ডাক্তার বেলারিও একজন নামি আইনবিদ। জটিল মামলা পরিচালনার জন্য দেশ-বিদেশের নানা জায়গা থেকে ডাক আসে তার। তার মতামতকে প্রামাণ্য বলে মেনে নেওয়া হয় আইনঘটিত জটিল প্রশ্নে। শাইলক-আন্তনিও মামলায় সাহায্য করার জন্য সম্প্রতি তাকে নিয়োগপত্র দিয়েছেন। ভেনিসের ডিউক। সে ব্যাপারে যথেষ্ট পড়াশুনো করে ভেনিস যাত্রার আয়োজন করছেন বেলারিও। এমন সময় পোর্সিয়ার চিঠি নিয়ে বোলথাজার এসে হাজির তার কাছে।
পোর্সিয়ার চিঠি পড়ে খুবই অবাক হলেন বেলারিও। যদিও তিনি তার এই সুন্দরী আত্মীয়ার নানা খামখেয়ালের সাথে পরিচিত, কিন্তু এমন একটা ব্যাপার। তিনি স্বপ্নেও ভাবতে পারেননি। যাই হোক, পোর্সিয়ার অনুরোধ তিনি অগ্রাহ্য করতে পারলেন না। তিনি বেলথাজারের হাতে একপ্রস্থ করে উকিল ও মুহুরির পোশাক এবং আইনের বই দিয়ে দিলেন। তাছাড়া বোলথাজারের মারফত তিনি এ মামলার কাগজপত্রও যথাসময়ে পাঠিয়ে দিলেন পোর্সিয়ার কাছে।
মিরাজ নদীর খেয়াঘাটে পৌঁছে বোলথাজার দেখতে পেল সেখানে তার জন্য আগে থেকেই অপেক্ষা করছেন কর্ত্রী ঠাকুরানি। বেলথাজারের কাছে বেলারিওর দেওয়া জিনিসপত্রগুলি দেখে মনে কিছুটা স্বস্তি এল পোর্সিয়ার। তিনি তখনই নোরিসাকে নিয়ে ভেনিসে রওনা দিলেন।
সব দিক দিয়েই পোর্সিয়ার বিশ্বস্ত ছিল নোরিসা। সে পোর্সিয়ার কাছে জানতে চাইল, আচ্ছা! ঠাকুরানি, এত তোড়জোড় কীসের জন্য। আমি বুঝতে পারিছ না। এই পুরুষের পোশাকগুলি আমাদের কোন কাজে আসবে? আপনি যদি সবকিছু খুলে বলেন তাহলে স্বস্তি পাই। আর যদি সত্যিই আমাদের ভেনিসে যাবার প্রয়োজন হয়, তাহলে তো আমরা অনায়াসেই স্বামীদের সাথে যেতে পারি।
পোর্সিয়া উত্তর দিলেন, না, তা কোনও মতেই সম্ভব নয়। স্বামীরা আমাদের উদ্দেশ্য আগে থেকে জানতে পারলে সব কাজ পণ্ড হয়ে যাবে।
এবার অবাক হবার পালা নোরিসার। অনেক চাপাচাপির পর পোর্সিয়া বললেন, পুরুষের ছদ্মবেশে আমরা ভেনিসে চলাফেরা করব। –প্রয়োজনে ডিউকের বিচারকক্ষেও প্রবেশ করব –অবশ্য বেলারিওর প্রতিনিধি হিসেবে। আগে থেকে স্বামীরা এসব জানতে পারলে হয়তো উত্তেজনা বশে সবকিছু ফাস করে দেবেন। তখন আর কোনও সার্থকতা থাকবে না। এ ছদ্মবেশের। আমাদের আসল পরিচয় সবাই জেনে যাবে। আর মাঝপথে পণ্ড হয়ে যাবে আমাদের আসল কাজ।
নেরিস বলল, ধরে নেওয়া যাক স্বামীরা আমাদের গোপন রহস্য ভেদ করতে পারল না। তবুও কিন্তু ভয় রয়ে যায় তাদের চোখে ধরা পড়ার। কারণ নারী-পুরুষের আচরণের মধ্যে এমন স্বাতন্ত্র্য রয়েছে যা সহজে নজর এড়াবার নয়।
