রিগান বলল কর্নওয়ালকে, নষ্ট করে দাও ওর চোখ দুটো।
গ্লস্টার বলে উঠল, কী নিষ্ঠুর তোমরা! অন্তত মানবিকতার খাতিরে এই বুড়োটাকে তোমরা রক্ষা কর।
গ্লস্টারের এই কাতর আবেদনে স্থির থাকতে না পেরে একজন ভৃত্য এসে বাধা দিল কর্নওয়ালকে। ভূত্যের এই দুঃসাহস দেখে রিগান তাকে মেরে ফেলল তলোয়ার দিয়ে। মৃত্যুর আগে সে ভৃত্য বলে গেল, হে আমার প্রভু, আমি মারা গেলাম। আপনি দেখবেন ঘৃণিত এই নারীর জীবনের পরিণাম।।
যাতে আর তা দেখতে না হয়, সে ব্যবস্থাই আমি করছি, বলেই তলোয়ার দিয়ে গ্লস্টারের দুচোখ অন্ধ করে দিল কর্নওয়াল। তারপর দূর করে তাড়িয়ে দিল তাকে।
চোখের যন্ত্রণায় চিৎকার করে উঠল গ্লস্টার, বলল, পুত্ৰ এডমন্ড, অন্যায়কারীদের তুমি উপযুক্ত শাস্তি দিও যখন তুমি শুনবে তোমার বাবার উপর এরূপ অত্যাচার হয়েছে।
গ্লস্টারের কথা শুনে হা হা করে হেসে উঠল দুজনে। তারপর ব্যঙ্গের সুরে বলল রিগান, তোমার বিশ্বাসঘাতকতার কথা এডমন্ড ফাস করে দিয়েছে আমাদের কাছে। তোমার মত অবিবেচক বিশ্বাসঘাতক সে নয় যে তোমায় দয়া করবে।
ও কি নির্বোধি আমি, বলল গ্লস্টার, এডমন্ডের কথায় বিশ্বাস করে আমি চরম অন্যায় করেছি এডগারের প্রতি। ঈশ্বর, তারা যেন মঙ্গল হয়।
চাকরকে ডেকে রিগান বলল, বের করে দাও এ লোকটাকে। তারপর বলল কর্নওয়ালকে, আঘাতটায় কি খুব যন্ত্রণা হচ্ছে?
হাঁ প্রিয়তমা, বলুল কর্নওয়াল, অসতর্কমুহূর্তে আমায় আঘাত করেছে তৃত্যটা। চল, ভেতরে যাই।
ওরা চলে যাবার পর দ্বিতীয় এবং তৃতীয় ভৃত্য স্থির করল তারা রাজার কাছে এখানেই থেকে যাবে। তাদের মধ্যে একজন চলে গেল গ্লস্টারের আহত চোখে লাগাবার জন্য প্রলেপের খোঁজে। অন্যজন বলল, চল, বুড়ো আর্লকে অনুসরণ করে আমরাও যাই এডগারের খোঁজে। ঈশ্বর যেন তাকে ভালো রাখেন।
কোনও কাজে ব্যর্থ হলেও মানুষ সর্বদা একটা-না-একটা আশার দ্বারা পরিচালিত হয়। কিন্তু সবচেয়ে শোচনীয় ব্যাপার সৌভাগ্য থেকে দূর্ভাগ্যের কবলে পড়াটা। এখন যিনি দুর্ভাগ্যের কবলে পড়েছেন। অথচ ভবিষ্যৎ সুখের আশায় সে দুঃখকে অম্লান বদনে মেনে নিয়েছেন, সেরূপ লোকদের মধ্যে আমিও একজন-– মনে মনে নিজেকে এরূপ ভেবে নিল এডগার। একজন বুড়ো লোকের সাহায্যে বাবাকে আসতে দেখে এডগার বলল, কী আশ্চর্য! আমার বাবা আসছেন এক বুড়ো লোককে অবলম্বন করে!
বুড়ো লোকটি গ্লস্টারকে উদ্দেশ করে বলল, হুজুর, আশি বছর ধরে আমি আপনার অধীনস্থ একজন প্ৰজা!
