এতক্ষণে মুখ খুললেন ডিউক–খ্রিস্টানরা যে ইহুদিদের মতো কঠোর এবং নৃশংস নয় তা বোঝাবার জন্য তুমি প্ৰাণভিক্ষা চাইবার আগেই আমি প্ৰাণদান করছি তোমায়। তবে তোমার সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার ব্যাপারটা আমার একার উপর নির্ভরশীল নয়। আইনত তোমার সম্পত্তির অর্ধাংশ আন্তনিওর প্রাপ্য। তিনি চাইলে দরিদ্রতার হাত থেকে তোমায় রক্ষা করতে পারেন।
আন্তনিও বললেন, শুধু একটিমাত্র শর্তে আমি অংশটা ফিরিয়ে দিতে পারি শাইলাককে। শাইলকের একমাত্ৰ কন্যা জেসিকা গোপনে বিয়ে করেছে এক খ্রিস্টান যুবককে। পিতার রোযের আশঙ্কায় সে বাড়ি ছেড়ে স্বামীর সাথে রয়েছে আমার বন্ধু বাসানিওর স্ত্রীর আশ্রয়ে বেলমন্ট গ্রামে। এখন শাইলক যদি এভাবে উইল করে দেয় যে তার মৃত্যুর পর সমস্ত সম্পত্তি পাবে তার মেয়ে ও জামাই, তাহলে আমি এই মুহূর্তে সম্পত্তিটা ফিরিয়ে দিতে রাজি আছি শাইলাককে।
ডিউক বললেন, এতো খুব ভালো কথা। শাইলকের সম্পত্তির যে অংশটা রাজকোষে বাজেয়াপ্ত হবার কথা সেটা আমি তাকে ফিরিয়ে দিতে পারি। যদি সে খ্রিস্টধর্মে দীক্ষা নিতে রাজি হয়। শাইলক, তুমি কি চাও না। আমাদের প্রস্তাবে রাজি হয়ে সম্পত্তি রক্ষা করতে?
অপ্ৰসন্নভাবে জবাব দিল শাইলক, রাজি না হয়ে আর উপায় কী! আমি তো ভিক্ষাবৃত্তি গ্ৰহণ করতে পারব না। পরীক্ষণেই সে মিনতি জানিয়ে ডিউককে বলল, এবার তাহলে আমায় বাড়ি যাবার অনুমতি দিন। প্রয়োজনীয় কাগজ-পত্র তৈরি করে আমার কাছে পাঠিয়ে দিলেই আমি তা সই করে দেব।
ডিউক বললেন, ঠিক আছে, এবার তুমি যেতে পোর। তবে মনে রেখা সই না করলে তুমি কিন্তু বিপদে পড়বে। সম্পত্তি তো বেহাত হবেই। সেই সাথে তোমার প্রাণভিক্ষাও প্রত্যাহার করে নেব আমি।
নিচু গলায় বলল গ্রাসিয়ানো, আহা! ইহুদিটার কি এমন সুমতি হবে যে সই করতে অস্বীকার করবে? তাহলে ওকে ফঁাসির দড়িতে ঝুলতে দেখে চক্ষু সার্থক হবে।
মাথা নিচু করে ফিরে গেল শাইলক। তার ইচ্ছা ছিল আন্তনিওর প্রাণ নেওয়া। সে আশা সফল হতে হতে কোথা থেকে কী সব হয়ে গেল। সবকিছু ভেস্তে গেল।
কোথা থেকে একটা ভূইফোঁড় এসে এমন একটা নজির দেখাল। যার বিপক্ষে কোনও যুক্তিই খাড়া করতে পারল না শাইলক। একেই বোধহয় বলে ভবিতব্য। আর ঈশ্বরও তেমনি সদয় খ্রিস্টানদের প্রতি। যতই ওদের ফাঁদে ফেলা যাক না কেন, একটা না একটা রাস্তা দিয়ে ওরা ঠিক বেরিয়ে আসবে।
