দূর থেকেই নাচ-গানের সুমধুর আওয়াজ ভেসে আসছিল পোর্সিয়ার কানে। পুরুষের পোশাক বদলিয়ে তিনি ও নেরিস উভয়ে নারীর বেশ ধারণ করেছেন। তাদের আসতে দেখেই এগিয়ে এসে অভ্যর্থনা জানাল লোরেঞ্জো ও জেসিকা। সবাইকে যথোচিত সম্ভাষণের পর পোর্সিয়া জানালেন কাছের ও দূরের কোন কোন মঠ ও গির্জায় তারা আন্তনিওর কল্যাণ কামনায় প্রার্থনা জানিয়েছেন।
এ সময় ব্যাসানিওর এক ভৃত্য স্টিফানো দ্রুতগামী ঘোড়ায় চড়ে ভেনিস থেকে এসে পৌঁছোল বোলমন্টে। সে জানাল খুব শীঘ্রই তার প্রভু আস্তানিওকে নিয়ে এসে পড়বেন।
দেখতে দেখতে আন্তনিও আর গ্রাসিয়ানোর সাথে এসে পড়লেন ব্যাসানিও। আন্তনিওকে মুক্ত করা সম্ভব হয়েছে জেনে খুবই আনন্দ প্রকাশ করলেন পোর্সিয়া। কিন্তু তার আচার-আচরণ, কথা-বার্তায় এমন কিছু প্রকাশ পেল না যাতে বোঝা যায়। এ সবের মূলে রয়েছেন তিনি।
পোর্সিয়া আন্তনিওকে নিজের প্রাসাদে অভ্যর্থনা জানাচ্ছেন এমন সময় তার কানে এল নেরিস ও গ্রাসিয়ানোর মধ্যে বিবাদের আওয়াজ। তিনি হেসে উঠে বললেন, কী ব্যাপার! তোমরা এরই মধ্যে ঝগড়া শুরু করে দিলে? আরে! বিয়ের পর এখনও যে তেরাত্তির পার হয়নি।
সাথে সাথে নেরিস বলে উঠল, এরূপ ব্যবহার করলে তেরাত্তির তো দূরের কথা, তিন মিনিটও শাস্তিতে থাকা সম্ভব নয়। আমার পক্ষে। বিয়ের সময় আমি ওকে একটা আংটি দিয়ে ছিলাম। উনি গির্জার সামনে দাঁড়িয়ে প্রতিজ্ঞা করেছিলেন বেঁচে থাকতে আংটিটাি কাউকে হস্তান্তর করবেন না। আর এখন উনি কিনা আংটিটিা কাকে বিলিয়ে দিয়ে নাচতে নাচতে হাজির হয়েছেন আমার সামনে। এমন কাণ্ড দেখলে বোবা পাথরও সরব হয়ে উঠবে।
গম্ভীর স্বরে বললেন পোর্সিয়া, এটা তুমি ঠিক কাজ করনি গ্রাসিয়ানো। হাজার হোক, এটা তোমার স্ত্রীর দেওয়া প্রথম উপহার। সেটা যদি তুমি কাউকে দিয়ে দাও। তাহলে….।
গ্রাসিয়ানো চেঁচিয়ে বলে উঠল, ঠাকুরানি! সে একটা কেরানিমাত্র। যে উকিলবাবু আন্তনিওর প্রাণরক্ষা করেছেন, সে তারই কেরানি — একটা বেঁটে মতো ছোকরা, দেখতে ঠিক নেরিসার মতো, দলিলের ব্যাপারে সে খুব খাটাখাটি করেছিল। তাই পুরস্কারস্বরূপ যখন সে আংটিটা চাইল, আমি আর না করতে পারলুম না।
পোর্সিয়া বললেন, উপকার ঠিকই করেছিল তাতে কোনও দ্বিমত নেই। তার জন্য অর্থ দিলেই পারতে। এভাবে স্ত্রীর আংটিটা তোমার দেওয়া উচিত হয়নি। আমিও তো বিয়ের সময় স্বামীকে একটা আংটি দিয়েছিলাম। আমি স্থির নিশ্চিত আংটিটা তিনি কখনও হাতছাড়া করবেন না।
এ সুযোগের অপেক্ষাতেই ছিলেন গ্রাসিয়ানো। সাথে সাথেই তিনি বলে ওঠেন, তাহলে শুনুন ঠাকুরানি। আপনার স্বামী তার আংটিটাি উকিলবাবুকে দেবার পরই কেরানি ছোকরাটি নাছোড়বান্দা হয়ে ওঠে আমার আংটিটি নেবার জন্য। আমিও ভেবে দেখলাম ব্যাসানিও যখন তার উপহারের আংটি বিলিয়ে দিতে পারে, তাহলে আমারই বা আপত্তি কীসে?
