লিয়ার বললেন, আমি সামনাসামনি বিচার করব তাদের। ওহে যুবক আর বিদূষক, তোমরা দুজনেই বস এক জায়গায়, আর অকৃতজ্ঞের দল, আমি বিচার করব তোমাদের।
এডগার বলল, আবার নাইটিংগেলের পাখির সুরে গান গাইছে জঘন্য শয়তানটা। ওহে শয়তান, তুমি চুপ কর। এখন আমার কাছে কোনও খাবার নেই।
ওহে যুবক, তুমি আর তোমার সঙ্গী এই বেঞ্চের উপর বাস বিচারক হিসাবে— তারপর কেন্টের দিকে তাকিয়ে বললেন লিয়ার, আচ্ছা, তুমিও বস এদের সাথে। আমি দেখব বিচার করে। আগে গনেরিলের বিচার হবে। সে তার বৃদ্ধ পিতাকে লাথি মেরে তাড়িয়ে দিয়েছে বাড়ি থেকে।
অদৃশ্য মহিলার উদ্দেশে বলল বিদূষক, তুমিই গনেরিল? আমি ভেবেছিলাম তুমি এক নোংরা। আবর্জনা। চিৎকার করে বলে উঠলেন। লিয়ার, এই নারীর মন যে কত ক্রুর তা ওর চোখ দেখলেই বোঝা যায়। তোমরা তাড়াতাড়ি অস্ত্ৰ নিয়ে এস। তোমরা এরূপ অবিশ্বস্ত যে তাকে পালিয়ে যেতে দিলে?
রাজা আজ ধৈর্য হারিয়ে ফেলেছেন, বাধা মানছে না কেন্টের চোখের জলও।
আচ্ছা, ট্রে, সুইটহার্ট আর ব্রাট, এই তিনটে কুকুরকি আমার দিকে তাকিয়ে ঘেউঘেউ করছে? জানতে চাইলেন। লিয়ার।
টম বলল, ভাববেন না, তাড়া করলেই তারা পালিয়ে যাবে।
আবার বললেন লিয়ার, তোমরা রিগানকে কেটে দেখ কী দিয়ে তার হৃদয়টা সৃষ্টি করেছেন প্রকৃতি। যাও, তোমরা আর চিৎকার করো না, আমি এবার বিশ্রাম নেব।
গ্লস্টার তাড়াতাড়ি এসে পৌছল। সেখানে। সে কেন্টকে বলল, বন্ধু, বাইরে যে ঘোড়ার গাড়িটা দাঁড়িয়ে আছে, তাতে মহারাজকে চাপিয়ে যত শীঘ্র সম্ভব তোমরা তাকে নিয়ে যাও ডোভারে আমার নিরাপদ আশ্রয়ে! আর আধঘণ্টা দেরি হলেই বিপন্ন হবে তার জীবন! আমাকে অনুসরণ করে তোমরা তাড়াতাড়ি পালিয়ে যাও নিরাপদ স্থানে।
হয়তো ওর আত্মা এই ঘুমের মাঝে বিশ্রাম পাচ্ছে, বলল কেন্ট; যাই হোক, তুমি এস বিদূষক। আমরা সাহায্য করব রাজাকে নিরাপদ স্থানে নিয়ে যেতে।
সবাই চলে যাবার পর কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল এডগার। মনে মনে সে ভাবল, হয়তো পৃথিবীর নিয়মই এই। মহান ব্যক্তির দুঃখ ভুলিয়ে দেয় তুচ্ছ ব্যক্তিগত দুঃখকে। দীর্ঘদিন সুখে থাকার পর হঠাৎ দুঃখ পেলে তা সহন করা কঠিন হয়ে পড়ে। আর দুঃখী লোকের পক্ষে দীর্ঘদিন দুঃখভরা জীবন কাটানোর কষ্টও প্রচুর। আমি আর আমাদের মহান রাজা, উভয়েই কষ্ট পাচ্ছি পিতা আর সস্তানের মাঝে ভুল বোঝাবুঝির দরুন না। টম, এসব নিয়ে তোমার আর ভাবার দরকার নেই। যখন দেখবে সবকিছু বাধা দূর হয়ে বাপ-ছেলের মিলন ঘটবে, ঠিক তখনই সবার সামনে আত্মপ্রকাশ করবে তুমি। ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করি, মহারাজ যেন নিরাপদে ডোভারে যেতে পারেন।
ফ্রান্সের সৈন্যরা যে এসে পড়েছে সে খবর দিদি তাড়াতাড়ি পাঠিয়েছিলেন আলবেনির কাছে। চাকরেরা চলে যাবার পর কর্নওয়াল বলল এডমন্ডকে, সেই বিশ্বাসঘাতক গ্লস্টারকে খুঁজে বের করে তার উপর প্রচণ্ড প্রতিশোধ নেব আমি। তার আগে এডমন্ড, তুমি গনেরিলের কাছে গিয়ে দ্রুত সব ব্যবস্থা কর।
এ সময় ছুটতে ছুটতে এসে বলল অসওয়াল্ড, প্ৰভু, আগে থেকেই ষড়যন্ত্র করে রাজা ও তার সামন্ত এবং অনুচরবর্গকে ডোভারে পাঠিয়ে দিয়েছেন লর্ড গ্লস্টার।
একথা শুনে তৎপর হয়ে উঠল কর্নওয়াল। সে বলল, আপনি তাড়াতাড়ি ঘোড়ায় চেপে চলে যান। আর আমার অনুচরবর্গ, তোমরা সবাই খুঁজে বের তাকে। কে? কে দাঁড়িয়ে ওখানে?
