রাজা লিয়ার জানতে চাইলেন, আচ্ছা, তুমি কি নিঃস্ব হয়ে পড়েছ সবকিছু মেয়েদের দান করে?
আমার কী আছে? বলল। টম, জলে-স্থলে, স্বপনে-জাগরণে, সবসময় একটা শয়তান আমায় তাড়া করে ফিরছে। যার পথ নির্দিষ্ট করা আছে বিপদের মধ্য দিয়ে, তার কীই বা থাকতে পারে? ঈশ্বরের দোহাই, ক্ষুধার্ত টমকে কিছু খেতে দাও। শয়তান অবিরাম জ্বালাতন করছে তাকে। হয়তো সেই শয়তানটা এখানেই থাকে।
লিয়ার বললেন, আচ্ছ টম, তোমার এ অবস্থা কে করেছে? তোমার মেয়েরা কি সবকিছু কেড়ে নিয়েছে?
না মহারাজ, এর মধ্যে আমি একটা কলঙ্কের ব্যাপার দেখছি, বলল বিদূষক।
লিয়ার বললেন, তাহলে আমি অভিশাপ দিচ্ছি, যথাসময়ে পতন হবে ওর মেয়েদের।
ছদ্মবেশী কেন্ট বলল, মহারাজ ওর কোনও মেয়ে নেই।। তুমি একটা মিথ্যেবাদী, চিৎকার করে বললেন লিয়ার, মেয়ে না থাকলে কখনো ওর এই অবস্থা হত? দেখছি না, আমার মেয়েরাও তো এভাবেই আমার রক্ত শোষণ করেছে।
বিদূষক বলল, এ অসহ্য পরিবেশকে মেনে নেওয়া আমার মতো নির্বোধের পক্ষে সম্ভব নয়।
ব্যগ্র কণ্ঠে রাজা জিজ্ঞেস করলেন টমকে, আগে কী করতে তুমি?
টম উত্তর দিল, আগে আমি খুব অহংকারী ছিলাম। কথায় কথায় মিথ্যে শপথ নিতাম। যৌবনের নানা খেলায় ব্যস্ত রাখতাম নিজেকে। নিজ উদ্দেশ্য সাধনের জন্য হীন কাজ করতেও পেছ-পা হতাম না। মদ খেতাম, জুয়ো খেলতাম প্রেম নিয়ে। অলসতা, লুব্ধতা, ধূর্তমি আর নানারূপ পাপ কাজে সিদ্ধহস্ত ছিলাম আমি। এসব কাজে আমি ছিলাম পশুরও উপরে। কিন্তু সাবধান, হৰ্মন বনের বাতাসের রূপ ধরে আসছে। ঐ শয়তান।
হে ভগবান, মানুষের কি কোনও দাম নেই? বললেন লিয়ার, এই গুহায় বাস করছি আমরা তিনটি দু-পেয়ে প্রাণী, অথচ কেউই স্বাভাবিক নই। তারপর হঠাৎ তিনি দু-হাতে নিজের জামাকাপড় ছিড়ে ফেলে অনাবৃত করতে লাগলেন দেহকে।
বিদূষক বলল, মহাশয়, এই শীতের রাতে গায়ের পোশাক খুলবেন না। ঐদিকে দেখুন, কে যেন মশাল হাতে এগিয়ে আসছে।
এডগার বলল, ও হচ্ছে শয়তান কিবাগিগিবেট। সন্ধ্যার পর মানুষের দুরবস্থার নকল করে সে নানাভাবে বিভ্রান্ত করে তাদের।
নেপথ্যে পায়ের আওয়াজ শুনে রাজা বললেন, কে ওখানে? কার গলা শোনা গেল পেছনে? কে তুমি? আগে তোমার নাম বল।
আমি সেই হতভাগ্য টম যার খাদ্য হল কোলাব্যাং, বিষাক্ত সাপ, টিকটিকি আর মরা কুকুর। আমার পানীয় হল শ্যাওলা পচা জল, সম্বল জামা-কাপড়, একটা ঘোড়া আর তলোয়ার। আমি সেই শয়তান যাকে অহরহ তাড়া করছে আর একটা শয়তান। নরক আর অন্ধকারের রাজাই আমার একমাত্র বন্ধু।
গ্লস্টার বলল, জানো, আমার ছেলেদের কাছে আজ। আমি একটা ঘৃণিত জীব মাত্র।
রাজা লিয়ার বললেন, আপনার কন্যাদের বারণ সত্ত্বেও আমি এসেছি আপনাকে নিয়ে যাব বলে। এর পরপরই তিনি বললেন, বজের উদ্দেশ্য কী? আচ্ছা!টম, তোমারই বা জ্ঞানের উদ্দেশ্য কি?
