সাথে সাথে বললেন পোর্সিয়া, পুরুষ মানুষকে কোনও বিশ্বাস নেই। তবে আপনার কথা বিশ্বাস না করেও একটা আপসে আসতে রাজি আছি আমি।
আন্তনিও বললেন, একবার ব্যাসানিওর জন্য নিজেকে জামিন রেখেছিলাম। এবার জামিন রইল আমার আত্মা। ব্যাসানিও যদি পুনরায় অবিশ্বাসী হন, তাহলে অনস্তকালের জন্য আমি নরকে যেতে রাজি আছি।
এবার মনে মনে কিছুটা প্ৰসন্ন হলেন পোর্সিয়া। তিনি আঙুল থেকে একটি আংটি খুলে নিয়ে আন্তনিওকে বললেন, শুধু আপনার খাতিরে, আপনার সামনে এই দ্বিতীয় আংটিটা আমি আমার স্বামীর আঙুলে পরিয়ে দিচ্ছি। এটার ভাগ্যও যেন আগেরটার মতো না হয়ে পড়ে। তাহলে কিন্তু আমাদের মুখ-দেখাদেখি বন্ধ হয়ে যাবে।
আংটিটা দেখে অবাক হয়ে গেলে ব্যাসানিও। এটা তো সেই আগের আংটি যা তিনি গতকাল ভেনিসে দিয়ে এসেছেন উকিলবাবুকে। তিনি বুঝে উঠতে পারলেন না। কীভাবে এই অভাবনীয় ঘটনা ঘটল।
কর্ত্রীর দেখাদেখি নেরিসাও দ্বিতীয় একটি আংটি উপহার দিয়েছেন ব্যাসানিওকে এবং তিনিও অবাক হয়ে গেছেন। আংটিটা দেখে, কারণ এটাই তো সেই আংটি যা তিনি গতকাল দিয়ে এসেছেন মুহুরি ছোকরাকে।
এরপর শুধু প্রশ্ন আর প্রশ্ন। মাঝে মাঝে কিছু উত্তর। হাসি-আনন্দের মধ্য দিয়ে সমাধান হয়ে গেল সবকিছুর। বেলারিওর চিঠিতেই প্রমাণ হয়ে গেল যে পোর্সিয়া উকিল সেজে ভেনিসে গিয়ে। আন্তনিওর জীবন বঁচিয়েছেন। এমন গুণী স্ত্রীর জন্য গর্বের সীমা রইল না ব্যসানিওর।
এবার পোর্সিয়া শাইলকের দানপত্র তুলে দিলেন লোরেঞ্জোর হাতে। দানপত্র অনুযায়ী শাইলকের মৃত্যুর পর তার সমস্ত সম্পত্তির মালিক হবেন লোরেঞ্জো এবং জেসিকা। গদগদম্বরে বলে ওঠে লরেঞ্জে, ঠাকুরানি! আপনি ধন্য। যেখানেই আপনি যান না কেন, সেখানেই আপনার উপর অজস্র ধারায় বর্ষিত হবে ঈশ্বরের করুণা।
ঈশ্বরের করুণার আরও একটা প্রত্যক্ষ প্রমাণ দেখিয়ে এবার সবাইকে হতবাক করে দিলেন পোর্সিয়া। আন্তনিও হারিয়ে যাওয়া তিনখানি জাহাজ বাণিজ্য সম্ভারে পূর্ণ হয়ে হঠাৎই এসে পৌঁছেছে আদ্রিয়াতিক সাগরে। এ সংবাদ তিনি কালই জানতে পেরেছেন ভেনিসে অবস্থিত তার কর্মচারীদের কাছ থেকে। তারা আন্তনিওকে খবরটা দিতে যাচ্ছিল। কিন্তু পোর্সিয়া তাদের নিরস্ত করেন এই বলে যে তিনি নিজেই খবরটা দিতে চান আন্তনিওকে।
সবার মন এবার কানায় কানায় ভরে উঠেছে আনন্দে। শুধু গ্রাসিয়ানোই বিরস মুখে বলে, সবাই প্ৰাণ খুলে আনন্দ করছেন, করুন। আমি বাধা দিতে চাই না তাতে। কিন্তু এই আনন্দের মাঝেও একটা ব্যাপারে উৎকণ্ঠিত আমি—সেটা নেরিসার আংটিটা নিয়ে। কখন যে কী ঘটে যায় তা কে জানে। সারাজীবন ওটা নিয়ে উৎকণ্ঠিত থাকতে হবে। আমাকে।
এবার সব উৎকণ্ঠা দূর করে পোর্সিয়া বলে উঠলেন, আমিই সেই আইনজীবী আর নেরিস মুহুরি। আমরা দুজনেই পুরুষের ছদ্মবেশে জাহাজে করে ভেনিসে গিয়েছিলাম। আর তোমরা রওনা দিয়েছিলে আমাদের একদিন আগে। স্বয়ং লোরেঞ্জোই আমাদের সমস্ত কাজের সাক্ষী। এবার সবাই ভেতরে চলে আসুন-ভোরের আলো ফুটতে শুরু করেছে।
মেজার ফর মেজার
