এবার ডিউক ডেকে পাঠালেন শাইলাককে। সে বিচারকক্ষে প্রবেশ করল। তার হিংস্র-কুটিল দৃষ্টি, ললাটের স্পষ্ট রেখা, কোমরে বাধা একটা লম্বা ছোরা — দেখে মনে হচ্ছিল ছোরাটা যেন আন্তনিওর রক্ত পানের জন্য উদগ্রীব হয়ে আছে।
শাইলককে উদ্দেশ করে ডিউক বললেন, এতদিন ধরে আমরা তোমার কাছে আবেদন জানিয়েছি, যাতে তুমি আন্তনিওর প্রতি করুণা প্ৰদৰ্শন কর। কিন্তু তুমি আমাদের সমস্ত আবেদননিবেদন রুক্ষভাবে অগ্রাহ্য করে স্পষ্টভাষায় জানিয়েছ আইন অনুযায়ী যেন আন্তনিওর শরীরের এক পাউন্ড মাংস কেটে তোমায় দেওয়া হয়। তুমি যে সত্যিই এত কঠোর হতে পার তা এখনও পর্যন্ত আমরা বিশ্বাস করে উঠতে পারিনি। আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস, বিশেষ একটা উদ্দেশ্য নিয়ে তুমি এরূপ নৃশংসতার ভান করছ। আর আমরা এও আশা করি যে চরম মুহুর্তে তুমি দয়া প্রদর্শন করে। বিস্ময়ে আমাদের হতবাক করে দেবে। এখন সেই চরম মুহূর্ত এসে গেছে। আর অপেক্ষা করার সময় নেই। তুমি যদি এখনও দয়া প্রদর্শন না কর, তাহলে বাধ্য হয়ে আদালতকে বলতে হবে যে আন্তনিওর দেহের এক পাউন্ড মাংস কেটে নেবার অধিকার তোমার রয়েছে। আমি নিজে এবং নগরবাসীদের পক্ষ থেকে তোমার কাছে মিনতি জানাচ্ছি। যদি সত্যিই তুমি দয়া দেখাতে চাও, তাহলে আর দেরি করোনা।
ডিউকের কথা শুনে খোঁকি কুকুরের মতো দাঁত বের করে বলতে লাগল শাইলক, কী বললেন, দয়া? বাস্তবে ও শব্দটার কোনও অস্তিত্ব আছে কি? আপনারা নিজেরা কখনও মমতা দেখিয়েছেন? বাজার থেকে টাকা দিয়ে কিনে আনা দাসদাসীদের প্রতি আপনারা কখনও দয়া দেখিয়েছেন–সদয় ব্যবহার করেছেন তাদের প্রতি? কঠোর পরিশ্রম করা সত্ত্বেও তারা পেট পুরে খেতে পায় না, শুতে পায় না। পশুর মতো জীবন যাপন করতে বাধ্য হয় তারা। হে ভদ্রমহোদয়গণ! আন্তনিওর প্রতি আমার মনোভাবও সেইরূপ। তিনহাজার ডুকাটি দিয়ে আমি ওর শরীরের এক পাউন্ড মাংস কিনেছি। এবার আমার পাওনাটা আমায় নিতে দিন–দেশের আইনের কাছে এটুকুই আমার আশা। কারণ এ দেশের আইনে ধনী-দরিদ্র, খ্রিস্টান-ইহুদিতে কোনও পার্থক্য নেই। —সবার সমান অধিকার! আমার পাওনা এক পাউন্ড মাংস আমি পেতে চাই। অনেকে জানতে চেয়েছেন মাংস দিয়ে আমি কী করব। সে আমি যাই করি না কেন, এরূপ অবাস্তর প্রশ্ন করার অধিকার আপনাদের কারও নেই।
এভাবে একটানা বলার পর কিছুক্ষণ ক্লান্ত হয়ে থামল শাইলক। আদালতে আন্তনিওর পাশেই দাঁড়িয়ে ছিলেন ব্যাসানিও। এই সুযোগে তিনি বলে উঠলেন, দেখ শাইলাক! তোমার পাওনা তিনহাজার ডুকাটের তিনগুণ অর্থ আমি তোমায় ফেরত দিচ্ছি। এই নাও সেই অর্থ। এবার বল অর্থহীন এক পাউন্ড মাংসের জন্য তুমি কি নয় হাজার ডুকাট ছেড়ে দেবে?
