সে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হবে ব্যাসানিওকে। নইলে পোর্সিয়ার সাথে তার বিয়ের বিন্দুমাত্র সম্ভাবনা নেই।
এক একবার পোর্সিয়ার মনে লোভ হচ্ছে ব্যাসানিওকে আধারগুলির প্রকৃত রহস্য জানিয়ে দিলেই তো হয়। তার প্রতিকৃতি কোন আধারের মধ্যে রয়েছে তা তো পোর্সিয়ার অজানা নয়। সে একটু ইঙ্গিত দিলেই এই মুহুর্তে সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে।কিন্তু পরীক্ষণেই সে মন থেকে দূর করে দেয় এ প্রলোভনকে। কারণ তাতে মৃত পিতার প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করা হবে। নাঃ, তার দ্বারা এ কাজ মোটেও সম্ভব নয়। এর জন্য যদি তার জীবনটা ব্যর্থ হয়ে যায় তাও সে মেনে নিতে রাজি।
তাই চটজলদি পরীক্ষার ব্যাপারটা সমাধা করতে হবে। তারপর ভাগ্যে যদি মিলন থাকে তো হবে, নইলে চিরদিনের মতো বিরহ যাতনা। অনিশ্চায়ের আগুন তো অন্তত নিভে যাক।
ব্যাসানিওকে নিয়ে পরীক্ষার ঘরে এলেন পোর্সিয়া; আজকের মতো আর কোনও দিন সন্দেহ আর আশঙ্কায় কেঁপে ওঠেনি তার হৃদয়।
ব্যাসানিওর সামনে ধীরে ধীরে সরে যেতে লাগল রেশমি পর্দা। চোখের সামনে ভেসে এল তিনটি ধাতু-নির্মিত আধার, যার একটির ভেতর রয়েছে পোর্সিয়ার প্রতিকৃতি। কোথা থেকে যেন ভেসে আসছে সুমধুর সংগীত আর সে সংগীতের কী চমৎকার বাণী।
গান শুনতে শুনতে বলছেন ব্যাসানিও, বাহ্যিক দৃশ্যের মূল্য কতটুকু? পৃথিবীর লোকেরা তো চিরকালই প্রতারিত হয়েছে বাইরের চাকচিক্য দেখে। আইনের কথাই ধরা যাক না কেন। মামলার মধ্যে হয়তো কিছু নেই, কিন্তু উকিলের জোরালো বক্তৃতার ফলে এর অন্তঃসারশূন্যতা কারও চোখে পড়ে না। যদি কোনও প্রধান আচার্য বাইবেল থেকে পাঠ করে তার পৃষ্ঠপোষকতা করে, তাহলে ধর্মীয় মতবাদকেও পৃথিবীতে প্রতিষ্ঠিত করা যায়। যে কোনও পাপকে পুণ্যের আবরণে মুড়ে চালিয়ে দেওয়া যায়। কাজ না করেও কোনও কাপুরুষ লোক হারকিউলিসের মতো বলবান বলে প্ৰতিভাত হতে পারে।
কাজেই ওই একই কারণে আমি সোনা ও রুপো–দুটোকেই উপেক্ষা করব। কারণ ওই তুচ্ছ সিসের দুৰ্নিবার আকর্ষণ আমায় টানছে। ওর উপর উৎকীর্ণ লিপিকে প্রতিশ্রুতি তো নয়ই, বরঞ্চ সতর্কবাণী রূপে গ্ৰহণ করা যেতে পারে। ওর বিবর্ণিতাই আমার কাছে শুভ্রতার প্রতীক। হে সিসে! আমি তোমাকেই বেছে নিলাম। ভাগ্য আমার প্রতি সুপ্ৰসন্ন হোক।
পোর্সিয়ার মনে হল তিনি যেন দু-খানা অদৃশ্য ডানায় ভর করে উড়ে চলেছেন–তার চারদিকে যেন রয়েছে রামধনু রাঙা নতুন জগৎ। সেই জগৎ থেকে ভেসে আসছে অপূর্ব সব সংগীত। দেবাঙ্গনারা যেন ফুলের মালা নিয়ে ঘিরে দাঁড়িয়েছে পোর্সিয়াকে — শুধু পোর্সিয়াকে কেন, পোর্সিয়া-ব্যাসানিও যুগলকে তারা দাঁড় করিয়েছে এক তরঙ্গ শীর্ষে–দুজনকে একত্রে বেঁধেছে পারিজাত মালার বন্ধনে। একেই কি বলে স্বৰ্গা! এই তো শুভ-সূচনা আনন্দ-সুখের। পোর্সিয়ার নারীজন্ম আজ সার্থক।
