বেজায় রাগ করেছেন এরূপ ভান করে আদালত ছেড়ে চলে গেলেন পোর্সিয়া। অতি কষ্টে হাসি চেপে তার পেছু পেছু গেলেন নেরিস। ওরা চলে যাবার পর আন্তনিও বললেন, বন্ধু! তোমার অবস্থােটা আমি বেশ বুঝতে পারছি। তবুও বলব, তোমার উচিত ছিল স্ত্রীর বিরাগভাজন হবার ঝুঁকি নিয়েও আংটিটা ভদ্রলোককে দিয়ে দেওয়া। আমার মনে হয় তোমার স্ত্রীকে বুঝিয়ে বললে তিনি নিশ্চয়ই বুঝতে পারবেন যে এটা না করে তোমার কোনও উপায় ছিল না। আমি নিজে গিয়ে তাকে বুঝিয়ে বলব যাতে তিনি তোমার উপর অপ্ৰসন্ন না হন। উকিলবাবুকে তার প্রার্থিত জিনিসটি না দিলে আমার মনে হয় সব কথা শুনে তিনি নিশ্চয়ই তোমায় তিরস্কার করবেন। কারণ অবস্থা অনুযায়ী সবসময় ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
আন্তনিওর কথা শুনে ব্যাসানিও স্থির করলেন আংটিটা তিনি উকিলবাবুকে দিয়ে দেবেন। আংটি দিতে না পারায় মনে মনে নিজের কাছেই লজ্জিত হয়ে আছেন ব্যাসানিও। আন্তনিওর কথা শুনে তার দ্বিধা দূর হয়ে গেল। তিনি হাত থেকে আংটি খুলে নিয়ে গ্রাসিয়ানোর হাতে দিয়ে বললেন, বন্ধু! তুমি এখনই ছুটে চলে যাও। উকিলবাবু নিশ্চয়ই বেশি দূর যেতে পারেননি। আগে আমি যে অনিচ্ছা প্ৰকাশ করেছি। তার জন্য ক্ষমা চেয়ে নিয়ে এই আংটিটা তুমি তাকে দেবে এবং আমাদের সাথে নৈশ ভোজের জন্য তাকে আমন্ত্রণ জানাবে।
তৎক্ষণাৎ আংটি নিয়ে ছুটে চলে গেলেন গ্রাসিয়ানো ইচ্ছে করেই বেশিদূর যাননি পোর্সিয়া। তিনি কাছাকাছিই ছিলেন। আংটি সম্পর্কে ব্যাসানিওর মতের কোনও পরিবর্তন হয় কিনা সেটা দেখার খুব আগ্রহ ছিল পোর্সিয়ার। গ্রাসিয়ানোকে দেখে তিনি এমন ভাব করলেন যেন তিনি তাকে এই প্রথম দেখছেন। যথোচিত শিষ্টাচার সহ তিনি তাকে বললেন, মশায়! আমায় দেখিয়ে দেবেন কি ইহুদি শাইলকের বাড়িটা কোথায়? একটা দলিলে তার সই নেবার প্রয়োজন আছে।
সাগ্রহে বলল গ্রাসিয়ানো, নিশ্চয়ই আপনাকে দেখিয়ে দেব শাইলকের বাড়ি। তাছাড়া একটা বিশেষ প্রয়োজনে আপনার কাছে এসেছি আমি। আন্তনিও এবং ব্যাসানিও — উভয়ের বন্ধু আমি! আদালতে আমিও উপস্থিত ছিলাম। আপনার মতো ভালো উকিল আমি আগে কখনও দেখিনি। বন্ধু ব্যাসানিওর কাছ থেকে যে আংটিটি আপনি উপহার হিসেবে চেয়েছিলেন…
বাধা দিয়ে বলে উঠলেন পোর্সিয়া, থাক, আপনার বন্ধুর উপহারের কোনও প্রয়োজন নেই আমার। যথেষ্ট আংটি রয়েছে আমার ঘরে; আর কম হলেও সেটা কিনে নেবার ক্ষমতা আছে আমার। উনিই তো আমায় খোসামোদ করেছেন স্মৃতিচিহ্ন স্বরূপ একটা কিছু নেবার। আমি যেই একটা জিনিস চাইলাম, উনি বললেন না। ওটা নয়, অন্য কিছু নিন। একে কি ভদ্রতা বলে?