কর্কশ স্বরে উত্তর দিল শাইলক, একটা ইদুর আছে আমার বাড়িতে। সে আমার জামা-কাপড় কেটে ফেলে, খাবার-দাবার নষ্ট করে দেয়, এমনকি হাত-পাও কামড়ে দেয়। এই ইদুরটা না মরা পর্যন্ত আমার শান্তি নেই। ইদুরটাকে মারার জন্য প্রয়োজনে আমি বিশহাজার স্বর্ণমুদ্রাও দিতে রাজি। কারণ ইদুরটা বেঁচে থাকার অর্থই আমার মৃত্যু। ওই টাকাটা আমার জীবনের দাম — ইঁদুরের মাংসের দাম নয়।
বাধা দিয়ে আন্তনিও বললেন, কেন ওই জানোয়ারটার সাথে বাগবিতণ্ডা করে নিজেকে ছোটো করছি ব্যাসানিও? ও মানুষ হলে না হয় ওর কাছে মানবিকতার আবেদন করা যেত। ওর শরীরের মধ্যে যে আত্মা রয়েছে আমার মনে হয় সেটা নেকড়ের আত্মা।
নিজের কোমরে ঝোলানো ছোরাটায় হাত দিয়ে শাইলক বলল, এই নেকড়ের দাঁত যখন তোমার বুকে বিধবে, তখন আরও দৃঢ় হবে তোমার বিশ্বাস।এরপর ডিউককে সম্বোধন করে লালল, অযথা কেন সময় নষ্ট করছেন মহামান্য ডিউক? এবার তাড়াতাড়ি বিচারটা সেরে বাড়ি ফিরে যান, আর আমি বাড়ি গিয়ে বিশ্রাম করি।
ডিউক বললেন, পদুয়ার ডাক্তার বেলারিওকে আমি আমন্ত্রণ জানিয়েছিলাম বিচার চলাকালীন আইনের ব্যাখ্যা দেবার জন্য। কারণ এরূপ আশ্চর্যজনক মামলা ভেনিস তো দূরের কথা, পৃথিবীর কোনো আদালতেও বোধহয় আজ পর্যন্ত হয়নি। কাজেই খুব সাবধানতার সাথে বিচার করতে হবে। যে মামলার কোনও নজির নেই, সেখানে বিচারের সময় পদে পদে ভুল হবার সম্ভাবনা থেকে যায়। এজন্যই আমি ডেকে পাঠিয়েছি দেশের সর্বোচ্চ আইন বিশারদ বেলারিওকে। কেউ দেখত ডাক্তার বেলারিও আদালতে এসেছেন কিনা। যদি তিনি না এসে থাকেন, তাহলে তার অপেক্ষায় আজ আদালতের কাজ মুলতবি রাখতে বাধ্য হব আমি।
ডিউকের আদেশে একজন রক্ষী বেরিয়ে গেল। ডাক্তার বেলারিওর খোঁজে। শইলকও রেগেমেগে তার অসন্তোষ প্রকাশ করতে লাগল। কিছুক্ষণ বাদে রক্ষী ফিরে এল সাথে একজন যুবককে নিয়ে। যুবকটির বেশভূষা দেখলে মনে হয় সে কোনও আইনজীবীর কেরানি।
আসলে এই কেরানিটি হল ছদ্মবেশিনী নেরিস। বেলারিও দুটি পোশাক পাঠিয়েছিলেন বেলথাজারের মারফত। পোশাক দুটির মধ্যে একটি উকিলের এবং অপরটি মুহুরির। নেরিসার পরনে ছিল ওই মুহুরির পোশাক। সেই পোশাকে নোরিসাকে এমন মানিয়েছিল যে তার স্বামী গ্রাসিয়ানো পর্যন্ত তাকে চিনতে পারেননি।
ডিউককে সসম্রামে অভিবাদন জানিয়ে নেরিস বলল, হঠাৎ কঠিন অসুখে আক্রান্ত হয়ে পড়েছেন ডা. বেলারিও। সে কারণে মহামান্য ডিউকের আমন্ত্রণ সত্ত্বেও ভেনিসে আসতে পারেননি তিনি। পরিবর্তে একজন সুদক্ষ সহকারীকে পাঠিয়েছেন। ডিউককে সাহায্য করার জন্য। আইনবিষয়ক যে কোনও প্রশ্ন উনি সুন্দরভাবে সমাধান করে দেন। তার উপর যথেষ্ট আস্থা আছে ডা. বেলারিওর। তার বক্তব্য তিনি এই চিঠিতে জানিয়ে দিয়েছেন— বলেই বেলারিওর চিঠিটা ডিউকের সামনে পেশ করলেন নেরিসা।
