এমন সময় একজন দূত এসে প্রবেশ করল। আলবেনি জিজ্ঞেস করলেন, কী খবর দূত?
দূত বলল, হুজুর গ্লস্টারের চোখ তুলে নেবার সময় সে যে আঘাত পায় তাতেই তার মৃত্যু হয়েছে। এক ভূত্য সে সময় তাকে বাধা দিলে তিনি রেগে গিয়ে তাকে হত্যা করেন। কিন্তু মৃত্যুর আগে ওই ভূত্যের তলোয়ারের আঘাতে তার বুকে ওই ক্ষতের সৃষ্টি হয়েছে।
গনেরিল বলল, পাপের পরিণতি হয় তার শাস্তিতে। আচ্ছা, গ্লস্টারের কি দু-চোখই নষ্ট হয়ে গেছে?
হ্যাঁ, উত্তর দিল দূত, আপনার বোনের একটা চিঠি আছে। তাড়াতাড়ি তার উত্তর দিতে হবে।
চিঠিটা নিয়ে মনে মনে ভাবল গনেরিল, এর উত্তর তো তৈরিই আছে। ঠিক আছে, এর উত্তর দিচ্ছি। আমি—বলে চলে গেল। গনেরিল।
গনেরিল চলে যাবার পর আলবেনি জিজ্ঞেস করল দূতকে, বলতে পোর, যখন গ্লস্টারের চোখ তোলা হচ্ছিল, তখন কোথায় ছিল এডমন্ড?
দূত বলল, ইচ্ছে করেই তিনি সে সময় বাড়ি ছিলেন না। বাবার পরিকল্পনার কথা তিনিই তো ফাস করে দিয়েছেন। ডিউককে।
আলবেনি বলল, তুমি ধন্য গ্লস্টার। তোমার প্রভুভক্তি সত্যিই দেখার মতো। আমি প্রতিজ্ঞা করছি তোমার উপর নিষ্ঠুর অত্যাচারের প্রতিশোধ আমি নেব্বই। এস বন্ধু, যা জানি আমায় নিৰ্ভয়ে বল। চলো, ভেতরে চল।
কেন্ট জিজ্ঞেস করল, বলতে পার কাউকে সেনাপতির পদ না দিয়েই কেন চলে গেলেন ফ্রান্সের রাজা?
বোধহয় বিশেষ প্রয়োজনেই তাকে চলে যেতে হয়েছে–বলল দূত।
কেন্ট জানতে চাইল, চিঠিটা পেয়ে রাজা কী করলেন?
বারবার তার চোখ জলে ভরে উঠছিল চিঠিটা পড়তে পড়তে। একটা বদ্ধ আবেগ যেন মোহিত করেছিল তার মনকে, বলল দূত।
কেন্ট বলল, উনি কি কিছু জিজ্ঞেস করেছিলেন তোমায়?
অন্তর মন্থন করে অতিকষ্টে তার মুখ থেকে বেরিয়ে আসছিল পিতা শব্দটি। একবার তিনি চিৎকার করে বলেছিলেন তোমরা মেয়ে জাতির কলঙ্ক — হায় সেই ঝড়ের রাতে–তারপরই হঠাৎ চুপ করে গেলেন তিনি–বলল দূত।
আমি আশ্চর্য হয়ে যাচ্ছি। এই ভেবে যে একই পিতার ঔরসে কীভাবে পরস্পরবিরোধী সস্তানের জন্ম হয়, বলল কেন্ট।
এ সময় একজন দূত এসে বলল যে ব্রিটিশ সেনাদল এদিকেই এগিয়ে আসছে।
আচ্ছা অসওয়াল্ড, আমার ভগ্নীপতির কি স্বয়ং যুদ্ধক্ষেত্রে সৈন্য পরিচালনা করবেন? জানতে চাইল রিগান।
হ্যাঁ, বলল অসওয়াল্ড, তবে সৈনিক হিসাবে আপনার বোন তার চেয়েও দক্ষ।
রিগান বলল, আচ্ছা অসওয়াল্ড, দিদির চিঠিতে কী লেখা ছিল? নিশ্চয়ই কোনও প্রয়োজনীয় কাজের জন্য তাকে ডাকা হয়েছে। তুমি এখানেই থাকবে। আগামীকাল থেকে শুরু হবে আমাদের অভিযান।
আমার পক্ষে তা সম্ভবপর নয়, উত্তর দিল অসওয়াল্ড।