যথেষ্ট বয়স হওয়া সত্ত্বে এখনও পর্যন্ত অবিবাহিত রয়ে গেছেন ভিয়েনার শাসক ডিউক ভিনসেনসিও। দয়ালুস্বভাবের মানুষ হবার দরুন গুরুতর অপরাধ করলেও কোনও প্রজাকে তিনি কঠোর শাস্তি দিতে পারেন না। তার এই মানসিক দুর্বলতা যে রাজ্যশাসনের সহায়ক নয়, তা বেশ ভালোই জানেন ডিউক। অনেক ভেবে-চিন্তে তিনি স্থির করলেন কোনও চরিত্রবান যোগ্য সহকারীর হাতে রাজ্যের শাসন ভার ছেড়ে দিয়ে কিছুদিন তিনি লুকিয়ে থাকবেন দেশের ভিতরে, সেখান থেকে সন্ন্যাসীর ছদ্মবেশে নজর রাখবেন রাজ্যশাসন ব্যবস্থার উপর। ডিউক তার বয়স্ক সভাসদ এসকেলাসের সাথে পরামর্শ করে রাজ্যের পুরো শাসনভার তুলে দিলেন তার সুযোগ্য সহকারী অ্যাঞ্জেলোর হাতে। তারপর গোপনে তিনি কিছুদিনের জন্য আশ্রয় নিলেন নগরীর প্রান্তে অবস্থিত সাধু টমাসের মঠে। কোথায় যাচ্ছেন যাবার আগে তা কাউকে বলেননি। ডিউক, এমন কি নতুন শাসক অ্যাঞ্জেলোকেও নয়। দেশের সবাই জানল কিছুদিনের জন্য পোল্যান্ডে যাচ্ছেন। ডিউক। যাবার সময় ডিউক ভিনসেনসিও অ্যাঞ্জোলাকে আশ্বাস দিয়ে গেলেন যে মাঝে মাঝে তিনি চিঠি লিখে প্রজাদের খোঁজ-খবর নেবেন।
রাজ্য ছেড়ে ডিউক চলে যাবার সামান্য কিছুদিন বাদে ভিয়েনায় এক বয়স্ক নাগরিক এসে অ্যাঞ্জেলোর কাছে অভিযোগ জানাল যে ক্লডিও নামে এক সন্ত্ৰান্ত বংশের ছেলে তার মেয়ে জুলিয়েটকে ফুসলিয়ে নিয়ে গিয়ে একত্রে বসবাস করছে। ফলে গর্ভবতী হয়ে পড়েছে জুলিয়েট। ক্লডিওর এই অপরাধের দরুন তার কঠিন সাজার দাবি জানালেন জুলিয়েটের বাবা। ভিয়েনার প্রচলিত আইন অনুযায়ী এ জাতীয় অপরাধের একমাত্র শাস্তি মৃত্যুদণ্ড। অভিযোগ শোনার পর ক্লডিওকে গ্রেপ্তারের আদেশ দিলেন অ্যাঞ্জেলো; রক্ষীরা ক্লডিওকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে এল। প্রাসাদে। ব্যভিচারের অপরাধে ক্লডিওকে প্রাণদণ্ডে দণ্ডিত করলেন অ্যাঞ্জেলো। শাস্তি ঘোষণার পর রক্ষীরা কারাগারে নিয়ে গোল ক্লডিওকে।
এদিকে রাজ্য প্রতিনিধি অ্যাঞ্জেলো তার অন্তরঙ্গ বন্ধু ক্লডিওকে প্রাণদণ্ডাদেশ দিয়েছেন শুনে কারাগারে গিয়ে তার সাতে দেখা করল লুসিও। সে ক্লডিওর কাছে জানতে চাইল এমন কী অপরাধ সে করেছে যার দরুন অ্যাঞ্জেলো তাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন। ক্লডিও জানাল সে মোটেও তারা বাবা-মার কাছ থেকে ফুসলিয়ে আনেনি জুলিয়েটকে। বরঞ্চ তাদের বিয়ে আগে থেকেই ঠিক হয়েছিল। বিয়ের দরুন সে কিছু যৌতুক দাবি করেছিল জুলিয়েটের বাবা-মার কাছে। কিন্তু তার দাবি মতো যৌতুক দিতে রাজি হননি জুলিয়েটের মা-বাবা। এরপর সে জুলিয়েটকে গির্জায় নিয়ে গিয়ে গোপনে তাকে বিয়ে করে স্বামী-স্ত্রীর মতো বসবাস করতে থাকে। তারই ফলস্বরূপ গৰ্ভবতী হয়ে পড়ে জুলিয়েট। এ খবর জানাজানি হতেই জুলিয়েটের বাবা অ্যাঞ্জেলোর কাছে গিয়ে অভিযোগ করেন যে তার মেয়েকে কুঁসলিয়ে নিয়ে গেছে ক্লডিও। অভিযোগের সত্যতা যাচাই না। করেই ক্লডিওকে ধরে এনে তাঁরা প্রাণদণ্ডের আদেশ দেন।
