আপন মনে আল্লাকে ডাকতে লাগলেন সুলতান–হে আল্লা, তুমি আমায় সঠিক পথে চালনা কর। এরপর মনোযোগ সহকারে তিনি আবার পাঠ করলেন আধার তিনটির গায়ে উৎকীর্ণ প্ৰতিলিপি। প্ৰথমে সিসের পত্রটি পরীক্ষা করে দেখলেন তিনি–সর্বস্ব পণ করতে হবে! কিন্তু কীসের জন্য? এ তো বড়ো আবদারের কথা! এটা যেন লোককে ভয় দেখাতে চাইছে! যদি সর্বস্ব পণ করব তো প্রতিদানে কী পাব? সিসের মতো নিকৃষ্ট বস্তুর কাছ থেকে আমার মতো মহৎ লোক কি যোগ্য প্রতিদান আশা করতে পারে? নাঃ, সিসের সাথে কারবার করা আমার পোষাবে না।
এরপর রুপের পালা! এ বলছে যোগ্যতা অনুযায়ী পুরস্কার দেবে আমায়? কী স্পর্ধা! আমার কি যোগ্যতার অভাব? একটা স্বাধীন দেশের বীর রাজা আমি, ওই নিকৃষ্ট রৌপ্যাধারটা কিনা আমার যোগ্যতার প্রশ্ন তুলতে চায়? ওর ছায়াও মাড়াব না আমি।
এবার দেখা যাক সোনা কী বলছে–পৃথিবীর লোক যা কামনা করে তাই পাওয়া যাবে তার কাছ থেকে। বাঃ বেশ বলেছে তো! এসো স্বৰ্ণধার, আমি বেছে নিলাম তোমাকে।
পোর্সিয়াকে উদ্দেশ করে সুলতান বললেন, এবার চাবিটা দিন।
মুখের হাসি গোপন করে চাবিটা সুলতানকে দিলেন পোর্সিয়া।
কাঁপা হাতে বাক্সের ডালাটা খুললেন সুলতান। তিনি আশা করেছিলেন এর মধ্যে পোর্সিয়ার প্রতিকৃতি থাকবে। কিন্তু তার বদলে এ কী রয়েছে!
প্রতিকৃতি তো নয়, একটা বীভৎস জিনিস সাজানো রয়েছে স্বর্ণাধারের ভেতর। জিনিসটি একটি মাথার খুলি। তার চক্ষুকোটরে ঢোকানো রয়েছে একখানা পাকানো কাগজ। সেটা টেনে নিয়ে পড়তে লাগলেন সুলতান–যা চকচক করছে তাই সোনা নয়। বাইরে থেকে দেখে কোনও জিনিসের বিচার করা উচিত নয়। –কথাটা বহুবার শুনেছ। তবুও তোমার চৈতন্য হয়নি। মরীচিকার সন্ধানে ঘুরে বহু লোক প্ৰাণ পর্যন্ত হারিয়েছে। সমাধিস্তম্ভের বাইরে সোনালি কারুকার্য থাকলেও ভেতরে কিন্তু থাকে গলিত শব আর মাংসভুক কীট। তোমার সাহসের অনুপাতে বুদ্ধির জোর বেশি থাকলে পরীক্ষার ফলও অন্যরকম হত। এখন তুমি যেতে পার। জন্মের মতো সুযোগ হারিয়েছ তুমি।
ভগ্নহৃদয়ে দেশে ফিরে গেলেন মরক্কোর সুলতান।
পরদিনই এলেন আরাগনের রাজা। ইনিও বীর, বয়সে তরুণ। কিন্তু সবকিছু দেখে শুনে মনে হয়, তিনি বুদ্ধির ধার ধারেন না। সমাদরের সাথে পোর্সিয়া তাকে নিয়ে এলেন পরীক্ষার ঘরে। সেঘরে পাশাপাশি সাজানো রয়েছে সোনা, রুপো এবং সিসে নির্মিত তিনটি আধার। পর পর তিনটি আধারে উৎকীর্ণ লিপি পাঠ করলেন আরাগন রাজ। অনেক ভেবে তিনি স্থির করলেন সোনা বা সিসে নয়, রুপোর আধারটিই হল খাঁটি জিনিস। কারণ ওতে লেখা আছে — আমার কাছ থেকে তুমি যোগ্যতার অনুরূপ পুরস্কার পাবে।
