স্পষ্ট করে বল তো ক্যাসিয়াস, কী বলতে চাও তুমি? জানতে চাইল ব্রুটাস, কেন তুমি বলছি আমার গুণাবলির দিকে নজর দিতে?
ক্যাসিয়াস বলল, তাহলে শোন তুমি, এবার থেকে আমি হব সেই আয়না যার মধ্যে ফুটে উঠবে তোমার গুণাবলি–– যার সম্বন্ধে কোনও কিছুই জানা নেই তোমার। তার কথা শেষ হতে হতেই কানে এল বহু মানুষের কোলাহল, আনন্দ আর জয়ধ্বনি।
ক্যাসিয়াস! ও কীসের জয়ধ্বনি? জানতে চাইল ব্রুটাস; তাহলে কি সবাই মিলে রাজা বানিয়ে দিলে সিজারকে?
ব্রুটাসকে একটু খোঁচা দেবার লোভ সামলাতে না পেরে ক্যাসিয়াস বললেন, মনে হচ্ছে সিজার রাজা হোক এতে তোমার আপত্তি আছে।
আপত্তি আছেই তো! বললেন ব্রুটাস, তা সত্ত্বেও সিজারকে আমি ভালোবাসি, সে কথা মনে রেখা তুমি। আমি আবারও বলছি সত্যি করে বল তো আমার কাছে কী চাও তুমি! যদি জনসাধারণের কল্যাণমূলক কিছু বলতে চাও, তাহলে নিৰ্ভয়ে বলতে পার তুমি। যদি তার সাথে সম্মান এবং মৃত্যু–দুটোই জড়িত থাকে, তাহলেও তা নিয়ে মাথা ঘামাব না আমি।
যাক, এতক্ষণে তুমি আঁচ করতে পেরেছ আমার বক্তব্যের কিছুটা, বললেন ক্যাসিয়াস, তুমি ঠিকই বলেছ ব্রুটাস, আমি যা বলতে যাচ্ছি তার সাথে জড়িয়ে আছে দেশের মানুষের মঙ্গল এবং মর্যাদার প্রশ্ন! তুমিই ভেবে দেখ না কেন আমরা উভয়েই ছোটোবেলা থেকে যা খেয়ে বড়ো হয়েছি, সেই খাবার সিজােরও খেয়েছে। সিজারের চেয়ে বেশি ছাড়া কম শক্তিধর নই আমরা। এই সেদিনের কথাই ধরনা কেন, বর্ষায় ফুলে ফেপে ওঠা টাইবার নদীর সামনে গিয়ে সিজার আমাকে বলল, এই নদীতে ঝাপ দিতে পারবে তুমি? তার কথার উত্তর না দিয়ে নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়লাম আমি। সাথে সাথে সিজারও নেমে পড়ল। অনেকক্ষণ ধরে বেশ ভালোভাবে সাঁতার কেটে চলেছি আমরা, এমন সময় কানে এল সিজারের আর্ত কণ্ঠস্বর, আমায় বাঁচাও ক্যাসিয়াস! জলে ডুবে যাচ্ছি আমি। জল থেকে সেদিন তাকে না তুললে নদীর অতলে তলিয়ে যেত সিজার। পম্পিকে হত্যা করে রোমের মানুষের কাছে সেই সিজার। আজ দেবতা। আর তাকে প্ৰাণে বঁচিয়েও এই হতভাগা ক্যাসিয়াস আজও সেই ক্যাসিয়াসই রয়ে গেল। সিজারের কথা রোমের মানুষের কাছে আজ দৈববাণী স্বরূপ। তুমি কি জান সিজার একজন মৃগী রোগী? প্রচণ্ড জুরের ঘোরে মৃগীরোগের তাড়নায় বেঙ্কুশ হয়ে থারথার করে কঁপিছে তার দেহ–সিজারের এরূপ অবস্থা আমি নিজের চোখে দেখেছি! আমি আশ্চর্য হয়ে ভাবছি কীভাবে সেই লোকটা এত ক্ষমতাবান হয়ে উঠল।
ক্যাসিয়াসের কথা শেষ হতে না হতেই পুনরায় শোনা গেল সিজারের নামে জনতার জয়ধ্বনি।
ব্রুটাসের গলায় আশঙ্কার সুর ফুটে বলল। সে বলল, মনে হয় রোমের লোকেরা নতুন কোনও সম্মানে ভূষিত করছে সিজারকে। তাই বারবার জয়ধ্বনি দিচ্ছে তার নামে।
সম্মানের কথা কী বলছি ব্রুটাস! বললেন ক্যাসিয়াস, এই মুহূর্তে রোমে সিজার ছাড়া অন্য কেউ নেই যে এরুপ নাগরিক সংবর্ধনার যোগ্য। কী আশ্চর্য দেখ, এই লোকটা কীভাবে পুরো দেশটা শাসন করছে। আগে কখনও এমনটি দেখেছ? অথচ ভেবে দেখ সিজারের মধ্যে এমন কী আছে যা তোমার নেই। তুমি কি জান ব্রুটাস নামে তোমার এক পূর্বপুরুষ তার বীরত্ব ও দেশপ্রেমের জন্য লোকের কাছে কত আদরণীয় ছিলেন? দেশের সম্মান রক্ষা করার জন্য তিনি শয়তানের সাথে লড়তেও রাজি ছিলেন। ভাব তো সে সব কথা! আজি কিনা সিজারের মতো লোক দেশের রাজা হতে চলেছে? আর ব্রুটাস তুমি, সেই ব্রুটাসই রয়ে গেলে। এখন আমার প্রশ্ন এসব কি ঠিক হচ্ছে, আর কেনই বা এসব হতে দেব?
