শাইলকের ধৈর্য আর বাঁধ মানে না। সে অধীর হয়ে বলে ওঠে, অতশত কথার ধার ধারি না আমি। আমায় বলুন। এ ব্যাপারে আদালতের রায় কী?
যেন হতাশ হয়েছেন এভাবে পোর্সিয়া বললেন, তাহলে আর কী হবে? এবার আপনি কি কিছু বলবেন আন্তনিও?
অবিচলিত কণ্ঠে বললেন আন্তনিও, আমার বক্তব্য এই যে এরূপ বেদনাদায়ক দৃশ্য যত তাড়াতাড়ি শেষ হয় ততই মঙ্গল। শাইলাক আমার প্রাণ না নিয়ে ছাড়বে না। আইন ওরই পক্ষে। কাজেই আইনমাফিক কাজ হোক। বন্ধু ব্যাসানিও, তুমি ভেব না যে আমি মরতে ভয় পাচ্ছি। আমার মতো নিজস্ব হয়ে অপরের গলগ্রহ স্বরূপ বেঁচে থাকার চেয়ে মৃত্যুই আমার কাম্য। গরিব লোকের কষ্টের শেষ নেই এ পৃথিবীতে — বিশেষ করে ধনী থেকে যে হঠাৎ গরিবে পরিণত হয়েছে। তার ভাগ্যে রয়েছে শুধু দুঃখ আর লাঞ্ছনা। আমার এটুকুই সাস্তুনা যে এসব থেকে আমি মুক্তি পেতে চলেছি। তুমি যে মনোমতো স্ত্রী পেয়েছ তাতে আমি খুবই খুশি হয়েছি। ঈশ্বরের কাছে আমার প্রার্থনা এই যে আমার মৃত্যু যেন তোমাদের বিবাহিত জীবনের সুখের পথে বাধা হয়ে না। দাঁড়ায়।
আন্তনিওর কথা শুনে চোখের জল আর বাধা মানে না ব্যাসানিওর। তিনি কান্নারুদ্ধ কণ্ঠে বলে ওঠেন, ঈশ্বর জানেন যে আমার স্ত্রী বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ নারীরত্ন। তোমাকে বাঁচাবার জন্য যদি তার মতো নারীরত্নকেও জীবনের মতো পরিত্যাগ করতে হয় তাতেও আমার কোনও দুঃখ নেই। ব্যাসানিওর খেদোক্তি শুনে হেসে মন্তব্য করলেন তরুণ আইনজীবী, আপনার পরম সৌভাগ্য যে এসময় আপনার স্ত্রী এখানে নেই। নইলে এতবড়ো উদারতা দেখাবার সাহস আপনি পেতেন না।
গ্রাসিয়ানোও বা কম যান কীসে। তিনি বললেন, স্বৰ্গে গিয়ে যদি আমার স্ত্রী দেবদূতদের অনুনয় করে তাদের হৃদয় এমনভাবে আদ্র করে দিতে পারতেন যাতে করুণাবশত তারা এই ইহুদিটার হৃদয় কোমল করে দিতে পারত, তাহলে এই মুহুর্তে স্ত্রীকে স্বৰ্গ পাঠাতেও আমার কোনও আপত্তি নেই।
এমন একটা মস্তব্যের জবাব না দিয়ে কি থাকতে পারে কেরানিরূপী নেরিসা, বাড়িতে স্ত্রীর সামনে বসে এরূপ মন্তব্য করলে এতক্ষণে আপনাদের মধ্যে ঝগড়া বেধে যেত।
এসব কথাবার্তাগুলি যেন শাইলকের কানে বিষ ঢালিছিল। সে নিজের মনে বলতে লাগল, খ্রিস্টান স্বামীরা সত্যিই অদ্ভুত ধরনের। এরচেয়ে আমার মেয়ে যদি একটা খুনে-ডাকাত ইহুদিকেও বিয়ে করত, তাহলে সুখী হবার সম্ভাবনা ছিল তার।
শাইলক প্রকাশ্যে রাগান্বিত স্বরে বলে উঠল, আজ কি আদালতের কোনও কাজ-কর্ম হবে না। এরূপ রসিকতা চলতে থাকবে? যদি কোনও কাজকর্ম নাই হয় তাহলে শুধু শুধু বসে থেকে লাভ কী? তার চেয়ে ভেনিসের আইনের গুণগান করতে করতে বাড়ি চলে যাওয়াই শ্রেয়।
অনন্যেপায় হয়ে বলে উঠলেন পোর্সিয়া, আদালত তাহলে এই রায় দিচ্ছে যে আন্তনিওর বুকের কাছ থেকে এক পাউন্ড মাংস কেটে নেবেন শাইলক ও ভালো কথা, আপনি কি একজন ডাক্তার সাথে নিয়ে এসেছেন শাইলক?
