আন্তনিও কিন্তু মোটেও ভয় পাননি। শুরু থেকেই তিনি বলতেন, ইহুদিটা যতই পাপিষ্ঠ হোক না কেন, সে আমার কোনও ক্ষতি করতে পারবে না। কারণ আমরা তিনমাস সময় পাচ্ছি। আর দুমাসের মধ্যেই জাহাজগুলি বাণিজ্য সম্ভারে বোঝাই হয়ে বন্দরে ফিরে আসবে। অতএব ওই ভয়ানক প্ৰস্তাবের খপ্পরে পড়ার কোনও আশঙ্কা আমার নেই। এতে যদি আমরা ভয় পেয়ে ধার না নিই, তাহলে কোনওদিনই তোমার পক্ষে বেলমন্ট যাওয়া সম্ভব হবে না। পোর্সিয়াকে পাবার কোনও চেষ্টাই তুমি করতে পারবে না। কাজেই ওই শর্তে ধার নেওয়া ছাড়া আমাদের আর কোনও উপায় রইল না।
এভাবে সমস্ত ঘটনা ব্যক্ত করে ব্যাসানিও বলতে লাগলেন, আন্তনিওর দৃঢ়তার ছোয়াচ এসে লাগল আমার হৃদয়েও — রাজি হয়ে গেলাম আমি। দলিল তৈরি হবার পর তাতে সই করে তিন হাজার ডুকাট ধার নিলেন আমার বন্ধু। সেই টাকার জোরে আজ আমি স-পারিষদ তোমার সামনে দাঁড়িয়ে। ভগবান এখানে সদয় হয়েছেন আমার প্রতি। আমি পেয়েছি তোমাকে। কিন্তু অন্যদিকে হেরে গেছি আমি। আমার মাথায় যেন বিনা মেঘে বজ্ৰপাত হয়েছে। পাপিষ্ঠ শাইলকের অভিযোগে আজ কারারুদ্ধ হয়েছেন বন্ধু আন্তনিও।
ব্যাকুল স্বরে জানতে চাইলেন পোর্সিয়া, কীভাবে এমনটি হল? তার এতগুলি জাহাজ…?
নৈরাশ্যজনিত স্বরে জবাব দিলেন ব্যাসানিও, তার এতগুলি জাহাজের একটিও ফিরে আসেনি বন্দরে। সমুদ্রে যেতে যেতে কোনটি জলে ডুবেছে, কোনটি জলদসু্য লুট করেছে আবার কোনটি বা ঝড়ের দাপটে অদৃশ্য হয়ে গেছে অজানা সমুদ্রে। তিনমাস আগে যিনি ছিলেন কোটি কোটি টাকার মালিক, আজ তিনি সম্পূর্ণ নিঃস্ব। ধার শোধ দেবার ক্ষমতা নেই তার। এদিকে দলিল অনুযায়ী তিনমাস শেষ হয়ে গেছে।
পোর্সিয়া বললেন, তিনি তো মাত্র তিনহাজার ডুকাটি ধার নিয়েছেন। ওই টাকাটা আমরা শোধ দিয়ে দিলেই তো ইহুদি বাধ্য হবে তাকে ছেড়ে দিতে।
কাছেই দাঁড়িয়েছিলেন স্যালোরানো। তিনি বিমৰ্ষভাবে বললেন, কিন্তু মহোদয় তা সম্ভব নয়। ভেনিসের বণিকেরা সবাই চান্দা করে ওই টাকাটা শোধ দিতে চেয়েছিল। কিন্তু তাতে রাজি নয় শাইলক। তার বক্তব্য দলিলের মেয়াদ শেষ হবার দরুন সে টাকা নেবে না। শাস্তি স্বরূপ দলিলে যে শর্তের উল্লেখ আছে এখন সে তাই চায় অর্থাৎ আস্তোনিওর বুকের একপাশ থেকে এক পাউন্ড মাংস কেটে নেবে সে।
আশ্চর্য হয়ে পোর্সিয়া বললেন, সে কী কথা? মানুষ এমন নৃশংস হতে পারে যে দেনার দায়ে কারও শরীর থেকে মাংস কেটে নেবে? আমার মনে হয়। ভয় দেখিয়ে বেশি টাকা আদায়ের মতলবে আছে সে। যাই হোক, তুমি এখন ভেনিসের পথে রওনা দাও ব্যাসানিও। আমি তোমাকে প্রচুর অর্থ দিচ্ছি। যত টাকাই লাগুক, তুমি শাইলককে তা দিয়ে আন্তনিওকে মুক্ত করে আনবে। আমি আর তুমি অভিন্ন। কাজেই আমার টাকা তুমি তোমার বন্ধুর জন্য ব্যয় করবে তাতে আর আশ্চর্য হবার কী আছে। বরঞ্চ সেটা না করলেই অন্যায় হবে। তোমার জীবনের সুখ-সমৃদ্ধি যদি আস্তানিওর বিনিময়ে ক্রয় করতে হয়, তাহলে কোনও দিন সুখী হবেন না তুমি।