আরাগনরাজের যোগ্যতা তো স্বীকার করে নিয়েছে। সারা পৃথিবী। তার যোগ্য পুরস্কারের অর্থই পোর্সিয়ার সাথে তার বিয়ে। চাবি চেয়ে নিয়ে তিনি দ্রুত খুলে ফেললেন রুপোর আধারটি।
কিন্তু কী আশ্চর্য! ওর ভেতর তো পোর্সিয়ার কোনও প্রতিকৃতি নেই। — রয়েছে একটা হাস্যোজুল সঙের মূর্তি আর সেই মূর্তির দাঁতে আটকানো আছে একটা কাগজ। কাগজে লেখা আছে বাইরে থেকে দেখতে সুন্দর হলেও ভেতরে ফাঁপা–এরূপ বহু অপদার্থ রয়েছে পৃথিবীতে। তারাই পোর্সিয়ার প্রতিকৃতি তালাশ করবে। আমার ভেতর। জন্মের মতো শেষ হয়ে গেছে তোমার সময়। এবার যেতে পার তুমি।
লিপিটা পাঠ করার পর আর একমুহূর্তও দেরি না করে বেলমন্ট ছেড়ে চলে গেলেন আরাগনের রাজা।
আরাগনের রাজার অনুচরগণ পোর্সিয়ার প্রাসাদ ছেড়ে চলে যাবে ঠিক এমন সময় একজন ভৃত্য এসে বলল, ঠাকুরানি! ভেনিস থেকে একজন ভদ্রলোক এসেছেন। তার সাথে রয়েছে প্রচুর মূল্যবান উপহার সামগ্ৰী। ভদ্রলোক নিজে অবশ্য পাত্র নন, দূত মাত্র। পিছনেই আসছে আসল বর
পোর্সিয়া বললেন, চল, গিয়ে দেখে আসি। নোরিসা মনে মনে ভাবছে —বরের পর বরের আপ্যায়ন করে আর পারি না। এবার ব্যাসানিও এলে বাঁচি। আমার মন বলছে ঈশ্বর কর্তৃক প্রেরিত হয়ে ব্যাসানিওই আসছেন ঠাকুরানির স্বামী রূপে। উনি ছাড়া আর কেউ পারবে না আধারগুলির রহস্য ভেদ করতে।
০৩.
ভেনিস থেকে যে ভদ্রলোক এসেছেন তিনি হলেন গ্রাসিয়ানো, ব্যাসানিওর দৃত। অচিরে ব্যাসানিও এলেন বোলমন্টে। শাইলকের কাছ থেকে প্রাপ্য টাকার এমন সুন্দর সদ্ব্যবহার করেছেন তিনি যে তার ঘোড়া আর অনুচরদের জাঁকজমক দেখলে বিস্ময়ে হতবাক হয়ে যেতে হয়। তাকে দেখে মনেই হয় না। তিনি রাজা-মহারাজা নন, সম্রাস্তবংশীয় একজন সাধারণ ভদ্রলোক মাত্র।
অবশ্য ব্যাসানিওর সাথে পূর্ব পরিচয় রয়েছে পোর্সিয়ার।
পোর্সিয়ার পিতা জীবিত থাকাকালীন কয়েকবার অতিথি রূপে এখানে এসেছিলেন ব্যাসানিও। পোর্সিয়া মুখে কিছু না বললেও একমাত্ৰ নোরিসা জানে সে সাক্ষাতের ফলে পোর্সিয়ার মনে রেখাপাত করতে সক্ষম হয়েছিলেন ব্যাসানিও। তাই ব্যাসানিওকে দেখে আনন্দে উৎফুল্ল হয়ে ওঠে নোরিসা — পোর্সিয়ার মুখেও আনন্দের ছাপ দেখা যায়। কিন্তু তার বিয়ের ব্যাপারে বাবা যে ব্যবস্থা করে গেছেন তার উপর কোনও হাত নেই তার। সমস্ত ব্যাপারটাই নির্ভরশীল দৈবের উপর। ধাতুনির্মিত তিনটি আধার রয়েছে। তার মধ্য থেকে বেছে নিতে হবে একটিকে। যদি সেটা খোলার পর তার মধ্যে পোর্সিয়ার প্রতিকৃতি পাওয়া যায়, তাহলেই সেই বিবাহাৰ্থী পোর্সিয়াকে লাভ করতে সক্ষম হবে।
