ব্যাসানিও হেসে বলল, এতো ভালো কথা। কিন্তু পাত্রী কই? বিয়ে করতে গেলে তো পাত্রীর দরকার, আর তারও সম্মতির প্রয়োজন।
গ্রাসিয়ানো বলল, সে সব ঠিক হয়ে আছে। এই সামান্য সময়ের মধ্যে আমি নোরিসার সাথে একটা বোঝাপড়া করে ফেলেছি। ও বলেছে ব্যাসানিও যদি পোর্সিয়াকে লাভ করতে সক্ষম হন, তাহলে আমাকে বিয়ে করতে তার কোনও আপত্তি নেই। এবার তাহলে দুটো বিয়েই এক সাথে হয়ে যাক?
পোর্সিয়া নোরিসার কাছে জানতে চাইলেন গ্রাসিয়ানোর কথা সত্য কিনা। ঘাড় নেড়ে সায় দিল নেরিসা। সবার আনন্দের মাত্রা আরও বেড়ে গেল।
ব্যাসানিও বললেন, একই দিনে একই গির্জায় দুটো বিয়ে সম্পন্ন হবে। বিশাল প্রাসাদ আনন্দকোলাহলে মুখরিত হয়ে উঠল।
কিন্তু কেউ জানত না এত শিগগির বিষাদের ছায়া নেমে আসবে আনন্দের উপর।
এদিকে আসতে দেখা গেল লরেঞ্জো, জেসিকা আর স্যালারিনোকে। তারা একটা ভীষণ দুঃসংবাদ বয়ে নিয়ে এসেছেন ভেনিস থেকে। ব্যাসানিওর হতে একটি চিঠি দিলেন স্যালারিনো। চিঠিটা পড়তে পড়তে কালো হয়ে উঠল ব্যাসানিওর মুখ। মাঝে মাঝেই তিনি শিউরে উঠছিলেন।
পোর্সিয়া জানতে চাইলেন চিঠিটা কীসের। তিনি এখন ব্যাসানিওর ধর্মপত্নী। কাজেই তার ভালো-মন্দ, সুখ-দুঃখের অংশীদার তিনিও।
ব্যাসানিও সবকিছু খুলে বললেন পোর্সিয়াকে — জানালেন শাইলকের কাছে আন্তনিওর ঋণের কথা — যে ঋণের টাকা দিয়ে ব্যাসানিও আজ আসতে পেরেছেন বোলমন্টে। তিনি চিঠির বিষয়বস্তু জানালেন পোর্সিয়াকে। তিনমাস পার হবার পরও আন্তনিওর একটি জাহাজও ফিরে আসেনি। দলিলের বলে পিশাচ শাইলক গ্রেফতার করিয়েছে আন্তনিওকে। সে ডিউকের কাছে প্রার্থনা জানিয়েছে আন্তনিওর বুকের একপাশ থেকে এক পাউন্ড মাংস যেন তাকে কেটে নেবার অনুমতি দেওয়া হয়।
বোলমন্টের রৌদ্রোজুল আকাশ যেন ছেয়ে গেল দুর্যোগের ঘন মেঘে।
০৪.
চিরকাল কারও একভাবে যায়না। সেরূপ আন্তনিওর ভাগ্যও হঠাৎ আচ্ছন্ন হয়ে গেছে দুর্যোগের ঘন মেঘে। তিনমাস আগে তার যেসব জাহাজগুলি নানা সমুদ্রে বিচরণ করছিল, তাদের একটিও ফিরে আসেনি বন্দরে। কোনও জাহাজ হয়তো চিন-সমুদ্রের ডুবোপাহাড়ে ধাক্কা লেগে জলমগ্ন হয়ে গেছে, কোনটি হয়তো জলদস্যুদের হাতে আটকা পড়েছে বার্বারির উপকূলে, আবার কোনোটি হয়তো বিষুব ঝড়ের তাড়নে ছুটতে ছুটতে কোন গভীর সমুদ্রে অদৃশ্য হয়ে গেছে তা কে জানে। কাজেই যে কুবেরের ভাণ্ডার তার হাতে আসার কথা ছিল, সে সবই গ্রাস করে নিয়েছেন বরুণ দেবতা। ফলে তিনি নিঃস্ব হয়ে বাধ্য হয়েছেন পিশাচ শাইলকের দয়াপ্রার্থী হতে।