কেন? কী এমন কথা আছে যা মুখে না বলে চিঠিতে লিখলেন দিদি? জানতে চাইল রিগান।
এডগার বলল, মহাশয়, আপনার নির্দেশমতোই আমরা হাঁটতে শুরু করেছি। খাড়া পাহাড়টার উপর দিয়ে।
কিন্তু আমার তো মনে হচ্ছে বনের উপর দিয়ে হাঁটছি। কোনও শব্দ শুনতে পাচ্ছি না।। তোমার গলার আওয়াজটা যেন আগের চেয়ে ভিন্ন মনে হচ্ছে, বলল গ্লস্টার।
এডগার বলল, চোখের দারুণ যন্ত্রণাই দুর্বল করে দিয়েছে আপনার ইন্দ্ৰিয়গুলিকে। আমার যা পরিবর্তন হয়েছে তা একমাত্র পোশাকে। পাহাড়ের খুব বিপদজনক জায়গায় এখন এসে পৌঁছেছি আমরা। ভাসমান জাহাজগুলিকে খুবই ছোটো দেখাচ্ছে এখান থেকে। মাথা ঘুরে যাবে নিচের দিকে তাকালে। এখান থেকে মাত্র একফুট দূরে শেষে কিনারা।
ঠিক আছে বন্ধু–বলল গ্লস্টার, এবার আমায় ছেড়ে দিয়ে এই মূল্যবান রত্নটাকে তুমি নাও। হে ঈশ্বর, তিলতিল করে ক্ষয়ে যাওয়া দুঃখের বোঝা কমানোর জন্য আমি স্বেচ্ছায় মৃত্যুবরণ করব। বিদায় এডগার! ভগবান তোমার মঙ্গল করুন। বলেই শূন্যে লাফিয়ে উঠলেন গ্লস্টার। তাই দেখে ভাবল এডগার, মানুষ কি এভাবেই নিজেকে শেষ করে। তারপর মিনিট খানেকের মধ্যেই তার কাছে গিয়ে বলল, ও মশাই! আপনি কি জীবিত না মৃত?
মরতে দাও আমাকে, চিৎকার করে বলল গ্লস্টার।
এডগার বলল, এত উঁচু থেকে পড়ে গিয়েও আপনি যখন অক্ষত রয়েছেন, তখনই বোঝা যায় আপনার শরীরটা শক্ত ধাতু দিয়ে গড়া।
ক্ষুন্ন মনে জানতে চাইল গ্লস্টার, সত্যি করে বল তো আমি কি সত্যিই পাহাড় থেকে নিচে লাফিয়ে পড়েছি? তারপর করুণায় ভেঙে পড়ে সে বলল, আমার আর মর্যা হল না। মৃত্যুও এখন ব্যঙ্গ করছে আমায় নিয়ে।
এডগার বলল, কী আশ্চর্যের ব্যাপার! কোনও ব্যথাই অনুভব করছেন না আপনি। বলুন তো, এই পাহাড়ের মাথায় কে নিয়ে এসেছে আপনাকে?
একটা ভিখারি। আমায় নিয়ে এসেছে। এখানে। কিন্তু কেন জানতে চাইছ তার কথা? বলল গ্লসটার।
এডগার উত্তর দিল, নিচে থেকে তাকে দেখে আমার মনে হল তার মুখে হাজারটা নাক আর অসংখ্য শিং। তার গায়ে সমুদ্র তরঙ্গের মতো অসংখ্য পাহাড়। আর মুখের মধ্যে বড়ো বড়ো দুটো চোখ। নিশ্চয়ই সে কোনও শয়তান?
হ্যাঁ, সে বারবার বলছিল বটে শয়তান। তবে আমি ভেবেছিলাম সে মানুষ। ওই আমায়। সে জায়গায় নিয়ে গিয়েছিল। এবার আমার সব কথা মনে পড়ছে। আনন্দের সাথে বলে ওঠে। গ্লস্টার।
এডগার বলল, হ্যাঁ, ভালো করে ভাবুন আপনি। এদিক পানে কে যেন আসছে? নিশ্চয়ই লোকটি অসুস্থ।
কেউ আর এখন টাকার লোভে বন্দি করতে আসবে না আমায়। কারণ এখন আমিই যে রাজা –মনে মনে ভাবতে লাগলেন রাজা লিয়ার।
