রক্ষীসহ লিয়ার আর কর্ডেলিয়া চলে যাবার পর একটা কাগজ ক্যাপ্টেনের হাতে দিয়ে তাকে নির্দেশ দিল এডমন্ড, মনে রেখ, এই চিঠির নির্দেশ অনুযায়ী যে গুরুত্বপূর্ণ কাজ তোমায় দেওয়া হয়েছে, তা পালন করতে পারলে পদোন্নতি হবে তোমার। যাও, কাজটা তাড়াতাড়ি করে এস।
এ সময় নেপথ্যে বাদ্যধ্বনি শোনা গেল। তারই সাথে প্রবেশ করল আলবেনি, গনেরিল, রিগান আর সৈন্যেরা। আলবেনি বলল, সাবাস এডমন্ড! আজকের যুদ্ধে তুমিই জয়ী হয়েছ। এবার আমি আমার ইচ্ছেমত বন্দিদের শাস্তি দেব।
আলবেনির কথা শুনে এডমন্ড খুশি হল। সে বলল, রাজা এবং কর্ডেলিয়ার এই অবস্থা দেখে দেশের মানুষ যাতে বিদ্রোহ করতে না পারে, সে জন্যই কঠোর পাহারায় রেখেছি তাঁদের। এরপর ঠান্ডা মাথায় একদিন তাদের বিচার করা যাবে।
আলবেনি বল, তুমি বোধহয় তোমার পদমর্যাদার কথা ভুলে গেছ এডমন্ড। মনে রেখা তুমি রাজার আত্মীয় নও, একজন প্ৰজা মাত্র।
রিগান বলল আলবেনিকে, মহাশয়, দয়া করে ভুলে যাবেন না যে আমার সাথে ঘনিষ্ঠতার জন্যই আজ উনি আপনাদের সমপর্যায়ভুক্ত এক সহকর্মী।
তোমার শক্তি, একথা বোলোনা বোন, উনি নিজ বলেই বলীয়ান, বলল গনেরিল।
রিগান বলল, নিজের মতোই আজ আমি ওনাকে সমস্ত সম্মান সম্রাম দান করলাম। হে আ-র প্রিয় সেনানায়ক, সবার সামনে আমি ঘোষণা করছি যে আজ থেকে তুমিই আমার স্বামী এবং প্রভু। আমার সমস্ত জীবন সমর্পণ করলাম তোমার হাতে।
ছিঃ ছিঃ রিগান, ধিক্কার দিয়ে বলে উঠল গনেরিল।
আলবেনি চিৎকার করে বলে উঠল, এডমন্ড, রাজদ্রোহিতার অপরাধে আমি বন্দি করলাম তোমায়— সেই সাথে তোমার প্রতি অনুরক্ত আমার ভণ্ড কুটিল স্ত্রীকে গ্রেফতার করলাম। আর এডমন্ড, তুমিও তো সশস্ত্র। আমি তিনবার ঢাক বাজাবার সাথে সাথে একজন লোক এসে তোমার এই রাজদ্রোহিতা আর বিশ্বাসঘাতকতার প্রমাণ দেবে।
খাপ থেকে তলোয়ার বের করে বলল এডমন্ড, সেই অভিযোগকারী লোকটি একটি শয়তান। সাহসের সাথে আমিও দ্বন্দ্ব যুদ্ধে আহ্বান জানাচ্ছি তাকে।
আলবেনি বলল, কিন্তু এডমন্ড, তোমার নিজস্ব সৈন্যেরা আমার অনুগত। কাজেই এখন থেকে নিজস্ব শক্তিই তোমার একমাত্র ভরসা।
এ সময় রিগান হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়ল। আলবেনি ভৃত্যদের আদেশ দিল ওরা যেন তাকে তার তাঁবুতে নিয়ে যান।
এদিকে আলবেনির আনা অভিযোগ প্রমাণ করতে নেপথ্যে ঢাক বাজাতে লাগল। ভূত্যেরা। তৃতীয় বার ঢাক বাজার সাথে সাথে সশস্ত্র অবস্থায় প্রবেশ করল এডগার।
রক্ষী, এর আগমনের উদ্দেশ্য কী? জানতে চাইল আলবেনি।
শয়তানের ষড়যন্ত্র যদিও আমার নির্দিষ্ট পরিচয় নষ্ট হয়ে গেছে, তবুও জেনে রাখুন, আমিও উঁচুবংশের লোক, বলল ছদ্মবেশী এডগার।
ছদ্মবেশী এডগারকে প্রশ্ন করল আলবেনি, আপনার প্রতিপক্ষ কে?