বন্ধু ব্যাসানিওর বেলমন্ট যাত্রার ব্যবস্থা করতে আন্তনিও তার ব্যক্তিগত জামিনে তিন হাজার ডুকাট ধার নিয়েছেন শাইলকের কাছ থেকে। চড়া সূদ দিতে রাজিছিলেন আন্তনিও। কিন্তু সততার অভিনয় করে ধূর্ত শাইলক তাকে বিনা সুদেই ধার দেয়, শুধু শর্ত থাকে ধার শোধ দিতে না পারলে আন্তনিওর দেহের যে কোনও জায়গা থেকে এক পাউন্ড মাংস কেটে নেবে শাইলক। প্রথম থেকেই অবশ্য ব্যাসানিও আপত্তি করেছিলেন শর্তটিার সম্বন্ধে। কিন্তু তাতে ক্ষোভের ভান করে। পাপিষ্ঠ শাইলক বলেছিল, দেখেছ, কীরূপ সন্দেহপরায়ণ এই খ্রিস্টানেরা! যেহেতু ওরা খারাপ, তাই বিশ্বসুদ্ধ লোককেই খারাপ ভাবে ওরা। আরে! আমি কি সত্যি সত্যিই আন্তনিওর শরীরের মাংস কেটে নেব? মানুষের মাংস কি খাওয়া যায়? ওদিয়ে আমার কী হবে? আমি শুধু দেখতে চাইছিলাম। আমার উপর তোমাদের আস্থা আছে কিনা। যদি আস্থা না থাকে, তাহলে আমার সাথে কারবার করো না।
কিন্তু কোনও আপত্তিতেই কান দেয়নি আন্তনিও। সে বলেছিল, দলিলে তো তিনমাস সময় দেওয়া রইল। আর দু-মাসের মধ্যেই ফিরে আসবে আমার সমস্ত জাহাজগুলি। অন্তত একটা জাহাজ ফিরে এলেও আমি হাসতে হাসতে শোধ দিতে পারব শাইলকের দেন। তাছাড়া আমাদের হাতে দু-মাসের পরিবর্তে সময় রয়েছে তিন মাস। কাজেই কোনও চিন্তা নেই।
কিন্তু বিধির বিধান খণ্ডাবে কে? যেখানে ভয়ের লেশমাত্রও ছিল না। সেখানে আজ ভীষণ ভয়ের সৃষ্টি হয়েছে। তিনমাস কেটে গেল, অথচ আজও ধার শোধ দেওয়া হল না। তার স্বজাতি ত্যুবলের সাথে পরামর্শ করে শাইলক আগে থেকেই সরকারের কাছে দরখাস্ত জমা দিয়ে সব কাজ গুছিয়ে রেখেছিল। সময় পার হবার ঠিক শেষ মুহুর্তেই হঠাৎ সরকারি পেয়াদা এসে দেনার দায়ে গ্রেফতার করল আন্তনিওকে।
আন্তনিওর বিচার হবে ডিউকের আদালতে শাইলক প্রার্থনা জানিয়েছে দলিলের শর্ত অনুযায়ী আন্তনিওর বুকের কাছ থেকে এক পাউন্ড মাংস কেটে নেবার অনুমতি দেওয়া হোক তাকে।
ব্যাপার-স্যাপার দেখে বেজায় চমকে গেল ভেনিসবাসীরা আন্তনিওকে যেমন সবাই আন্তরিক ভালোবাসত, তেমনি শাইলককে ঘৃণা করত না এমন লোক সেদেশে বিরল। সেই পাষণ্ড ইহুদির কাছে যারা ঋণী ছিল, তারা প্রকাশ্যে নিন্দা না করলেও মনে মনে অভিশাপ দিতে লাগল তাকে। কিন্তু সে অভিশাপে শাইলকের আর কি ক্ষতি হবে? কারণ আইন তার পক্ষে আর ভেনিসিও আইন অনুযায়ী খ্রিস্টান ও ইহুদিদের মাঝে কোনও পার্থক্য নেই।
যে শর্ত দলিলে রয়েছে তার অন্যথা হবার উপায় নেই। ডিউক ইচ্ছে করলেও আন্তনিওকে সাহায্য করার কোনও পথ তার সামনে খোলা নেই। একমাত্র শাইলক মুখ না খুললেই এ অবস্থা থেকে পরিত্ৰাণ পাওয়া যেতে পারে। তবে এ যাত্রায় আর রক্ষা নেই আন্তনিওর। শহরের প্রধান প্রধান ব্যক্তিরা একযোগে হত্যে দিয়ে পড়লেন শাইলকের দুয়ারে। স্বয়ং ডিউকই বিশেষভাবে অনুরোধ করলেন।