রাজার এরূপ অবস্থা দেখে দুঃখের সাথে কেন্ট বললেন, গ্লস্টারকে, স্যার, ওর মাথা পুরোপুরি খারাপ হয়ে গেছে।
গ্লস্টার বললেন, সেজন্য দায়ী ওর মেয়েরাই! জানো বন্ধু, এই কিছুদিন আগে আমার প্রিয় পুত্ৰও হত্যা করতে চেয়েছিল আমাকে। আমিও রাজার মতোই এক হতভাগ্য। তারপর লিয়ারকে উদ্দেশ করে বললেন, আজকের রাতটা খুবই দুর্যোগের। আমার কথাটা শুনুন মহারাজ।
লিয়ার বললেন, আমি ক্ষমা চাইছি তোমাদের কাছে। এস, সবাই ভেতরে যাই। ওহে যুবক, এস, বিশ্রাম করবে। আমাকেও তোমার সঙ্গী করে নাও।
গ্লস্টার বলল, চুপ, ধীরে ধীরে। তারপর ছদ্মবেশী কেন্টকে উদ্দেশ করে তিনি বললেন সে যেন সবাইকে ভেতরে নিয়ে যায়। সবাই যখন বাড়ির ভেতরে ঢুকছে, তখন টমর্যাপী ছদ্মবেশী এডগার বলে উঠল, ধিক ধিক, আমি টের পাচ্ছি এক ব্রিটিশ বীরের উপস্থিতি।
কর্নওয়াল বলল, তাহলে তো গ্লস্টারকে হত্যা করার চেষ্টা করে ঠিকই করেছে তোমার ভাই। এ বাড়ি ছেড়ে যাবার পূর্বে আমিও প্রতিশোধ নেব তার উপর।
এডমন্ড ছিল খুব চতুর। সে বলল, না। হুজুর, তা করবেন না। তাহলে সবাই আমায় অপবাদ দেবে পিতৃহত্যার। আমার ভাগটো সত্যিই খুব খারাপ। কারণ আমার বাবা চেষ্টা করছেন ফরাসিদের অনুকূল সুযোগ দেবার। আর এ চিঠিটাই তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ। ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করি, বাবা যেন এ কাজ থেকে বিরত হন। কিন্তু এ চিঠিটা যদি সত্যি হয় তাহলে….।
কর্নওয়াল বলল, সত্যি মিথ্যে যাই হোক না কেন, তোমার বাবাকে খুঁজে বের করে গ্রেপ্তার করতে পারলে তুমিই হবে আর্ল অফ গ্লস্টার।
কথাটা শুনে মনে মনে ভাবতে লাগল এডমন্ড, যদি সত্যিই এরকম হয়, তাহলে তো রাজার প্রতি–বাবার সাস্তুনা বাণীই দূর করে দেবে ডিউকের সন্দেহ আর সেই সাথে সফল হবে। আমার উদ্দেশ্য! হে ঈশ্বর, আমার উদেশ্য যেন সফল হয়।
গ্লস্টার কেন্টকে বলল, আপনি এখানে একটু অপেক্ষা করুন। আমি দেখছি অন্য আর কিছু করা যায় কিনা। গ্লস্টারের মহানুভবতায় মুগ্ধ হয়ে গেলেন কেন্ট। রাজার প্রতি তার এই মমতাময় আচরণের জন্য তিনি গ্লস্টারের মঙ্গল কামনার প্রার্থনা করলেন ঈশ্বরের কাছে।
এডগারকে দেখিয়ে বিদূষক প্রশ্ন করলেন লিয়ারকে, মহারাজ, এই লোকটি কে?
লিয়ার বললেন, উনি এক রাজা।
বিদূষক বলল, উহুঁ, ছেলেকে ভদ্র হতে দেখলে নিচু শ্রেণির মানুষও পাগল হয়ে যায়। উনি সত্যিই পাগল হয়ে গেছেন। যে কোনও ঠুনকে জিনিস এখন সহজেই ওর বিশ্বাস ভেঙে দিতে পারে।
