এদিকে ব্যাসানিও যতই অনুরোধ করেন, টাকার কথা ততই হেসে উড়িয়ে দেন পোর্সিয়া। শেষমেশ ব্যাসানিও বললেন, তাহলে মাঝামাঝি একটি রফা করা যাক। আমাদের আসল ঋণ ছিল তিনহাজার ডুকাটি। ওটা শাইলককে দিলে অতিরিক্ত কিছু দেওয়া হত না। আপনার বুদ্ধি আর নিজ কর্মফলে সেটা থেকে বঞ্চিত হয়েছে শাইলক। তাহলে এই তিন হাজার ডুকাট আপনি অনায়াসেই পারিশ্রমিক হিসেবে নিতে পারেন। এতে আমাদের দুপক্ষেরই সুবিধা হবে — ঋণের অতিরিক্ত আমাদের কিছু দিতে হবে না। আর আপনাকেও কেউ ইহুদির চেয়ে ঘূণ্য জীব বলতে পারবে না। আপনার মতো একজন প্রথম শ্রেণির আইনজীবীর পারিশ্রমিক হিসেবে তিন হাজার ডুকাট মোটেই বেশি নয়।
তবুও টাকা নিতে রাজি হলেন না পোর্সিয়া। তিনি বললেন, ভালো কাজ করতে পারলে সব সময় একটা আত্মপ্রসাদ লাভ করা যায়। আপনাদের কাজ করতে পেরে আমিও সেই আত্মপ্রসাদ লাভ করছি। এ কাজের জন্য পারিশ্রমিক নিলে আমার অন্তরের তৃপ্তিটুকু নষ্ট হয়ে যাবে। ওই তিন হাজার ডুকাটের চেয়ে ওর মূল্য আমার কাছে অনেক বেশি। দয়া করে পারিশ্রমিক নেবার কথা আমাকে আর বলবেন না। ব্যবসা শুরু করার আগে সমস্ত আইনজীবীরাই শপথ নিয়ে থাকেন যে তাঁরা সর্বদা অন্যায়ের বিপক্ষে লড়বেন। পারিশ্রমিক নিলে সে শপথ ভঙ্গ করা হয়। অনুগ্রহ করে আমাকে আর প্রলোভন দেখাবেন না।
এ কথা শুনে চুপ করে যেতে হল ব্যাসানিও এবং আন্তনিওকে! শেষে আন্তনিও প্রস্তাব দিলেন, বেশ তো! টাকার কথা না হয় রইল। তবে আপনার প্রতি আজীবন কৃতজ্ঞতার চিহ্ন স্বরূপ সামান্য কিছু উপহার তো আমরা নিশ্চয়ই আপনাকে দিতে পারি। আশা করি সেটা নিলে আপনার অমর্যাদা হবে না।
মনে মনে হেসে বললেন পোর্সিয়া, না, তা অবশ্য হবে না। কোনও উপহার বা স্মৃতিচিহ্ন নিতে আমার বাধা নেই। তবে আপনি যদি বলেন যে একলক্ষ টাকা নিতে হবে, তাহলে আমার আপত্তি আছে। আপনি যদি আমার পছন্দমতো জিনিস নিতে দেন তাহলে আমি রাজি আছি।
সমস্বরে উত্তর দিলেন আন্তনিও এবং ব্যাসানিও, আমরা রাজি আছি। এবার বলুন আপনি কী নেবেন?
আন্তনিওর হাতের দিকে তাকিয়ে পোর্সিয়া বললেন, আপনার হাতের ওই দস্তানা জোড়া আমায় দিন। আমি ওগুলি সযত্নে রেখে দেব আপনার স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে।
এমন একটা সামান্য জিনিস পোর্সিয়া বেছে নেওয়ায় মনে মনে খুব ক্ষুন্ন হলেন আন্তনিও। কিন্তু কী আর করা যাবে? তিনি দস্তানা জোড়া খুলে পোর্সিয়াকে দিলেন। এবার ব্যাসানিওর দিকে তাকিয়ে বললেন পোর্সিয়া, আপনার কাছ থেকে আর দস্তানা নেব না। মনে হচ্ছে দস্তানার নিচে কী যেন উচু হয়ে আছে। মনে হয় ওটা আংটি। বেশ, ওই আংটিটাই আমায় দিন। আপনার স্মৃতিচিহ্ন স্বরূপ ওটা আমি আঙুলে পরব।
পোর্সিয়ার কথা শুনে যেন বজ্ৰপাত হল ব্যাসানিওর মাথায়। শেষমেষ উকিলবাবুকিনা চেয়ে বসলেন ওই আংটিটিা। ওটা যে ওর বিয়ের আংটি-আংটিটা দেবার সময় পোর্সিয়া মাথার দিব্যি দিয়ে বলেছিল আমি যেন ওটা সযত্নে রক্ষা করি। কেমন করে সেটা তিনি তুলে দেবেন। উকিলবাবুকে? আংটিটা দেখতে না পেলে পোর্সিয়া যখন জানতে চাইবে সেটা কোথায় গেল, তখন কী জবাব দেবেন তাকে?
