উঃ কী ভয়ংকর দৃশ্য! দেখে মনে হচ্ছে উনিই রাজা লিয়ার, যন্ত্রণায় কেঁপে উঠে বলল এডগার।
লিয়ার বলতে লাগলেন, চেয়ে দেখা ওই লোকটার দিকে। মনে হচ্ছে ও যেন মাঠে কাক তাড়াচ্ছে। দেখ দেখা ঐ একটা ইদুর। আমি দৈত্যের উপর পরীক্ষা করব। এই সেকা রুটিটা দিয়ে। বাদামি রং-এর টাঙ্গি আর বর্শাটা নিয়ে এস, তিরটা অব্যর্থভাবে লেগেছে ওর বুকে।
এর গলার আওয়াজ শুনে তো রাজা বলেই মনে হচ্ছে–বলল গ্লস্টার।
ঠিকই বলেছেন, আমিই রাজা। ঐ তুষারের মত সাদা মেয়েটাকে দেখুন। ওর নারীত্বের আবরণে ঢাকা রয়েছে নরকের ঘন অন্ধকার, সৰ্ব্বনাশী আগুনের জুলন্ত শিখা সবকিছুকে পুড়িয়ে দিয়ে ছাই করে দেয়। শতাধিক সে মেয়েকে। হে রাজবৈদ্য, আমার দূষিত কল্পনাকে হঠিয়ে দিতে একফোঁটা সুগন্ধী দাও আমাকে, বললেন লিয়ার।
গ্লস্টার বলল, সত্যিই আশ্চর্য, নিয়তির হাতে নিগৃহীত আপনার মতো একজন মহান ব্যক্তি আমাকে চেনেন।
তোমার চোখের ওই চাউনিকে আমি ভালো করেই চিনি, বললেন। লিয়ার, কিন্তু আমি কিছুতেই ভালোবাসব না তোমায়। উঃ তুমিও কি নিঃস্ব ও দৃষ্টিহীন আমারই মতো। তাহলে কীভাবে তুমি বুঝতে পারছি পৃথিবীর গতি কোন দিকে।
মনে মনে বলল। এডগার, স্বচক্ষে না দেখলে মর্মান্তিক অবিশ্বাস্য বলে মনে হত এ দৃশ্যকে।
লিয়ার বললেন, তুমিই বল কে পাগল আর কে চোর। আমি তোমায় বলছি বন্ধু, জমকালো পোশাকের আড়ালে যে পাপ সহজেই লুকিয়ে আছে,মিথ্যেবাদী রাজনীতিকের নকল চোখে তাকাবার ভান করলে তা সব কিছুই দেখতে পাবে তুমি। এবার সুতো খুলে দাও, বডড লাগছে পায়ে।
রাজার কথা শুনে অবাক হয়ে মনে মনে ভাবল এডগার, আশ্চর্য, রাজার কথার এই আঘাতউন্মত্ততার মাঝেও রয়েছে একটা খুশির ভাব।
লিয়ার বললেন, গ্লস্টার, তুমি যদি সমবেদনা দেখাতে চাও, তাহলে চোখটাকে ধার করতে হবে তোমায়। আমি তোমায় চিনি, অধৈর্য হয়ে না তুমি, কারণ চোখের জল ফেলাটা আমাদের উভয়ের জীবনের নিয়তি। পরে আমি তোমায় সব বুঝিয়ে বলব।
উঃ মানুষের কী ভয়ংকর পরিণতি, বলল গ্লস্টার।
লিয়ার বলতে লাগলেন, আমরা বোকার মতে কাঁদি যখন এ পৃথিবীতে প্রথম আসি। মাথার টুপি অশ্বারোহী সৈনিকের ঘোড়ার পায়ের নিচে পড়িয়ে পরীক্ষা করব আমি। চুপি চুপি একবার জামাইয়ের কাছে পৌছতে পারলেই একবারে মেরে ফেলবে তাকে।
আমি এখন অসহায়। যাবে আমৃত্যুর সাথে? একজন ডাক্তারকে দিয়ে মাথার চিকিৎসা করব। সেখানে তোমরা কেউ যাবে না, শুধু আমি একা থাকব। কিন্তু না, শোন তোমরা, রাজার মতো বীরত্বের সাথে যুদ্ধ করব আমি। এত সহজ নয়। আমাকে ধরা, আমি ছুটব— বলেই ছুটতে শুরু করলেন রাজা লিয়ার। রাজাকে ধরার জন্য তার অনুচররাও পেছু পেছু ছুটতে লাগল।
একজন অনুচর বলল, রাজার এ অবস্থা আর চোখে দেখা যায় না।
কেন্ট বললেন তাকে, ওহে, আসন্ন যুদ্ধের কোনও খবর রাখা তুমি? কতদূর এগিয়ে এসেছে শক্ৰ সৈন্যেরা?