আর্ল অফ গ্লস্টার এডমন্ডের প্রতিনিধি কে? জানতে চাইল ছদ্মবেশী এডগার।
আমিই স্বয়ং এডমন্ড, আর্ল অফ গ্লস্টার। বল, কী জানতে চাও তুমি? এডগারের সামনে এগিয়ে এল এডমন্ড।
তাহলে যুবক, তলোয়ার নিয়ে আত্মরক্ষার জন্য প্রস্তুত হও। আপনার অনেক গুণ থাকা সত্ত্বেও আমি জোর গলায় বলছি আপনি বিশ্বাসঘাতক। আপনি একথা অস্বীকার করলে আমার হাতের তলোয়ারই তার যোগ্য জবাব দেবে, বলল, এডগার।
ছদ্মবেশী এডগারকে বলল এডমন্ড, তোমার চেহারা আর কথাবার্তায় ভদ্রবংশের বলে মনে হলেও তোমার ঘৃণ্য ভাষণের জন্য আমার ইচ্ছে করছে এই মুহূর্তে তলোয়ার দিয়ে তোমায় হত্যা করতে।
তলোয়ার নিয়ে দু-জনের মাঝে লড়াই শুরু হবার কিছুক্ষণ বাদেই প্রচণ্ড আহত হয়ে মাটিতে পড়ে গেল এডমন্ড। তা দেখে গনেরিল চিৎকার করে বলে উঠল, ওরে কে আছিস, বাঁচা ওকে।
গনেরিলকে জোর ধমক দিয়ে বলল আলবেনি, চুপ কর কুটিল নারী। তুমি আর এডমন্ড, উভয়েই শোন তোমাদের পাপের কথা। আর এডমন্ড, এই চিঠিটাই সাক্ষ্য দিচ্ছে তোমার ঘৃণ্য কাজের।
বেশ করেছি। ওটা আমার চিঠি। আমি যা খুশি তাই করতে পারি, বলল গনেরিল।
আলবেনি ভৃত্যদের ডেকে বললেন, তোমরা ওকে দেখো।
মুমূর্ষু এডমন্ড বলতে লাগল, স্বীকার করছি অনেক পাপ করেছি।আমি। ওহে যুবক, যদি তুমি উচ্চবংশীয় হওতাহলে আমাকে হত্যা করার পাপ থেকে আমি ক্ষমা করে দেব তোমায়।
তার প্রতিদানে আমি তোমায় ক্ষমা করব এডমন্ড। আমি তোমার বড়ো ভাই এডগার। ভগবানের কাছে মানুষকে তার পাপের শাস্তি এ জন্মেই পেতে হয়। হয়তো আমার বাবার সেরূপ কোনও কাজের জন্য নিজের চোখ হারিয়েছেন।
আলবেনি বলল, হে উচ্চবংশের সস্তান, তোমাকে আলিঙ্গন করা থেকে তুমি আমাকে বঞ্চিত কর না। তোমার বাবা এবং তুমি, উভয়েই আমার প্রিয়। এতদিন কোথায় ছিলে তুমি? তোমার বাবার এরূপ অবস্থার কথা কে জানোল তোমায়? উত্তরের আশায় আলবেনি উৎসুক ভাবে চেয়ে রইলেন এডগারের দিকে।
এডগার বলল, দিনের পর দিন আমি যখন মৃত্যুভয়ে মৃত্যুর চেয়ে বেশি যন্ত্রণা ভোগ করছি, ঠিক সে সময় আমার দেখা হল বাবার সাথে। তখন দেখলাম তার দু-চোখ রক্তে ভেসে যাচ্ছে। পাগলের ভান করে আমি তাকে পথ দেখিয়ে নিয়ে চললাম। পরে আমার পরিচয়ও তাকে দিলাম। কিন্তু এত দুঃখ-কষ্ট-বেদনার ভার সইতে না পেরে তিনি মারা গেলেন।
আলবেনি বলল, আপনার এই দুঃখ আমায়ও বিচলিত করেছে।
এডগার বলল, এত অল্পেই আপনি বিচলিত হবেন না মহামান্য ডিউক। যারা নির্বোধি তারাই শুধু অল্পে কাতর হয়। আমি যখন পলাতক আসামীর মতো পালিয়ে বেড়াচ্ছিলাম, তখন একজন লোক সহানুভূতির সাথে আমার সব কথা শুনে জড়িয়ে ধরেন আমার বাবাকে। তিনিই আমায় আশা জুগিয়েছেন। এরপর এক এক করে রাজা লিয়ার আর তার দুঃখের কাহিনি বলে যেতে লাগল এডগার।