ব্যাসানিও একদৃষ্টি তাকিয়ে রয়েছেন আধারের মধ্যে রাখা পোর্সিয়ার প্রতিকৃতির দিকে। কোনও সন্দেহ নেই ছবিটা একজন নিখুঁত শিল্পীর সৃষ্টি। ছবিটা দেখতে দেখতে ব্যাসানিও হঠাৎ লক্ষ করলেন ছবিটার নিচে পড়ে আছে একটা কাগজ। ব্যাসানিও সেটা তুলে নিয়ে পড়তে লাগলেন — বাহ্যিক রূপ দেখে তুমি বিচার করেনি। তাই সাফল্য যখন তোমার দুয়ারে এসেছে, তখন সানন্দে বরণ করে নাও তাকে। পৃথিবীর বুকে আজ থেকে আর তোমায় সুখের খোঁজে বের হতে হবে না। আজ থেকে তিনি একান্তভাবে তোমারই।
কাগজটা পড়ার পর পোর্সিয়াকে বললেন ব্যাসানিও, এই চিঠির নির্দেশ আমার কাছে যতই লোভনীয় হোক না কেন, আপনার সমর্থন না পেলে এর কোনও মূল্য নেই আমার কাছে।
সাথে সাথেই জবাব দিলেন পোর্সিয়া, হে আমার প্রভু ব্যাসানিও! এই যে আপনি আমায় দেখছেন, বেলমন্টের জমিদারির অধীশ্বরী, সুরম্য প্রাসাদের অধিকারিণী, অগণিত দাস-দাসী অনুচরদের ভাগ্যবিধাত্রী–এই আমি আজ থেকে আপনার একান্ত অনুগতা। আমি একটা সাধারণ মেয়ে, লোকে আমায় রূপসি বলে, ঈর্ষা করে আমার ধন-সম্পদের। আমি জানি আমার এই রূপ ও ঐশ্বৰ্য সত্ত্বেও আমি আপনার যোগ্য নই। আমার দুঃখ হয় কেন আমি এর চেয়ে বেশি রূপসি হলাম না। কোন পারলাম না। আরও বেশি গুণের অধিকারিণী হতে? এর চেয়ে হাজার গুণ বেশি গুণ। ঐশ্বর্য কেন আমি পেলাম না। পিতার কাছ থেকে? যদি এসব আমি পেতাম, তা হলে সবই উৎসর্গ করে দিতাম আপনার চরণে–তৃপ্তি পেতাম। আমার যা আছে তা যৎসামান্য হলেও আজ থেকে আপনার। আমার এই প্রাসাদ, জমিদারি, অর্থসম্পদ, মায় আমি —এখন থেকে আপনিই এ সবের প্রভু। এই আংটিটি আপনার আঙুলে পরিয়ে দিয়ে সেই সাথে সর্বস্ব সমর্পণ করলাম। আপনাকে। আমার মিনতি অভিজ্ঞান মনে করে এই আংটিটি সযত্নে রক্ষা করবেন। এটি যদি আপনি কোনওদিন হাতবদল করেন, তাহলে জানিব, আপনি আর আমায় ভালোবাসেন না।
ব্যাসানিও জবাব দিলেন, বেঁচে থাকতে এ আংটি আমি আঙুল থেকে খুলব না।
তখন নোরিসা বলে উঠল, হে আমার ঠাকুরানি ও প্ৰভু! আপনারা আমাদের সশ্রদ্ধ অভিনন্দন গ্রহণ করুন। আজ থেকে আপনাদের সুখেই আমাদের সুখ।
ওদিক থেকে বলে উঠল গ্রাসিয়ানো, বন্ধু ব্যাসানিও! তোমাদের দু-জনের জন্য রইল আমার সশ্রদ্ধ অভিনন্দন। তবে আমারও একটা বক্তব্য আছে। যদি তোমাদের আপত্তি না থাকে, তাহলে এই সুযোগে আমিও একটা বিয়ে করে ফেলতে চাই। এ ব্যাপারে তোমাদের কী অভিমত?
