উৎসুক হয়ে আলবেনি বললেন, কে তিনি?
উনি হলেন নির্বাসিত কেন্ট, যিনি আজও ছদ্মবেশে রয়েছেন, উত্তর দিল এডগার।
এ সময় হাতে একটা রক্তাক্ত ছুরি নিয়ে ঘরে প্রবেশ করল একজন ভৃত্য। সে চেঁচিয়ে বলল, কে কোথায় আছ, বাঁচাও আমাকে।
আলবেনি বলল, কী হয়েছে?
ছুরিতে ওই যে রক্ত দেখছেন, তা আপনার স্ত্রীর। ওটা দিয়েই আত্মহত্যা করেছেন তিনি। আর মরার আগে বোনকেও তিনি বিষ খাইয়ে মেরেছেন, বলল সেই ভৃত্য।
এডমন্ড বলল, বাঃ বেশ ভালেই হয়েছে। এবার নিশ্চিন্তে বিয়ে করতে পারব আমরা।
এডগার বললেন আলবেনিকে, মহাশয়, ওই দেখুন, এদিকেই আসছেন কেন্ট।
দূর থেকে কেন্টকে আসতে দেখে শ্ৰদ্ধাভরে বলল আলবেনি, ভেবে পাচ্ছি না। কী দিয়ে আপনার মতো মাননীয় ব্যক্তিকে সম্মান জানাব।
কেন্ট বলল, রাজা কোথায়? আমি এসেছি তার কাছ থেকে বিদায় নিতে।
চমকে উঠলেন আলবেনি, তিনি বললেন, সত্যিই তো রাজালিয়ার আর তার মেয়ে কর্ডেলিয়া কোথায়?
কেন্ট বলল, যদিও আর বেশিক্ষণ বঁচিব না, তবুও তার আগে একটা কাজ করে যেতে চাই আমি। তাড়াতাড়ি একটা লোককে প্রাসাদ দুর্গে পাঠাতে হবে এই পরিচয় চিহ্ন আর তলোয়ারটা দিয়ে। অনেক আগেই ওদের মেরে ফেলার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
আলবেনি বলল, যাও, শীঘ্ৰ যাও।
তলোয়ারটা হাতে নিয়ে যত দ্রুত সম্ভব দুর্গের দিকে ছুটে গেল এডওয়ার্ড। তার যাবার দিকে তাকিয়ে বলল এডমন্ড, আমার আর গনেরিলের আদেশ অনুযায়ী ওরা তো কর্ডেলিয়াকে মেরে ফেলবে, কিন্তু বাইরে আমরা রটিয়ে দেব দুঃখে আর হতাশায় আত্মহত্যা করেছে কর্ডেলিয়া।
কর্ডেলিয়ার মৃতদেহ কোলে নিয়ে পাগলের বেশে ঘরে এসে ঢুকলেন রাজা লিয়ার। ক্যাপ্টেন, এডগার আর অন্য সবাই ঢুকাল তার পিছু পিছু।
ওগো, তোমরাকি সবাই পাথর হয়ে গেলে? প্ৰাণপণে প্ৰতিবাদ কর তোমরা। সে যে চিরকালের মতো ছেড়ে গেছে আমায়। একটা আয়না দেও আমায়। আমি দেখব ওর মাঝে এখনও প্ৰাণ আছে কিনা— পাগলের মতো বলতে লাগলেন রাজা লিয়ার।
এডগার ও কেন্ট বলল, সত্যিই কী ভয়াবহ পরিণতি রাজা লিয়ারের।
ওগো, তোমরা দেখ ওর আঁচলটা নড়ছে, ও এখনও বেঁচে আছে। কে তুমি, চলে যাও বলছি, বললেন লিয়ার।
মহারাজ, ইনি আপনার বন্ধু কেন্ট, বলল এডগার।
লিয়ার বলল, তোমরা মিথ্যেবাদী। মানুষ খুনের দায়ে অভিযুক্ত তোমরা। হয়তো বাঁচাতে পারতাম তাকে। কিন্তু … কর্ডেলিয়া, তুমি যেও না, দাঁড়াও, তাকিয়ে দেখ তোমার হত্যাকারীকে ফাসি দিয়েছি আমি।
কে তোমরা? ভালো করে দেখতে পাচ্ছি না আমি। তুমিই কি কেন্ট?