অনুচরসহ গ্লস্টারকে বন্দি অবস্থায় দেখে বেজায় খুশি হলেন কর্নওয়াল আর রিগান। এরপর সবাই পৈশাচিক আনন্দে চিৎকার করে বলে উঠল, অকৃতজ্ঞ শয়তান, তোরা বেঁধে ফেল ওর হাত দুটো।
তাদের আচরণে অবাক হয়ে বললেন গ্লস্টার, সে কি? আমিই আপনাদের আশ্রয় দিয়েছি আর আশ্রয়দাতাকে আপনারা এভাবে অপমান করছেন? মনে রাখবেন, আমি বিশ্বাসঘাতক নই। রিগান, তুমি এরূপ অন্যায়ভাবে আমার দাড়ি ছিড়ে না।
বুড়ো শয়তান, তুমি একটা পাজি বদমাশ বলল রিগান।
গ্লস্টার জ্বলে উঠল এ কথা শুনে। সে বলল, নিষ্ঠুর নারী, আমি তোমায় অভিশাপ দিচ্ছি অতিথির প্রতি এরূপ অন্যায় আচরণের জন্য। ভবিষ্যতে আমার এ দাড়ির প্রতিটি লোম চরম শাস্তি দেবে তোমায়। বল, কেন তোমরা এরূপভাবে অপমান করছ তোমাদের আশ্রয়দাতাকে?
কর্নওয়াল বলল, আমিও সে কথা বলতে চাই তোমায়। বল, কোথায় রেখেছি ফ্রান্সের রাজার চিঠিটা? কী ধরনের ষড়যন্ত্ৰ তুমি করেছ বিদেশিদের সাথে?
রিগান বলল, আর তাও বল এইসাথে যে উন্মাদ রাজা এখন কোথায়?
গ্লস্টার বলল, আমার কাছে যে চিঠিটা আছে তা বিরোধী পক্ষের নয়, ওটা এসেছে। একজন নিরপেক্ষ লোকের কাছ থেকে। আমি শুধু রাজাকে সাহায্য করেছি। ডোভারে পালিয়ে যেতে।
কর্নওয়াল বলল, কোন তুমি এ কাজ করেছ? আমরা যে তোমায় বারণ করেছিলাম। সে কথা কি তুমি ভুলে গেছ?
গ্লস্টার উত্তর দিল, না, ভুলিনি। তবে আজ আমি মরতে বসেছি। তাই কোনো ভয়ই আমায় বাধ্য করতে পারবে না। অন্যায় কাজ করতে।
রিগান জানতে চাইল, কেন তুমি রাজাকে ডোভারে পাঠিয়েছে?
গ্লস্টার বলল, তোমাদের হিংস্ৰ নখ আর দাঁতের আক্রমণ থেকে রক্ষা করতেই আমি পাঠিয়ে দিয়েছি তাকে। যে দুৰ্য্যোগপূর্ণ রাতে তোমরা তাকে বাড়ি থেকে তাড়িয়েছ, সে রাতে তোমাদের ধ্বংস করার জন্য দেবতাদের কাছে প্রার্থনা করেছিলেন তিনি। অথচ তার স্নেহময় অন্তর কামনা করছিল বৃষ্টিপাতের। আমি চাই যত শীঘ্ৰ হোক ঈশ্বরের অভিশাপ নেমে আসুক তোমাদের উপর, ধবংস হয়ে যাও তোমরা?
