ডিউক চিঠিটা খুলে পড়তে লাগলেন–মাননীয় ডিউক মহোদয় সমীপেষু, আপনার আদেশ অনুযায়ী ভেনিসে গিয়ে শাইলক-আন্তনিওর মামলার দায়িত্ব নেবার ইচ্ছা! আমার খুবই ছিল এবং সেজন্য আমি যথেষ্ট প্রস্তুতিও নিচ্ছিলাম। কিন্তু হঠাৎ কঠিন রোগে আক্রান্ত হওয়ায় আমার পক্ষে ভেনিস যাত্রা মোটেই সম্ভবপর নয়।
সামান্য কিছুদিন আগে রোম থেকে আমার একজন সমব্যবসায়ী বন্ধু আমার সাথে দেখা করতে এসেছিলেন। বয়স কম হলেও তিনি আইনবিদ্যায় যথেষ্ট পারদশী। শাইলকের মামলার সমস্ত ঘটনাটা আমি তাকে জানিয়েছি। এ ব্যাপারে আলোচনা, পরামর্শ যা করা দরকার তা আমরা উভয়ে মিলে করেছি। আমি যেতে অপারগ হওয়ায় তাকে অনুরোধ করেছি। তিনি যেন আমার প্ৰতিনিধি স্বরূপ ভেনিসে গিয়ে আইনি ব্যাপারে। আপনাকে সাহায্য করেন।
আমার উক্ত বন্ধু ডা. বেলথাজার সম্মত হয়েছেন আমার প্রস্তাবে। তিনি এই চিঠি আপনার কাছে নিয়ে যাচ্ছেন। আমার অনুরোধ, বয়স কম বলে আপনি তাকে অবহেলা করবেন না। আমার চেয়ে আইনের জ্ঞান তার কোনও অংশে কম নয়। এ মামলার ব্যাপারে আমার ব্যক্তিগত অভিমত আমি তাকে জানিয়ে দিয়েছি। প্রকৃতপক্ষে আপনি একজনের জায়গায় দুজন আইনজ্ঞের সাহায্য পেতে চলেছেন। আর বেশি কিছু বলার নেই।
ইতি
আপনার একান্ত অনুগত
ডা. বেলারিও।
চিঠিটা পড়ার পর ডিউক উৎসুক হয়ে উঠলেন, এই নবীন আইনজ্ঞকে দেখার জন্য। তিনি নেরিসাকে বললেন, ওকে, তোমার প্রভু ডাক্তার বেলথাজার কি আদালতে এসেছেন?
নেরিস উত্তর দিলেন, হ্যাঃ মহামান্য ডিউক, তিনি আদালতের বাইরে অপেক্ষা করছেন। আপনি যদি সত্যিই এ মামলা পরিচালনার ভার তাকে দিতে ইচ্ছক হন, তাহলে আমি এখনই গিয়ে তাকে নিয়ে আসতে পারি।
ডিউক তখনই আদালতের কয়েকজন দায়িত্বশীল কর্মচারীকে নেরিসার সাথে পাঠিয়ে দিলেন এই তরুণ আইনজীবীকে সসম্মানে ভেতরে নিয়ে আসার জন্য। কিছুক্ষণ বাদে তাদের সাথে ছদ্মবেশিনী পোর্সিয়া আদালতকক্ষে প্রবেশ করলেন।
পোশাক-আশাকে পোর্সিয়াকে আইনজীবী ছাড়া অন্য কিছু মনে ভাবার অবকাশ ছিল না। তিনি তার তরুণ্য ও রমণীসুলভ সৌন্দর্যকে এমন গভীরতার আড়ালে ঢেকে রেখেছিলেন যে তার স্বামী ব্যাসানিও পর্যন্ত তাকে চিনে উঠতে পারেননি।
আদালত কক্ষে প্রবেশ করে বোলথাজাররূপী পোর্সিয়া যথারীতি অভিনন্দন জানালেন ডিউককে। তারপর উপস্থিত জনসাধারণকে যথাযোগ্য সম্মান জানিয়ে ডিউককে বললেন, এই মামলা সম্পর্কে যা কিছু আমার জানার ছিল, তা আমি ইতিমধ্যেই জেনে নিয়েছি আমার শ্রদ্ধেয় বন্ধু ও উপদেষ্টা ডাক্তার বেলারিওর কাছ থেকে। এখন আমি জানতে চাই কে আন্তনিও আর কেইবা শাইলক। ডিউক নিজেই দেখিয়ে দিলেন আন্তনিও এবং শাইলাককে। তারপর মামলা শুরু করার নির্দেশ দিলেন বোলথাজারকে।
শাইলককে ডেকে পোর্সিয়া বললেন, মহাশয়, মামলাটি সত্যিই নতুন ধরনের। তবে নতুন হলেও এর মধ্যে আইনগত কোনও ত্রুটি নেই। কাজেই এটিকে বিচারের জন্য গ্ৰহণ করতে কোনও বাধা নেই।
শাইলক আনন্দে বলে উঠল, বা! আপনি তো দেখছি ব্যাপারটা ভালোভাবে বুঝতে পেরেছেন!
