সবার মুখে এক কথা–শাইলক যত চড়া সুন্দই চাক না কেন, নগরবাসীরা সবাই চান্দা তুলে মিটিয়ে দিতে প্ৰস্তুত আন্তনিওর ঋণের টাকা, শুধু আন্তনিওকে বীচার অধিকার দিতে হবেশাইলাককে। বুকের পাশ থেকে এক পাউন্ড মাংস কেটে নিলে আর কি কেউ বাঁচার আশা করে?
কিন্তু শইলক তার শর্তে অনড়। আন্তনিওকে শিক্ষা দেবার এমন সুযোগ সে হাতছাড়া করতে রাজি নয়–তা সে নাগরিকবৃন্দ ও ডিউক যতই অনুরোধ করুক না কেন তাকে।
শাইলক কি আর তাদের ধার ধারে?
রূঢ় ভাষায় সে সবাইকে তিরস্কার করে বিদায় দিয়েছে।
একদিন শাইলক কয়েদখানার সামনে দিয়ে যাচ্ছে। কারারক্ষক দেখতে পেল তাকে। সে তখনই আন্তনিওকে কারাগার থেকে বাইরে নিয়ে এল। — উদ্দেশ্য আন্তনিও নিজে একবার মিনতি জানাক শাইলকের কাছে। তাতে হয়তো শাইলক দয়া করতে পারে তাকে, হয়তো চক্ষুলজ্জাও বোধ করতে পারে।
কিন্তু আন্তনিওকে কারাগারের বাইরে দেখতে পেয়ে বেজায় রেগে ওঠে শাইলক। সে কারাধ্যক্ষকে তিরস্কার করে বলতে থাকে, এই তোমার কাজের নমুনা? এভাবেই সরকারি কাজ করবে তুমি? ও পালিয়ে গেলে তো আমার পাওনা টাকার দফা-রফা। এভাবেই কি তোমরা আইনের মর্যাদা রাখবো?
তাকে শান্ত করার চেষ্টা করে আন্তনিও বলতে লাগলেন, না, না, শাইলক, এ ভদ্রলোকের কোনও দোষ নেই। আমি পালাব না। শুধু তোমাকে দুটো কথা বলার জন্য আমি ওর অনুমতি চেয়েছিলাম। উনি দয়া করে আমায় সে অনুমতি দিয়েছেন।
শাইলক দাঁত খিচিয়ে জবাব দিল, কী বললে, দুটো কথা? তোমার সাথে কোনও কথা বলতে রাজি নই আমি। মনে নেই, রিয়ালতো পুলের উপর দাঁড়িয়ে সমস্ত বণিকদের সামনে তুমি কতবার আমায় কুকুর বলে গালাগাল দিয়েছ? কুকুরের সাথে মানুষের কোনও কথা থাকতে পারে না। সুযোগ পেলে মানুষ কুকুরকে লাথি মারে তেমনি কুকুরও সুযোগ পেলে মানুষের পায়ে দাঁত বসিয়ে দেয়–এই হল উভয়ের সম্পর্ক। তোমার অনেক লাথি হজম করেছি আমি। এবার তুমি প্ৰস্তুত হও আমার কামড় খাবার জন্য। তোমার কোনও কথা আমি শুনব না। তোমার প্রতি কোনও দয়া নেই। আমার।
এরমধ্যে নাগরিকরা এসে ভিড় জমিয়েছেন সেখানে। আন্তনিওর বন্ধু স্যালারিনোও রয়েছেন তাদের মাঝে আন্তনিও তাকে অনুরোধ করলেন সে যেন বোলমন্টে গিয়ে ব্যাসানিওকে এ ব্যাপারে জানায়। বন্ধুর জন্য আজ তার জীবন বিপন্ন। এ নিয়ে মনে কোনও ক্ষোভ নেই আন্তনিওর। তিনি শুধু এইটুকু চান ব্যাসানিওকে যেন জানিয়ে দেওয়া হয় তার প্রতি কোনও অভিমান বা রাগ নেই আন্তনিওর।
কারারক্ষক বাধ্য হল আন্তনিওকে কারাগারে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে। আর দেরি না করে স্যালারিনো রওনা দিলেন বেলমন্ট অভিমুখে। রাস্তায় তার সাথে দেখা হয়ে গেল লোরেঞ্জো ও জেসিকার। তিনি তাদের সাথে নিয়ে উপস্থিত হলেন পোর্সিয়ার প্রাসাদে।
হঠাৎ যেন নিভে গেল বেলমন্টের আনন্দ-আসরের সব আলো। প্রিয় বন্ধুর এই বিপর্যয়ে দারুণ মর্মাহত হল ব্যাসানিও। পোর্সিয়ার মতো দুর্লভ নারীরত্ন প্রাপ্তিও তার কাছে শূন্যগর্ভ পরিহাস বলে মনে হতে লাগল। আন্তনিওর ছোট্ট চিঠিটা পড়তে পড়তে বেদনায় স্নান হয়ে গেল তার মুখ, বুকের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসতে লাগল ঘন ঘন দীর্ঘশ্বাস। কিছুক্ষণ আগে যে চোখে ছিল আনন্দের আভা, এখন সেখানে দেখা দিল অশ্রু।
