হ্যাঁ ম্যাডাম, উত্তর দিলেন ডাক্তার। উনি এখনও অসুস্থ। আপনি থাকুন ওর কাছে।
কর্ডেলিয়া মনে মনে বলতে লাগল, হে আমার প্রিয় পিতা, আমার এই চুম্বন যেন সারিয়ে তোলে আপনার দুরারোগ্য ব্যাধিকে। তারপর রাজাকে দেখেই বলে উঠল, হায় পিতা, রাজা হয়েও আপনি কীভাবে এই বাজে লোকদের সাথে শুয়োরের খোয়াড়ে শুয়ে আছেন? এইতো, জেগে উঠেছেন উনি।
ডাক্তার বললেন, আপনি তাড়াতাড়ি কথা বলুন।
ব্যগ্র কণ্ঠে বলল কর্ডেলিয়া, আপনি কেমন আছেন মহারাজ?
তুমি এক স্বর্গীয় আত্মা, কিন্তু আমি কাঁদছি, পুড়ে যাচ্ছি নরকের আগুনে–চিৎকার করে বলে উঠলেন। লিয়ার।
কর্ডেলিয়া বলল, আপনি আমায় চিনতে পারছেন না বাবা? ডাক্তার! উনি যে এখনও উন্মাদ।
চিৎকার করে বলতে লাগলেন লিয়ার, এখন আমি কোথায়? সবাই ঠকিয়েছে আমায়, জানি না। আমি কী বলব। এ হাত তো আমার নয়! না, না, এই তো আঘাতের বেদনা অনুভব করছি হাতে। আমার মতো এরূপ অবস্থায় কেউ যেন না পড়ে।
করুণ স্বরে বলল কর্ডেলিয়া, বাবা, আমার দিকে চেয়ে আশীৰ্বাদ করুন আমায়।
লিয়ার বললেন, তুমি কি আমার সাথে পরিহাস করছ? আমি এক নির্বোধ মেহদুর্বল আশি বছরের বুড়ো। কিন্তু তোমায় যেন কোথাও দেখেছি বলে মনে হচ্ছে। গতরাতে আমি কোথায় ছিলাম আর আজই বা কোথায়। বুদ্ধি-সুদ্ধি বলে কিছু নেই আমার। দয়া করি আমায়, পরিহাস করে আমার অস্তরে ব্যথা দিও না। তুমি কি আমার মেয়ে কর্ডেলিয়া? তুমি আর কেঁদো না মা। বিনাদোষে তোমার বোন আমার উপর অন্যায়-অত্যাচার করেছে। বিষ খেয়ে মরব আমি। আচ্ছা! মা, আমি কি ফ্রান্সে রয়েছি?
বাবাকে সাস্তুনা দিয়ে বলল কর্ডেলিয়া, না বাবা, এ আপনারই রাজ্য।
ডাক্তার বলল, পাগলামির জন্য পূর্বের কোনও কথা ওর মনে নেই। আপনি একটু ধৈর্য ধরুন भJivठभ। w
কর্ডেলিয়ার দু-হাত ধরে বললেন লিয়ার, কর্ডেলিয়া, মা আমার, এই বুড়ো বাবার সব দোষ ভুলে গিয়ে ক্ষমা কর তাকে।
বাবা ও ডাক্তারকে নিয়ে কর্ডেলিয়া অন্য জায়গায় চলে যাবার পর কেন্ট বলল তার চাকরকে, তাহলে কর্নওয়ালের রাজ্য চালাচ্ছে প্রস্টারের ছেলে এডমন্ড, ডিউকের সম্বন্ধে যা গুজব রটেছে তা সত্যি। কিন্তু গ্লস্টারের নির্বাসিত ছেলে কি জার্মানিতে রয়েছে?
আগে থাকতেই কিছু বলা যাচ্ছে না, সৈনাদল দ্রুত এগিয়ে আসছে। আজকের যুদ্ধে জয়পরাজয়ের উপরই নির্ভর করছে আমাদের পরিকল্পনার সফলতা, বলল এডমন্ড।তারপর একজন অফিসারকে ডেকে সে বলল, যাও, তুমি গিয়ে জেনে এস অস্থিরচিত্ত ডিউকের শেষ সিদ্ধান্তটা।
অফিসার চলে যাবার পর রিগান বলল, ওগো আমার প্রিয় এডমন্ড! তুমি সত্যি করে বলতো আমার বোনকে ভালোবাস কিনা?