অনুচর উত্তর দিলে, খুব দ্রুত এগিয়ে আসছে তারা। আর আধঘণ্টার মধ্যেই এখানে এসে পড়বে প্রধান সৈন্যদল। রানি বিশেষ কারণে রয়ে গেছেন। কিন্তু সৈন্যরা চলে গেছে।
গ্লস্টার বলল, আমার আর বাঁচতে ইচ্ছে করে না। বল যুবক, কে তুমি?
জীবনের ঘাত-প্রতিঘাতে বিপর্যস্ত এক যুবক আমি, যে ভালোবাসি মানুষকে সহানুভূতি দেখাতে–বলল। এডগার। তারপর যত্নের সাথে গ্লস্টারের শীর্ণ হাত ধরে সে বেরিয়ে গেল নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে।
দূর থেকে গ্লস্টারকে আসতে দেখে মনে মনে খুব খুশি হল অসওয়াল্ড। সে গ্লস্টারকে বলল, ওঃ কী ভাগ্যবান আমি। ওহে বুড়ো, এবার এই তলোয়ারের আঘাতেই মারা যাবে তুমি, বলেই তলোয়ার বের করল সে।
অসওয়াল্ডকে বাধা দিয়ে বলল, খবরদার বলছি, এই হতভাগ্য বুড়োটার কাছে এস না। তোমরা সরে যাও, যেতে দাও একে। নইলে তোমার জীবন বিপন্ন হবে এই লাঠির ঘায়ে।
দূর হয়ে যা ঘৃণ্য চাষি, বলল অসওয়ান্ড।
তবে রে হতচ্ছাড়া পাজি! দেখাচ্ছি। তোকে মজা, বলেই লাঠি তুলল এডগার।
এরপর শুরু হয়ে গেল দু-জনের লড়াই। কিছুক্ষণ বাদেই এডগারের লাঠির আঘাতে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল আসওয়ান্ড। তার পকেট হাতড়িয়ে পাওয়া গেল একটা চিঠি, যাতে লেখা আছে—
আমাদের একে অন্যকে দেওয়া প্রতিশ্রুতির কথা মনে রেখে যত শীঘ্র সম্ভব মেরে ফেল তাকে। আর আমাকে অন্যের শয্যাসঙ্গিনী না করে দয়া করে যত তাড়াতাড়ি পার তোমার শয্যাসঙ্গিনী করে নাও।
ইতি–তোমার প্ৰিয়তমা স্ত্রী গনেরিল।
গ্লস্টার বলল, হে ঈশ্বর, এই দুঃখ-কষ্ট থেকে আমাকে বাঁচাবার জন্য পৃথিবীটাকে অসংলগ্ন করে পাগল করে দাও আমায়।
দূর থেকে রণদামামার আওয়াজ কানে আসতেই চঞ্চল হয়ে উঠল এডগার, আপনি তাড়াতাড়ি হাত ধরুন আমার। আমি আপনাকে নিয়ে যাব আমার বন্ধুর নিরাপদ আশ্রয়ে।
হে মহানুভব কেন্ট! আপনার ঋণ আমি জীবনেও শোধ করতে পারব না, বিনয়ের সাথে বলল কর্ডেলিয়া, আপনার ওই ছেড়া পোশাক ফেলে দিয়ে নূতন পোশাক পরুন।
কেন্ট বলল, আপনি আমায় ক্ষমা করবেন। ম্যাডাম। আমার উদ্দেশ্য সাধনের জন্য প্রয়োজন আছে। এ ছদ্মবেশের। অনুগ্রহ করে আমার পরিচয় প্রকাশ করবেন না।
বেশ, করব না, বলে ডাক্তারকে জিজ্ঞেস করলেন কর্ডেলিয়া, এখন কেমন আছেন রাজা?
ডাক্তার বললেন, তিনি ঘুমোচ্ছেন।
হে ঈশ্বর, সস্তানের দ্বারা প্ৰপীড়িত ওর আত্মাকে শান্তি দাও। আচ্ছা, ওকে কি নতুন পোশাক পরানো হয়েছে? জানতে চাইলেন কর্ডেলিয়া।