উত্তরে পোর্সিয়া বললেন, তোমার কথাটা যুক্তিসঙ্গত। কাজেই খুব সাবধানে চলাফেরা করতে হবে আমাদের। কোনও মতেই ধরা পড়া চলবে না। পুরুষদের মতো লম্বা লম্বা পা ফেলে হাঁটতে হবে। কারণ পুরুষদের পদক্ষেপে নারীদের চেয়ে অনেক বেশি জায়গা লাগে। হাত-পা ছুড়ে সব সময় চেঁচিয়ে কথা বলব আমরা — আলোচনার বিষয়বস্তু হবে শুধু লড়াই আর খুনোখুনি। কোমরে একটা লম্বা ছোরা ঝোলানো থাকবে। আর নানারূপ কাল্পনিক গল্প করব যার তার সাথে। শুনে সবাই ভাববে। এরা বোধহয় সবে স্কুলের গণ্ডি পার হয়েছে। কারণ শৈশব ছেড়ে যারা যৌবনে প্রবেশ করতে চলেছে তারাই সচরাচর এরূপ বাচাল হয়ে থাকে।
এভাবে নেরিসাকে উপদেশ দিতে দিতে শেষমেশ ভেনিসে এসে পৌঁছুল পোর্সিয়া। সেখানে তার নিজের এবং আত্মীয়-স্বজনদের বাড়িও ছিল। কিন্তু সেগুলির কোনওটাতে না উঠে আশ্রয় নিলেন এক অভিজাত হোটেলে। সেখান থেকেই তারা শাইলক বনাম আন্তনিও মামলার খবরাখবর নিতে লাগলেন। রাস্তায় দু-এক বার ব্যাসানিও এবং গ্রাসিয়ানোর সাথে দেখাও হয়ে গেল। কিন্তু তারা নিজ নিজ পত্নীকে চিনতে পারলেন না। আর এরাও তাদের পরিচয় গোপন করলেন।
০৫.
ভেনিসের সর্বোচ্চ আদালত আজি লোকে লোকরণ্য। বিচারাসনে বসে রয়েছেন স্বয়ং ডিউক। দর্শকদের জন্য নির্দিষ্ট আসনে বসে রয়েছেন ভেনিসের বিশিষ্ট নাগরিকেরা। তাদের সবার মুখে রয়েছে বিষন্নতার ছাপ। শ্যইলক আগেই খোলাখুলি জানিয়ে দিয়েছে — ভেনিসের আইন যে শুধুমাত্র মুখের কথা নয়, প্রকৃতই আইন তা দেখতে চাই আমি। আইন অনুযায়ী আমি আন্তনিওর এক পাউন্ড মাংসের অধিকারী। তা না পেলে আমি মনে করব এখানকার আইন আইন নয়— শুধু প্ৰহসন মাত্র। আর পৃথিবীর লোকেরাও এটা স্বীকার করবে এক কথায়।
ভেনিসের পক্ষে সত্যিই এ খুব সাংঘাতিক কথা। কারণ সারা পৃথিবী জুড়েই ভেনিসের সাথে ব্যবসায়িক সম্পর্ক রয়েছে। আর নানা কারণে ভেনিসের লোকদেরও পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে গিয়ে দীর্ঘদিন বাস করতে হয়। সে কারণে ভেনিসের ন্যায়পরায়ণতার প্রতি বিদেশির আস্থা না থাকলে তারা এখানে আসতে চাইবে না এবং এখানকার লোকেরাও বিদেশে গিয়ে ঘৃণা এবং পরিহাসের পাত্ৰ বলে বিবেচিত হবে। সুতরাং ব্যবসা-বাণিজ্যও ক্ষুন্ন হবে। এ কথা মনে রেখে ভেনিসীয় আইনে এখানকার বাসিন্দা এবং বিদেশির জন্য সমান নাগরিক অধিকারের ব্যবস্থা করা হয়েছে। কাজেই কোনও অজুহাতেই শাইলকের দাবি অগ্রাহ্য করার ক্ষমতা নেই বিচারকর্তাদের।
আন্তনিওকে ডেকে এনে গভীর সমবেদন জানালেন ডিউক। আন্তনিও তার উত্তরে বললেন, মাননীয় ডিউক! আপনার দয়া তুলনাহীন। আমি শুনেছি আমার মতো একজন সামান্য ব্যক্তির প্রাণরক্ষার জন্য আপনি স্বয়ং আবেদন করেছেন শাইলকের কাছে। শুধু আপনি কেন, নগরবাসীরাও সমবেতভাবে ওই ইহুদির কাছে আমার জন্য করুণা ভিক্ষা করেছে। কিন্তু কিছুতেই কিছু হয়নি। যার হৃদয়ে দয়া বস্তুটার অভাব, তার কাছে দয়া ভিক্ষা করে লাভ কী? আমার ভাগ্যে যা আছে তাই হবে। আপনি ও নগরবাসীরা আমার জন্য যা করেছেন। সেজন্য আপনাদের প্রতি শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি।
