর ধরে রোমের বীর সেনাপতিরা দুৰ্দান্ত লড়াই করে একের পর এক নতুন রাজ্যের সৃষ্টি করেছেন। এমনই এক বীর সেনাপতি ছিলেন পম্পি। এই সেদিন পর্যন্ত রোমের প্রতিটি মানুষ তাকে দেশের ভাগ্য-নিয়ন্তা বলে মানত। কিন্তু যুদ্ধে পরাজিত হবার পর সিজার নিজ হাতে হত্যা করেন পম্পিকে। আজকে আমরা যাকে ফ্রান্স ও ব্রিটেন বলে জানি, সেখানে তারা পরিচিত ছিল গল ও ব্রিটানি নামে। ওই দুটি রাজ্যে পাকাপাকিভাবে রোমান শাসন প্রবর্তন করে বহুদিন বাদে বিজয়ীর বেশে দেশে ফিরে আসছেন সিজার।
রোমে এমন বহু লোক এখনও আছে যারা পম্পি মারা যাবার পরও তাকে সমর্থন করে জুলিয়াস সিজারকে ভাবে দেশের শত্রু। অন্য দল মনে করে সিংহাসনে বসলে প্রচুর ক্ষমতার অধিকারী হবেন সিজার। দেশ ও দশের পক্ষে তা মোটেই কল্যাণকর নয়। এই দ্বিতীয় দলের মধ্যে রয়েছে অনেক বুদ্ধিজীবী মানুষ যারা আবার সিজারের বন্ধুও বটে। এদের মধ্যে অনেকেই ভালো যোদ্ধা। — তারা মনে করেন সুযোগ এবং ভাগ্য সুপ্ৰসন্ন হলে তারা অনেকেই সিজারের মতো কৃতিত্ব দেখাতে পারতেন। দিন দিন যে ভাবে জুলিয়াস সিজারের ক্ষমতা বেড়ে চলেছে তা দেখে অনেকের চোখের ঘুম উবে গেছে। সিজারকে ক্ষমতাচুৰ্যত করার সংকল্প নিয়ে তারা একজোট হয়েছেন। তারা আপ্ৰাণ চেষ্টা করছেন দেশের জনমত যাতে সিজারের বিরুদ্ধে যায়–তারা চাইছেন দেশের মানুষকে সিজারের বিরুদ্ধে উত্তেজিত করে তুলতে। কিন্তু জয়ের আনন্দে ডুবে থাকা সিজার এ ষড়যন্ত্রের বিন্দুমাত্ৰ আভাসও পাননি। শুরুতে আমরা ফ্লেভিয়াস আর মেরুলাস নামে যে দুজন ট্রিবিউনকে দেখতে পেয়েছি তারা উভয়েই সিজারবিরোধী। তাদের কথাবার্তাই এর প্রমাণ।