চালাক এডমন্ড সাথে সাথেই বলে উঠল, না ম্যাডাম, কথাটা মোটেও সত্যি নয়।
তার সাথে তোমার ঘনিষ্ঠ হওয়াটা আমি কিছুতেই সহ্য করব না, বলল রিগান।
মনে মনে মতলব ভাজতে লাগল। গনেরিল, বোনের সাথে এডমন্ডের বিয়ে হলে আমার পক্ষে তা হবে যুদ্ধে পরাজয়ের সামিল।
এ সময় ঘরে ঢুকে বলল আলবেনি, সুপ্ৰভাত। আমাদের দ্বারা বিতাড়িত হয়ে রাজা এখন তৃতীয় মেয়ের আশ্রয়ে। সততার অভাবেই আমরা ভালোভাবে যুদ্ধ করতে পারছি না। ফ্রান্সের বিরুদ্ধে।
ব্যঙ্গ করে বলল রিগান, এটা কি কোনও যুক্তির কথা?
এডমন্ড বলল, আসুন মহামান্য আলবেনি, তাবুতে গিয়ে আমরা এ বিষয়ে আলোচনা করি।
কেন? জানতে চাইলেন আলবেনি।
বিশেষ প্রয়োজন আছে। চল আমাদের সাথে, বলল রিগান।
কিছুক্ষণ ভেবে বলল আলবেনি, বেশ, চল।
ছদ্মবেশী এডগার ঘরে ঢুকে বলল আলবেনিকে, আমার মত গরিবের কথা শোনার ইচ্ছে কি আপনার আছে?
আলবেনি আর এডগারকে রেখে দিয়ে চলে গেল ওরা সবাই। তখন এডগার বলল, যুদ্ধে নামার আগে আপনি পড়ে দেখুন। এ চিঠিটা। বাইরের এই নোংরা পোশাক সত্ত্বেও আমি জানি কীভাবে সম্মান রক্ষা করতে হয়। আমি বলছি আপনাকে, এক গভীর ষড়যন্ত্র চলছে আপনার বিরুদ্ধে। এখন আমি বিদায় নিচ্ছি। সময় হলে আবার আসব আমি।
এডগার চলে যেতেই আবার এল এডমন্ড, সে ডিউককে বলল, আমাদের শত্রু সৈন্যরা এখনও দুর্বল। তাড়াতাড়ি চলুন যাতে সৈন্যদের একজোট করতে পারি–বলেই তাড়া দিতে লাগল। ডিউককে। আলবেনি চলে যাবার পর মনে মনে একবার তার প্ল্যানটাকে ঝালিয়ে নিল এডমন্ড। ওদের দু-বোনের সাথেই আমি ভালোবাসার অভিনয় করব কিন্তু বিয়ে কাউকে করব না। ওদের আর আমার বাবার সমস্ত সম্পত্তি দখল করতে হলে আমার প্রয়োজন ওদের সমর্থন আর সহযোগিতা। আমি ছেড়ে দেব না লিয়ার আর কর্ডেলিয়ার সাহায্যকারী আলবেনিকে। আর ওরা দু-বোন নিজেদের মধ্যে হিংসার ফলেই মারা যাবে। চালাকি করে এখন থেকে আমি ঝগড়া এড়িয়ে চলব।
বাবা, এই গাছের তলায় বসে আপনি কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিন, বলেই চলে গেল এডগার। আবার কিছুক্ষণ বাদেই ফিরে এল সে। ኦ
আমার হাত ধরে তাড়াতাড়ি আসুন, আমার সাথে; পরাজিত হয়ে রাজা লিয়ার বন্দি হয়েছেন তার মেয়ের সাথে, বলল। এডগার।
কান্নায় ভেঙে পড়ে গ্লস্টার বলল, না, আমি আর বঁচিতে চাই না। কিন্তু মৃত্যু তো মানুষের ইচ্ছাধীন নয়।
চিৎকার করে এডমন্ড তাঁর ভৃত্যদের হুকুম দিল বিচার না হওয়া পর্যন্ত তারা যেন লিয়ার আর কর্ডেলিয়াকে রেখে দেয়।
না কর্ডেলিয়া, ওদের ডেক না, বললেন লিয়ার, তার চেয়ে আমরা বরং কারাগারে গিয়ে সেই সব রাজাদের সমব্যাখী হই যারা ষড়যন্ত্রের শিকার। আমার চোখের জলে অচিরেই ধ্বংস হয়ে যাবে ওদের সাম্রাজ্য আর গর্ব। চল, আমরা কারাগারে যাই।