ক্যাসিয়াসের দিকে চেয়ে ব্রুটাস বললেন, আমি বেশ বুঝতে পারছি তোমার মনের অবস্থা। এবার আমি কিছুটা আন্দাজ করতে পারছি তুমি আমায় দিয়ে কী করাতে চাও। তবে এ ব্যাপারে এখনই আমি কিছু বলব না, যা বলার তা পরে বলব। তুমি আজ বাড়ি চলে যাও। পরে এ ব্যাপারে তোমার সাথে আলোচনায় বসব আমি।
ব্রুটাসের কথা শেষ হতে না হতেই সঙ্গী-সাথীদের নিয়ে ফিরে এলেন সিজার। ব্রুটাস আর ক্যাসিয়াসকে দেখতে পেয়ে ভুরু কুঁচকে তাকালেন তাদের দিকে। তারপর গলা চড়িয়ে বললেন, মার্কাস অ্যান্টনিয়াস!
সিজারের আহ্বানে অনুগত ভূত্যের মতো তার সামনে এসে দাঁড়াল মার্ক অ্যান্টনি।
সিজার বললেন, দেখ অ্যান্টনি, কয়েকজন মোটাসোটা সরল মনের লোকের প্রয়োজন আমার। তুমি সেরূপ কয়েকজন লোককে পাঠিয়ে দেবে। দেখবে লোকগুলো যেন ক্যাসিয়াসের মতো লিকলিকে না হয়। ক্যাসিয়াসের যেমন হাড়-জিরজিরে চেহারা, তেমনি কোটরে বসা ওরা দুচোখের চাহনি কত তীক্ষ আর জোরালো। মনে হয় ও খুব চিন্তা-ভাবনা করে, মাথা ঘামায়। এসব লোক কিন্তু খুবই বিপজ্জনক।
অ্যান্টনি বললেন, না মহামান্য সিজার, ক্যাসিয়াসকে আপনি সেরূপ লোক ভাববেন না। দেখতে রোগ হলেও উনি একজন সৎ এবং মহান রোমান।
সিজার বাধা দিয়ে বললেন, অ্যান্টনি! তোমার কথা সঠিক নয়। আমি আবারও বলছি ক্যাসিয়াস একটু মোটা হলে ভালো হত। ভুলে যেওনা ও প্রচুর পড়াশুনো করে। সবকিছু খুঁটিয়ে পর্যবেক্ষণ করার ক্ষমতা রয়েছে ওরা। তোমার মতো ক্যাসিয়াসও খেলাধুলা, গানবাজনা কিছুই ভালোবাসে না–এমনকি প্ৰাণ খুলে হাসতেও জানে না। যারা প্ৰাণ খুলে হাসে তাদের ও ঘেন্না করে। এসব লোক যখন দেখে তাদের পরিচিত কেউ অনেক উপরে উঠে গিয়েছে, তখন তারা হিংসায় জুলেপুড়ে মরে। এদের থেকে যতটা সম্ভব ব্যবধান রেখে চলা উচিত। তাই বলে ভেব না যেন আমি এদের ভয়ে ভীত। আমি জুলিয়াস সিজার–কাউকে ভয় পাই না আমি।