স্বামীর এই অবস্থা দেখে তার কারণ জানতে চাইলেন পোর্সিয়া। আন্তনিওর চিঠিটা তাকে পড়ে শুনিয়ে ব্যথিত কণ্ঠে বললেন ব্যাসানিও, বন্ধুভাগ্যের দিক দিয়ে আমি ছিলাম পৃথিবীর মধ্যে সবচেয়ে ভাগ্যবান ব্যক্তি। সে সৌভাগ্য থেকে আমায় বঞ্চিত করলেন নিষ্ঠুর নিয়তি। আন্তনিও মারা গেলে আমার জীবনটাও দুর্বিষহ হয়ে উঠবে। এমনকি তোমার মতো নারীরত্ন পাওয়াটাও সুখী করতে পারবে না আমায়।
সমবেদনার স্বরে বললেন পোর্সিয়া, ব্যাপারটা তুমি আমার খুলেই বল না যাতে আমি সবকিছু বুঝতে পারি। তুমি তো জান আমি তোমার স্ত্রী। তোমার সুখ-দুঃখের অংশীদার। আমি-সবকিছু জানার আমার অধিকার আছে। তুমি আমার কাছে কিছু লুকিও না।
ব্যাসানিও তখন তার জীবন-বৃত্তান্ত বলতে শুরু করলেন পোর্সিয়াকে–দেখ পোর্সিয়া, আমি তোমায় আগেই বলেছি। বর্তমানে আমার কাছে কোনও অর্থ-সম্পদ নেই। এই যে এত জাকজমকের সাথে বন্ধু ও পরিচারক পরিবেষ্টিত হয়ে ভেনিস থেকে বোলমন্টে আসতে পেরেছি তা শুধু ধারের টাকায়। আমার নিজের কোনও টাকা-পয়সা নেই। ভেনিসে আমার যত প্রভাবপ্রতিপত্তি থাক না কেন, সেখানে এমন কেউ নেই যে আমাকে টাকা ধার দেবে। তাই আমার বন্ধু আন্তনিও আমার জামিন হয়েছেন। ভেনিসের নামি বণিকদের মধ্যে তিনি অন্যতম। তার অন্তত এক ডজন জাহাজ সর্বদাই সমুদ্রে ঘুরে ফিরে বিদেশের সাথে ব্যবসা-বাণিজ্যে রত। কিন্তু সে সময় তার কাছে কোনও নগদটাকা ছিল না। তাই তিনি আমায় বললেন, বন্ধু, তুমি টাকা ধার নেবার ব্যবস্থা কর। খালি হাতে কেউ তোমায় টাকা না দিলে আমি নিজে তোমার জামিন হব। আমি জামিনদার হলে কেউ তোমায় তিনহাজার ডুকাট দিতে আপত্তি করবে না। দুৰ্ভাগ্যক্রমে সে সময় প্রতিটি বণিকের জাহাজই বাইরে বাইরে ঘুরছিল। সেগুলি ফিরে না আসা পর্যন্ত কারও হাতে নগদ টাকা নেই। কোথাও মিলছে না তিনহাজার ডুকাট। এ সময় আমাদের সাহায্যে এগিয়ে আসেন শাইলক নামে এক ইহুদি মহাজন। সে কিন্তু আমার কাছ থেকে কোনও দলিল নিতে আগ্রহী ছিল না। তার বক্তব্য এই যে দলিলটা সম্পাদন করতে হবে আন্তনিওকে। আমার জন্য আন্তনিও তাতেও রাজি হয়ে গেলেন। তখন এক অদ্ভুত প্ৰস্তাব দেয় শাইলক। সে বিনাসুদে আন্তনিওকে টাকা দেবে। যদিও সেটা তার আচরণের পরিপন্থী। সুদ সে নেবে না। কিন্তু তার পরিবর্তে দলিলে অদ্ভুত একটা শর্ত রাখতে চাইল শাইলক। শর্তটা হল তিনমাসের মধ্যে আন্তনিও ধার শোধ দিতে না পারলে তার বুকের পাশ থেকে এক পাউন্ড মাংস কেটে নেবে শাইলক। এরূপ নৃশংস শর্তে টাকা ধার নেবার ঘোরতর বিরোধী ছিলাম আমি। তোমাকে পাবার জন্য বন্ধুকে এরূপ বিপদের মুখে ঠেলে দেওয়াটা সঙ্গত মনে করিনি আমি। আমি তাকে বলেছিলাম, বন্ধু, আমি বেলমন্ট যাবার সংকল্প ত্যাগ করছি। শাইলক যে কেমন ভয়ানক লোক তা আমরা উভয়ে জানি। আমার মোটেই সাহসে কুলোয় না। তার সাথে এরূপ শর্তে কারবার করতে।