হ্যাঁ প্ৰভু, আমিই কেন্ট, যে আপনার দুঃখে আন্তরিকভাবে দুঃখিত।
রাজা লিয়ার স্বাগত জানাচ্ছে তোমায়।
কেন্ট বলল, আপনার দুই মেয়ে আজ মৃত। শ্মশানে পরিণত হয়েছে তাদের রাজ্য।
আমারও মনে হয় তাই, বললেন লিয়ার।
আলবেনি বলল, মাননীয় কেন্ট, মেয়ের শোকে উনি পুরোপুরি উন্মাদ। এসব কথা আজ ওর কাছে অর্থহীন।
কেন্ট বলল আলবেনিকে, মহাশয়, এডমন্ডের মৃত্যু হয়েছে।
সে কথায় কান না দিয়ে আলবেনি বলল, মাননীয় লর্ড এবং আমার বন্ধুরা, এবার আপনারা আমার মনোগত অভিপ্রায় শুনুন। বৃদ্ধ রাজাকে আমি আমার সমস্ত সম্পত্তি দিয়ে দিলাম। আজ থেকে ওর সেবায় নিয়োজিত রাখব নিজেকে। প্রিয় এডগার ও কেন্ট, পূর্বের মতো নিজেদের সাম্রাজ্য নিজের হাতে নিয়ে বন্ধুত্বের বন্ধনে আবদ্ধ হন। আপনারা।
সবাই তাকিয়ে রইল রাজার দিকে। লিয়ার বলতে লাগলেন, হায় হতভাগী কর্ডেলিয়া! তুমি কি কিছু বলতে চাইছ? চিৎকার করে বললেন তিনি, কিছু বল আমায়। আমি তোমার বৃদ্ধ পিতা হতভাগ্য রাজা লিয়ার। আমার মেয়ে কি আজও বেঁচে আছে? ওর ঠোঁট যেন নড়ছে। এডগার, তুমি দেখতো একবার। ওঃ ভগবান! বলেই অজ্ঞান হয়ে মাটিতে পড়ে গিয়ে সাথে সাথেই মারা গেলেন তিনি। কাতর স্বরে বলল প্ৰভুভক্ত কেন্ট, প্রচণ্ড দুঃখ-শোকেই মৃত্যু হল রাজার।
প্ৰভু, একবার চোখ মেলে তাকান, বলল এডগার।
ওর জীবনকে দীর্ঘায়িত করে আর তাকে কষ্ট দিও না তুমি, বলল কেন্ট, জীবনের প্রতি বিতৃষ্ণা এসে গিয়েছিল রাজার। এই প্রচণ্ড কষ্ট এতদিন ধরে তিনি কীভাবে সহ্য করেছেন তা ভেবে আমি অবাক হয়ে যাচ্ছি।
আলবেনি বলল, এবার আপনারা রাজ্যের শাসনভার গ্রহণ করুন।
কেন্ট বলল, আমার পক্ষে তা সম্ভব নয়। প্রভুর সঙ্গ ছাড়া আমার জীবন অর্থহীন। তিনি ডাকছেন আমায়, আমি চললাম তার কাছে।
শেষে বলল এডগার, বয়স বাড়ার সাথে সাথে নানা বাধা-বিয়ের মধ্য দিয়ে মানুষ দুঃখের স্বাদ যেমন পায়, তেমনি অর্জন করে নানারূপ অভিজ্ঞতা। অল্প বয়সিরা এসব জানে না। তাই আমাদের উচিত সর্বদা সত্যের পথ অনুসরণ করা— আর সেই সাথে বর্তমান সময়ের ভার বহন করা।
জুলিয়াস সিজার
প্রচণ্ড ভিড়ের মাঝে দাঁড়িয়ে থাকা দুই যুবক যুবতিকে উদ্দেশ করে চেঁচিয়ে বললেন ট্রিবিউন ক্লেভিয়াস, ওহে! শোন একটু। আমি তোমাদেরই বলছি, বলে পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ট্রিবিউন মেরুলাসকে ইশারায় অপেক্ষা করতে বলে তাদের সামনে এসে দাঁড়ালেন। যুবকটিকে দেখিয়ে তিনি জানতে চাইলেন মেয়েটির কাছে, ও তোমার কে হয়?
কথা শুনে লজ্জা পেল মেয়েটি, বলল, আজ্ঞে ও আমার স্বামী।
ক্লেভিয়াস জানতে চাইলেন, কোথা থেকে আসছ তোমরা?
ভয়ে ভয়ে যুবকটি উত্তর দিল, গ্রাম থেকে আসছি আমরা।