গ্রাসিয়ানোর কথা শুনে এমন ভাবে নিশচুপ হয়ে গেলেন পোর্সিয়া যেন তার মাথায় বাজ পড়েছে। ব্যাসানিও চুপচাপ দাঁড়িয়ে। অতি কষ্টে নিজেকে সামলিয়ে পোর্সিয়া বলে ওঠেন, স্বামী! এ কথা কি সত্যি? বিবৰ্ণ মুখে পোর্সিয়ার সামনে হাত বাড়িয়ে দিয়ে বললেন ব্যাসানিও, আংটিটা যখন হাতে নেই তখন তুমিই বিচার কর কথাটা সত্যি কিনা।
লজ্জায় ঘৃণায় এতটুকু হয়ে গেলেন পোর্সিয়া। বললেন, তোমাদের বিবেক এতটুকু বাধল না স্ত্রীদের সাথে এভাবে বিশ্বাসঘাতকতা করতে? তোমরা দু-বন্ধু উভয়েই সমান পাপে পাপী। নেহাত বিয়ে হয়ে গেছে। তাই ফেরাবার উপায় নেই। ব্যাসানিও-পোর্সিয়ার মধ্যে ভালোবাসার সম্পর্ক শুরু না হতেই শেষ হতে চলেছে।
ঝড়ের মতো এভাবে তিরস্কারের বন্যা বয়ে চলল। মাঝে ব্যাসানিও যদিওবা দু-একটা কথা বলার চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু স্রোতের মুখে তা খড়কুটোর মতো ভেসে গেল। পোর্সিয়ার স্থির বিশ্বাস ভেনিসে গিয়েই আংটিটা দিয়েছেন ব্যাসানিও উকিলকে আংটি দেবার কথা নিছক বানানো। এমন উকিল কি দেখা যায় যে নয়। হাজার ডুকাটি না নিয়ে সামান্য একটা আংটি পুরস্কার স্বরূপ নিয়ে গেল?
উকিলরা যে সচরাচর লোভী হয় তা সবার জানা। আর এ উকিল নিলোভ হলে স্ত্রীর উপহার শোনা মাত্রই সেটা আর নিত না। নির্লোভ ব্যক্তি কি এরূপ সৌজন্যহীন হতে পারে?
নিজেকে নিয়ে বড়োই বিব্রতবোধ করছিলেন আন্তনিও। এ সবের মূলে যে তিনিই, সে কথা ভেবে খুবই সঙ্কোচ হচ্ছিল তার। ব্যাসানিওর পক্ষ নিয়ে দু-একটা কথা বলতে গিয়েছিলেন আন্তনিও, কিন্তু তার কথায় কানই দিলেন না পোর্সিয়া। শুধু তাকে বললেন, বন্ধু আন্তনিও! আপনি ভাববেন। না যে স্বামীর প্রতি অবিশ্বাস হেতু আমি আপনাকে অশ্রদ্ধা করছি। আমার বাড়িতে আপনার সমাদরের কোনও অভাব হবে না। কিন্তু স্বামীর সঙ্গে আমার সম্পর্কের এখানেই ইতি। যে আমার আংটির অমর্যাদা করতে পারে, সে আমার ভালোবাসার কী মূল্য দেবো?
আন্তনিও বললেন, এখন আমি বুঝতে পারছি আপনার উপহারটা হাতছাড়া করা কোনওমতেই উচিত হয়নি ব্যাসানিওর। আগে বুঝতে পারলে কখনওই এ পরিস্থিতির মুখোমুখি হতাম না। কিন্তু ভদ্রলোকের ঋণ শোধ করার অন্য কোনও উপায় না দেখে বাধ্য হয়ে এ অন্যায় কাজ করতে হয়েছে আমাদের। দয়া করে এ কথাটা আপনি বিশ্বাস করুন।