পোর্সিয়া বলতে লাগলেন, একটা বিশেষ শর্তে আন্তনিও আপনার কাছ থেকে তিনহাজার ডুকটি ধার নিচ্ছেন— এভাবে স্বেচ্ছায় একটা দলিল সম্পাদন করে দিয়েছেন আন্তনিও। শর্ত এই–তিন মাসের মধ্যে যদি আন্তনিও ধার শোধ করতে না পারেন তাহলে… যাই হোক, ও ব্যাপারে আমি পরে আসছি। এখন প্রশ্ন হচ্ছে সত্যিই কি আন্তনিও ধার পরিশোধ করতে অক্ষম?
সাথে সাথেই বলে উঠলেন ব্যাসানিও, মাত্র তিন হাজার কেন, ওর চেয়ে অনেক বেশি অর্থ দেবার জন্য তৈরি হয়ে এসেছি আমি।
অধীরভাবে বলে উঠল শাইলক, টাকা দিলেও তা নিচ্ছে কে? শর্তের সময় পার হয়ে গেছে।
গম্ভীর স্বরে বললেন পোর্সিয়া, সত্যিই তো! শর্তের সময়-সীমা পার হয়ে গেছে। কাজেই দলিলের শর্ত অনুযায়ী আন্তনিওর দেহ থেকে এক পাউন্ড মাংস কেটে নেবার অধিকারী শাইলক। তিনি যদি স্বেচ্ছায় তার দাবি ত্যাগ না করেন, তাহলে তাকে বাধা দেবার কারও অধিকার নেই!
উৎফুল্ল হয়ে বলে উঠল শাইলক, বা! এই তরুণ বয়সে আপনি তো আইনটা ভালোভাবেই রপ্ত করেছেন। ঠিক যেন দ্বিতীয় দানিয়েল। দানিয়েলের পর এমন বিজ্ঞ বিচারক আর দেখা যায়নি পৃথিবীতে।
পোর্সিয়া বলতে লাগলেন, সামগ্রিক পরিস্থিতি বিচার করলে শাইলককে অনুমতি না দেবার কোনও কারণ নেই আদালতের। তিনি অনায়াসেই আন্তনিওকে মেরে ফেলতে পারেন তার শরীরের মাংস কেটে নিয়ে। এক্ষেত্রে শাইলক দয়া প্ৰদৰ্শন না করলে কোনও উপায় নেই। কাজেই দয়াবান হতে হবে শাইলাককে।
সাথে সাথেই রেগে যায় শাইলক, বলে, এমন কোনও আইন আছে যা আমাকে দয়া প্ৰদৰ্শন ফরাতে বাধ্য করতে পারে?
পোর্সিয়া বললেন, এখানে বাধ্য করার কোনও প্রশ্নই উঠছে না। দয়া জিনিসটা স্বতঃস্ফুর্ত। দুঃখীর দুঃখ হরণ, তাপিতকে শাস্তি দেওয়া, হিংসা ও ক্রোধের আগুনকে নিভিয়ে দেবার শক্তি একমাত্ৰ দয়াতেই আছে। রাজদণ্ডের চেয়েও এ অনেক বেশি ক্ষমতাশালী। দয়া যে করে এবং যে পায়, উভয়েই সমান সুখী হয়। কোনও সন্দেহ নেই আমরা সর্বদা ন্যায় বিচারের প্রশংসা করি। দয়ার স্পর্শে যখন ন্যায়ের কঠোরতা কোমল হয়ে আসে, তখন সেটাই হয়ে ওঠে ভগবানের মহৎ বিচার। আচ্ছা শইলক, দয়া প্রদর্শনের এমন সুযোগ পেয়ে তুমি কি তার সদ্ব্যবহার করতে চাও না?