গ্লস্টার বলল, ঈশ্বর তোমার কল্যাণ করুন। তুমি চলে যাও, নইলে বিপদ হতে পারে তোমার। আমার সামনে এখন শুধুই অন্ধকার। পথ চলার জন্য কোনও সাখীর প্রয়োজন নেই আমার। হে প্রিয় এডগার, ভুলবশত যে অন্যায় আমি তোমার উপর করেছি, তার জন্য আজ ক্ষত-বিক্ষত আমার হৃদয়। এই অন্ধত্ব দশা থেকে আমার মুক্তি হবে। যদি কখনও তোমার স্পর্শ পাই।
পিতার এই শোচনীয় অবস্থা থেকে এডগার মনে মনে ভাবতে লাগল এর চেয়ে খারাপ আর কিছুই হতে পারে না।
এডগারকে দেখে বৃদ্ধ বলল, ওহে যুবক, কোথায় যাচ্ছ তুমি?
গ্লস্টার বলল, কে উনি? উনি কি একজন ভিক্ষুক? মনে হয় না ও পুরোপুরি পাগল। গত রাতে ঝড়ে বিপর্যস্ত একটা লোককে দেখে আমার মনে পড়ে গিয়েছিল ছেলের কথা। কিন্তু সে সময় নিবুদ্ধিতাবশত আমায় আচ্ছন্ন করে রেখেছিল বিজাতীয় ক্ৰোধ। তাই মনে হয়েছিল মানুষ সামান্য কীটমাত্র। আজ বেশ বুঝতে পারছি মানুষ কত অসহায়— ঈশ্বরের হাতে ক্রীড়ানক মাত্র। আমায় বল, লোকটির কি নগ্নদেহ?
হ্যাঁ প্রভু, বলল বৃদ্ধ।
গ্লস্টার বলল, তাহলে এখনি গিয়ে তার জন্য কিছু পোশাক নিয়ে এস। এখন সেই হবে। অন্ধের যষ্টি স্বরূপ।
কিন্তু প্ৰভু, উনি তো সম্পূর্ণ পাগল, বলল বৃদ্ধ।
তা হোক বলল গ্রেস্টার, আমি যা বললাম। তাই করো। শীঘ্ৰ চলে যাও। বৃদ্ধ লোকটি চলে গেল। বাবার দুঃখে এডগার এত কাতর হয়ে পড়েছে যে তার কথা বলার শক্তি নেই। কিন্তু অন্ধ গ্লস্টার চিনতে পারেনি তাকে। তিনি বললেন, যুবক, তুমি বলতে পারডোভারের পথ কোন দিকে?
ওদিকে হতভাগ্যটমের বুকে তখন অনবরত নাচছে পাঁচ শয়তানী— ওবিডিকাঠ, হবিডিডাম্প, মৃদু, মোদো আর বিকারটি গিরোট। সুতরাং অর্থহীন তার কথা। তবুও সে বলল, ঈশ্বর আপনাদের মঙ্গল করুন। আমি জানি ডোভারের পথ।
উৎসুক হয়ে তাকিয়ে গ্লস্টার বলল, হে প্রিয় বন্ধু, এই নাও টাকা। দুঃখময় জীবনে অন্তত কিছুটা শান্তি ভোগ কর। জীবনে যাদের কাছে সুখটাই বড়ো, তোমার দুঃখ তাদের কাছে সৃষ্টি করবে। ঘৃণা। তুমি সুস্থ হও।
আলবেনিকে জিজ্ঞেস করলেন গনেরিল, তোমার প্রভু কোথায়?
উত্তর দিল আলবেনি, তিনি খুবই পালটে গেছেন ম্যাডাম। তিনি বিশ্বাসই করলেন না ফরাসি সৈন্যের আগমন-বার্তা আর গ্লস্টারের বিশ্বাসঘাতকতার কথা। উল্টে ভাবলেন যে আমিই মিথ্যেবাদী।
এ কথা শুনে গর্জে উঠে গনেরিল বলল, একমাত্র তোমার মতো নির্বোধ, দুর্বল, কাপুরুষরাই পারে দেশদ্রোহিতার বিরুদ্ধে যুদ্ধ না করে থাকতে।
আলবেনি বলল, তুমি এক অকৃতজ্ঞ দুনীতিপরায়ণ নারী। এখনও সময় আছে পাপবোধ সম্পর্কে তোমার সচেতন হবার। এখনও বলছি আমি, নিজেকে ধ্বংস করার আগে তাকে ধ্বংস কর, নইলে অচিরেই শেষ হয়ে যাবে তুমি।