স্থির হল সেই মুহূর্তে ব্যাসানিও ও পোর্সিয়া এবং স্যালারিনো ও নেরিসা — গির্জায় গিয়ে অনাড়ম্বরভাবে বিয়েটা সেরে ফেলবেন। বিয়েটা তো আগে হয়ে যাক, জাকজমকের কথা পরে ভাবা যাবে। বিয়ের পর আর দেরি না করে ব্যাসানিও চলে যাবেন ভেনিসে — সাথে থাকবে শুধু গ্রাসিয়ানো আর প্রচুর অর্থ।
এভাবেই সব কিছু নির্বিঘ্নে সমাধা হয়ে গেল। গ্রাসিয়ানোকে সাথে নিয়ে ব্যাসানিও রওনা হলেন ভেনিসের পথে। তার বন্ধু-বান্ধব ও সহচরেরা সবাই রয়ে গেল বেলমন্টের প্রাসাদে। এদের মধ্যে ছিল লোরেঞ্জো এবং তার নব বিবাহিতা পত্নী শাইলকের কন্যা জেসিকা।
ব্যাসানিও চলে যাবার পর লোরেঞ্জো ও জেসিককে ডেকে বললেন পোর্সিয়া, তোমাদের কাছে আমার একটা অনুরোধ আছে। যদি তোমরা সেটা রক্ষা কর, তাহলে খুবই উপকার হবে আমার।
এক কথায় রাজি হয়ে গেলেন তাঁরা দুজনে।
পোর্সিয়া বলতে লাগলেন, আমি স্থির করেছি। যতদিন পর্যন্ত আমার এবং নেরিসার স্বামী ফিরে না আসেন ততদিন পর্যন্ত দু-মাইল দূরের একটা মঠে গিয়ে আমরা ভগবানের কাছে প্রার্থনা করব যেন আমাদের স্বামীরা নিরাপদে ফিরে আসেন। আমি চাই ততদিন পর্যন্ত তোমরা এই গৃহস্থলীর ভার নাও। তোমাদের দুজনকে আমার লোকজনেরা প্ৰভু ও প্রভুপত্নী বলে মেনে নেবে। আশা করি এতে তোমাদের কোনও আপত্তি নেই।
ওদের আপত্তি করার কীই বা আছে? নিরাশ্রয় অবস্থায় অযাচিতভাবে এরূপ একটা সুযোগ পেয়ে যাওয়ায় ওরা তো বর্তে গেল।
কর্মচারী আর দাস-দাসীদের সবাইকে ডেকে পোর্সিয়া জানিয়ে দিলেন তার আদেশ; তারপর তিনি তার নিজের ঘরে গিয়ে একটি চিঠি লিখলেন। চিঠিটাতে মোহর এটে তিনি বোলথাজার নামে একজন পুরোনো চাকরকে ডেকে গোপনে তাকে চিঠিটা দিলেন। এভাবে তাকে নির্দেশ দিলেন :
ডাক্তার বেলারিও নামে আমার এক আত্মীয় আছেন পাদুয়া নগরে। তিনি আইনের ডাক্তার। তার কাছে তুমি এই চিঠিটা নিয়ে যাবে। কিছু কাগজপত্র ও পোশাক তিনি তোমাকে দেবেন। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব তুমি সেগুলি আমার কাছে নিয়ে আসবে। পথে কোথাও দাঁড়াবে না। বেগবান ঘোড়ায় চড়ে তুমি যাবে আর আসবে। তোমার জন্য আমি অপেক্ষা করব মিরাজ নদীর খেয়াঘাটে। ওই কাগজপত্র ও পোশাকগুলি তুমি সেখানে আমায় দেবে। আমার অনুরোধ, ব্যাপারটা যেন গোপন থাকে।