সংকটের মাঝে পড়ে গেছে ব্যাসানিও। উকিলবাবু হাত বাড়িয়ে রয়েছেন। আংটিটার জন্য। কিন্তু ব্যাসানিও সেটা দেবার কোনও ইচ্ছা প্ৰকাশ করছেন না দেখে তিনি পরিহাস করে বললেন, কী মশায়! আংটি দেবার কথা শুনেই উবে গেলে আপনার বদান্যতা? দেবার হলে দিন, নইলে রইল আপনার আংটি। নষ্ট করার মতো সময় আমার নেই। হাতে আরও দু-চারটা কাজ রয়েছে। জড়ানো স্বরে বলল ব্যাসানিও, মহাশয়, এ সামান্য আংটিটিা আপনাকে দিতে আমার লজ্জা করছে। এর বদলে আপনি কোনও একটা দামি উপহার নিন না কেন।
মুখে বিরক্তির ভান করে বললেন পোর্সিয়া, কী বললেন, সামান্য জিনিস? আন্তনিওর কাছ থেকে যে দস্তানা আমি নিয়েছি, আপনার আংটিটা কি তার চেয়েও তুচ্ছ? মূল্যবান উপহার নেবার ইচ্ছে থাকলে আপনাদের প্রস্তাবিত নহাজার ডুকাটি আমি কখনই প্রত্যাখ্যান করতাম না। আপনি আমায় উপহার দেবার জন্য ব্যগ্র হয়ে উঠেছিলেন। উপহার নেবার তেমন আগ্রহ আমার নেই। তবে দিতে চাইলে ওই আংটিটিই আমায় দিন। এনিয়ে তর্ক-বিতর্ক করার মতো সময় আমার নেই।
কিন্তু ব্যাসানিও নিরুপায়। এমনকি আন্তনিও পর্যন্ত অবাক হয়ে তাকিয়ে রয়েছেন তার দিকে। আংটিটা দিতে ব্যাসানিওর যে কেন এত অনীহা তা কিছুতেই বুঝে উঠতে পারছেন না তিনি। শেষমেশ উপায় না দেখে সত্যি কথাটাই বলে ফেললেন ব্যাসানিও–মহাশয়, আংটিটা দেবার ব্যাপারে আমার খুব অসুবিধা আছে। বিয়ের সময় স্ত্রী আমায় এটা উপহার দিয়েছেন। আমি তার কাছে প্ৰতিজ্ঞা করেছি যে জীবিত থাকাকালীন আমি এই আংটি কখনও হাতছাড়া করব না। সবে বিয়ে হয়েছে আমাদের। এত তাড়াতাড়ি কী করে আমার প্রতিজ্ঞা ভাঙব? তাহলে যে ছোটো হয়ে যাব তার কাছে। তিনি আর কখনও আমায় বিশ্বাস করবেন না। আপনার কাছে আমার একান্ত অনুরোধ এর বদলে হিরের বা মুক্তোর তৈরি আংটি নিন।
ব্যাসানিওর কথা হেসে উড়িয়ে দিয়ে বললেন পোর্সিয়া, আপনার স্ত্রী প্রকৃত পাগল না হলে সব কথা শোনার পর নিশ্চয়ই তিনি অবিশ্বাস করবেন না। আপনাকে। আপনি যদি পারিশ্রমিক হিসেবে আংটিটা আমায় দেন, তাহলে সেটা অসংগত মনে হবে না। তার কাছে। আসল কথা হচ্ছে আমাকে কিছু দেবার ইচ্ছে আমার নেই। এক ধরনের লোক আছে যারা মুখে খুব উদারতার কথা বলে, কিন্তু কাজের সময় নানা অজুহাতে পিছিয়ে আসে। যাক, আপনার কাছ থেকে শিখলাম কী ভাবে ভিক্ষুকের সাথে ব্যবহার করতে হয়।