ব্যাসানিও তাড়াতাড়ি আংটিটা পোর্সিয়ার সামনে তুলে ধরে বললেন, আপনি আমাদের ভুল বুঝবেন না–এটা আমার বন্ধু ব্যাসানিওর নববিবাহিতা স্ত্রীর প্রথম উপহার। সে কারণে তিনি আপনাকে ওটা দিতে ইতস্তত করছিলেন। যাকগে সে কথা, আপনার কাছে অপরিশোধ্য ঋণের বঁধনে বাধা পড়েছি আমরা সবাই। সবকিছু বাদ দিয়ে আপনার তৃপ্তি সাধন করাই এখন আমাদের কর্তব্য। তাই বন্ধু এই আংটিটা পাঠিয়ে দিয়েছেন। আপনার জন্য। আপনি এটা নিলে তিনি বাধিত মনে করবেন নিজেকে।
যখন পোর্সিয়া দেখলেন যে তার উদ্দেশ্য সাধিত হয়েছে, তিনি আর কথা না বাড়িয়ে আংটিটা নিয়ে নিলেন। তারপর গ্রাসিয়ানো নৈশভোজের আমন্ত্রণ জানালেন পোসিয়াকে। আগের মতোই পোর্সিয়া জবাব দিলেন যে নিমন্ত্রণ রক্ষা করা তার পক্ষে সম্ভব নয় কারণ পাদুয়ায় তার জরুরি কাজ রয়েছে।
পোর্সিয়ার অনুরোধে কেরানিরূপী নেরিসাকেশাইলকের বাড়ির দিকে নিয়ে চলল গ্রাসিয়ানো। সেখানে গিয়ে দলিলে শাইলকের স্বাক্ষর নেবে নেরিসা।
নেরিসা যেতে যেতে বলল, আপনাদের বন্ধু আন্তনিওর মধ্যে যে ভদ্রতাবোধ রয়েছে, আমরা আশা করেছিলাম। আপনাদের মধ্যেও তা থাকবে। আমরা তো আন্তনিওর প্রাণ বাঁচিয়েছি। এর জন্য নিশ্চয়ই কিছু উপহার আমাদের প্রাপ্য।
গ্রাসিয়ানো বললেন, উপহার নিশ্চয়ই আপনাদের প্রাপ্য। কিন্তু আমি তো নিঃস্ব। উপহার দেবার মতো কীই বা আছে আমার?
নেরিস বলল, কী বললেন। আপনি নিঃস্ব? ওই তো আপনার হাতে আংটি রয়েছে। ওই আংটিটা পেলেই যথাযোগ্য পুরস্কার পেয়েছি বলে মনে করব আমি।
ঠিক একই কারণে ব্যাসানিওর মতো। আপত্তি জানালেন গ্রাসিয়ানো। তার স্ত্রী নেরিসা তাকে দিয়েছেন ওই আংটি। কিন্তু নেরিসার বাক্যবাণের জোয়ারে ভেসে গেলেন তিনি। তার কোনও ওজার-আপত্তি টিকল না।
শেষমেশ গ্রাসিয়ানো স্থির করলেন ব্যাসানিও যখন তার আংটিটা দিতে পেরেছেন, তখন তিনি দিলেও এমন কিছু মারাত্মক ক্ষতি হবে না। এ নিয়ে নেরিসা কোনও ঝামেলা করলে তিনি অনায়াসেই ব্যাসানিওর উদাহরণ দেখিয়ে পার পেয়ে যাবেন।
গ্রাসিয়ানোর কাছ থেকে আংটিটা নিয়ে নেরিসা চলে গেল শাইলকের বাড়ির ভেতরে। শাইলাককে দিয়ে দলিলে সই করিয়ে সে ফিরে এল পোর্সিয়ার কাছে। আর দেরি না করে পোর্সিয়া তাকে নিয়ে রওনা হলেন বোলমন্টের পথে। কারণ কালই আন্তনিওকে নিয়ে ব্যাসানিও রওনা দেবেন। বেলমন্ট অভিমুখে। যে করেই হোক স্বামীর আগে তাকে সেখানে পৌঁছতে হবে।
০৬.
পরদিন সন্ধ্যার পর পোর্সিয়ার প্রাসাদের সামনে বসে গেল আনন্দের মেলা। উপরে জ্যোৎ মা . প্লাবিত আকাশ আর নিচে নানা বাদ্যযন্ত্রে সুর তুলে এক মোহময় পরিবেশের সৃষ্টি করেছে বাদকেরা! পোর্সিয়ার অবর্তমানে এ প্রাসাদের দায়িত্বে রয়েছেন লোরেঞ্জো এবং জেসিকা। তাঁরা খবর পেয়েছেন মঠ থেকে খুব দ্রুত ফিরে আসছেন পোর্সিয়া। তাই তারা আগাম নাচ-গানের আসর বসিয়েছে প্ৰসাদের সামনে।