আশ্চর্য হয়ে বললেন শাইলক, ডাক্তার! আবার ডাক্তার কেন?
সাথে সাথেই জবাব দিলেন পোর্সিয়া, মাংস কেটে নেবার পর আন্তনিওর মৃত্যুর সম্ভাবনা রয়েছে। সেরূপ পরিস্থিতিতে ডাক্তারের সাহায্যের প্রয়োজন আছে বইকি।
শাইলক বললেন, কিন্তু দলিলের কোথাও তো লেখা নেই যে অস্ত্ৰোপচারের সময় ডাক্তার রাখতে হবে?
না, দলিলে অবশ্য তা লেখা নেই, বললেন পোসিয়া। তবে মানবতার খাতিরে আপনার একজন ডাক্তার রাখা উচিত।
ও সব মানবতা-ফানবতার কোনও দাম নেই। আমার কাছে–বললেন শাইলক, দলিল অনুযায়ীই কাজ হবে। ওহে আন্তনিও! তুমি প্ৰস্তুত তো! আমি এবার তোমার মাংস কাটব।
পোর্সিয়া বললেন, না, আর কিছু করার নেই। এবার শাইলক আন্তনিওর বুকের কাছ থেকে এক পাউন্ড মাংস কেটে নিতে পারেন, আইন তার পক্ষে। বাধ্য হয়ে আদালতকে সেই অনুযায়ী রায় দিতে হচ্ছে।
একটা চাপা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে উপস্থিত জনতার বুক থেকে। এ নিছক হত্যা হলেও তাকে আটকাবার কোনও ক্ষমতা নেই তাদের। আইনের বেড়াজালে তাদের হাত-পা বঁধা। নিস্তব্ধ সভাকক্ষে শুধু শোনা যাচ্ছিল শাইলকের ছুরিতে শান দেবার আওয়াজ। সবশেষে শোনা গোল শাইলকের কর্কশ স্বর, ওহে আন্তনিও! এবার প্রস্তুত হও।
এবার আন্তনিও আলিঙ্গন করলেন ব্যাসানিওকে। তারপর এগিয়ে গেলেন জামা খুলতে খুলতে। সাথে সাথে ছুরি হাতে উঠে দাঁড়ালেন শাইলাক–ছুরিতে আলো পড়ে তা ঝকঝাক করে ওঠে। হিংস্রতার একটা ছাপা পড়ে শাইলকের চোখে-মুখে।
হঠাৎ এ সময় বলে উঠলেন পোর্সিয়া, দাঁড়াও শাইলাক! একটা কথা আছে।
আবার কথা! বিরক্ত হয়ে ফিরে দাঁড়াল শাইলক। তার হাতের ধারালো ছুরির চোখে মুখে রক্তপিপাসা।
দলিলে যা নেই তা তো হবে না–বললেন পোর্সিয়া। নিশ্চয়ই তা হবে না–বিজয়ীর স্বরে বলল শাইলক। সহজ-স্বাভাবিক স্বরে বললেন পোসিয়া, দলিলে এক পাউন্ড মাংসের কথা লেখা আছে, কিন্তু কোথাও এক ফোটা রক্তের উল্লেখ নেই শাইলক।
পোর্সিয়ার এ কথায় মুহূর্তের মধ্যে নিস্তব্ধ হয়ে গেল আদালত-কক্ষ। মনে হল যেন সূচ পড়লেও তার শব্দ শোনা যাবে। এক মুহূর্ত সময় লাগল। জনতার এ কথাটা বুঝতে। তারপরই সমবেত উল্লাস্যধ্বনিতে ফেটে উঠল বিচার-কক্ষ। পোর্সিয়ার এই ছোট্ট কথাটার যে এত তাৎপর্য তা এতক্ষণে বুঝতে পেরেছে নাগরিকেরা।