এবার আদালত ভঙ্গ করে প্রাসাদে ফেরার জন্য তৈরি হলেন ডিউক। যাবার আগে পোর্সিয়াকে ডেকে তার ভূয়সী প্রশংসা করে তিনি বললেন, এই অল্প বয়সে আপনি যে বিচক্ষণতার পরিচয় দিয়েছেন, প্ৰজ্ঞ বেলারিওর কাছ থেকে ওর চেয়ে আমরা বেশি কিছু প্রত্যাশাও করতে পারতাম না। ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করি আপনি উত্তরোত্তর প্রতিষ্ঠা লাভ করুন। আমার দৃঢ় বিশ্বাস আপনার দ্বারা জনগণ উপকৃত হবে। আপনি যদি আমার আতিথ্য গ্ৰহণ করে আমার সাথে আহার করেন তাহলে খুবই খুশি হব আমি।
ডিউকের সৌজন্যে পরম আপ্যায়িত হলেও তার নিমন্ত্রণ একটা অস্বস্তিকর অবস্থার মধ্যে ফেলে দিল পোর্সিয়াকে। ডিউকের নিমন্ত্রণ রক্ষা করতে হলে কিছুতেই তার পক্ষে ব্যাসানিওর আগে বেলমন্টে পৌঁছানো সম্ভব হবে না। কেননা তিনি আগে থেকেই স্থির করে রেখেছেন। বেলমন্ট থেকে তার অনুপস্থিতির কথা কিছুতেই স্বামীকে জানতে দেবেন না তিনি। তিনি বিনীত ভাবে ডিউককে বললেন, আপনার নিমন্ত্রণ রক্ষা করতে পারলে খুবই খুশি হতাম আমি। কিন্তু বিশেষ কারণে আমাকে এখনই পাদুয়ায় ফিরে যেতে হবে। সেখানে একটা জরুরি মামলার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে আমার উপর। আপনি তো জানেন আমাদের সময় হল অপরের সম্পত্তি। আমি খুবই দুঃখিত এই মুহূর্তে নষ্ট করার মতো সময় আমার হাতে নেই।
ডিউক দুঃখিত হলেও বুঝতে পারলেন পোর্সিয়ার অসুবিধার কথা। যেখানে জরুরি মামলার দায়িত্ব রয়েছে। এই তরুণ আইনজীবীর উপর, সেখানে তাকে আটকে রাখা ঠিক নয়। ডিউক পোসিয়াকে বললেন তিনি যেন ফিরে এসে তার আতিথ্য গ্রহণ করেন। তারপর আন্তনিও ও ব্যাসানিওকে উদ্দেশ করে ডিউক বললেন, আপনাদের মনে করিয়ে দেওয়া নিম্প্রয়োজন যে এই তরুণ আইনজীবীকে আপনারা যথোপযুক্ত পারিশ্রমিক দেবেন, যদিও তিনি আপনাদের যে উপকার করেছেন তার তুলনায় কোনও পারিশ্রমিকই ওর উপযুক্ত নয়। তিনি আন্তনিওর জীবন দান করেছেন যা অর্থ দিয়ে কেনা যায় না।
এরপর ডিউক আদালত ছেড়ে চলে গেলেন। আস্তে আস্তে উপস্থিত জনতাও চলে যেতে লাগল। কোর্টের একদিকে রইল পোর্সিয়া ও নেরিস এবং অন্যদিকে আন্তনিও, ব্যাসানিও, গ্রাসিয়ানো ও অপর বন্ধুরা। বিনীত কণ্ঠে ব্যাসানিও এই তরুণ আইনজীবীকে বললেন, আমি বা আমার বন্ধু আন্তনিও, কেউ আপনার ঋণ এ জীবনে পরিশোধ করতে পারব না। তবুও কৃতজ্ঞতার নিদর্শনস্বরূপ আপনাকে উপযুক্ত পারিশ্রমিক দেবার ব্যবস্থা করছি আমরা। যে নহাজার ডুকাট আমরা শাইলককে দিতে চেয়েছিলাম সেটাই আমরা আপনাকে সামান্য উপহার হিসাবে দিতে চাই। দয়া করে আপনি এটা গ্রহণ করুন।
সাথে সাথে জিভ কামড়িয়ে বললেন পোর্সিয়া, বলছেন কী মশায়! একটা মামলার পারিশ্রমিক নহাজার ডুকাট? এটা নিলে যে লোকে আমায় ইহুদির চেয়ে ঘূণ্য জীব বলবে।
