কিন্তু জেসিকার কাছ থেকে কোনও সাড়া পেলেন না তিনি। তখন তিনি চিৎকার করে ডাকতে লাগলেন মেয়েকে। জেসিকার আসতে কিছুটা সময় লেগে গেল। এদিকে শাইলক কিন্তু অবিরাম বলেই চলেছে, আমার মোটেই ইচ্ছে নেই যাবার। গেলে আমার কিছু না কিছু ক্ষতি হবেই। কাল রাতে আমি স্বপ্ন দেখেছি টাকার থলির। ওটা এক ভয়ানক দুঃস্বপ্ন-রীতিমতো অশুভ। না জানি আর কী কী রয়েছে আমার কপালে।
তাকে সাত্ত্বনা দিয়ে বলে উঠল ল্যান্সলেট, ওসব চিস্তা মন থেকে দূর করে দিন। কেই বা আপনার ক্ষতি করতে পারে? তার চেয়ে চলুন কিছুটা আনন্দ উপভোগ করে আসি। আজ ওখানে নাচ-গানের আসর বসছে। আপনাকে দেখতে পেলে খুবই খুশি হবেন প্ৰভু ব্যাসানিও। কত নাচ, গান, স্মৃর্তি হবে সেখানে। চার বছর আগে ইস্টার সোমবারের বিকেলে যখন আমার নাক দিয়ে রক্ত ঝরছিল, তখনই জানতাম আমার অদূদ্ষ্টে রয়েছে আজ প্ৰভু ব্যাসানিওর বাড়িতে নাচ দেখা, গান শোনা আর ভোজ খাওয়া।
সে সব কথায় কোনও কান দেয় না। শাইলক। সে আপন মনেই বলতে থাকে, নাচ-গান না ছাই! এ সময় জেসিকাকে সামনে দেখে সে বলল, ওরে জেসিকা! আজ একবার না বেরুলেই নয়। তুই দরজা বন্ধ করে থাকিবি। যদি রাস্তায় জয়ঢাক বা বাঁকা-বাঁশির আওয়াজ শুনিস, তাহলেও দরজা খুলবিনা তুই। খ্রিস্টানরা যদি মুখে রং মেখে সং সেজে রাস্তায় রাস্তায় ঘোরে তো ঘুরুক না। তুই কিন্তু ভুলেও রাস্তায় যাবি না সে সব দেখার জন্য।
সংক্ষেপে উত্তর দিল জেসিকা, ঠিক আছে, যাব না।
শাইলক বলল, তুই কিন্তু মোটেও জানলাগুলি খুলবি না। ও সব শব্দ কানে আসাও পাপ। আমি জানিনা। কী জন্য যাচ্ছি কিন্তু না গিয়েও উপায় নেই। ওহে ল্যান্সলেট, তোমার প্রভুকে গিয়ে বল যে তোমার প্রাক্তন মনিব একটু বাদেই আসছেন নিমন্ত্রণ রক্ষা করতে। তবে শুয়োরের মাংসটা যেন তার টেবিলে দেওয়া না হয়। ওটা খেতে নিষেধ আছে আমাদের।
যাবার আগে ল্যান্সলট চুপি চুপি জেসিকাকে বলে গেল সে যেন বাবার কথামতো দরজাজানালা বন্ধ করে বসে না থাকে।
শাইলক বললেন, যাবার আগে তোকে কী বলে গেল রে ল্যান্সলেট? বিরক্তির সাথে জেসিকা বলল, বিশেষ কী আর বলে যাবে? দুঃখ করে গেল যে ওখানে যাবার পর একদিনও পৌঁটপুরে খেতে পায়নি সে। আশা আছে আজ এই ভোজের কল্যাণে সে পেট পুরে খেতে পাবে।
খিলখিল করে হাসতে হাসতে পোশাক পালটাতে গেল শাইলক। এটা তার বদ্ধমূল ধারণা যে খ্রিস্টানিরা তাদের ভৃত্যদের পেট পুরে খেতে দেয় না।
কিছুক্ষণ বাদেই তার নিমন্ত্রণ রক্ষা করতে গেল শাইলক। এদিকে রাত্রিশেষে জেসিকার জানোলার নীচে এলে দাঁড়ালেন ব্যাসানিও। তার সাথে রয়েছে গ্রাসিয়ানো, স্যালারিনো প্রভৃতি বন্ধুরা। তাদের ভয়ের কোনও কারণ নেই, কারণ ওরা জানেন শাইলক এখন ব্যাসানিওর বাড়িতে বসে নাচ দেখছেন। বাড়িতে কোনও চাকর-বাকরও নেই। ল্যান্সলট চলে যাবার পর কৃপণ ইহুদি আজ পর্যন্ত কোনও চাকর রাখেনি।
খানিকক্ষণ ডাকাডাকির পর জেসিকা এসে দাঁড়াল জানালার পাশে। তার পরনে পুরুষের পোশাক। সে দড়ি বেঁধে একটা বাক্স নিচে নামিয়ে দিল। লরেঞ্জোকে ডেকে সে বলল, সাবধানে ধর এই বাক্সটা। এতে রয়েছে আমার সমস্ত অলংকার। আমি দেখি কিছু স্বর্ণমুদ্রা জোগাড় করে আনতে পারি কিনা।
গহনার বাক্স হাতে নিয়ে জেসিকার অপেক্ষায় রইল লোরেঞ্জো। কিছুক্ষণ বাদে দু-হাতে দুটো মোহর ভর্তি থলি নিয়ে সদর দরজা দিয়ে বেরিয়ে এল জেসিকা। তখন অন্ধকার রাস্তায় লোকজন নেই বললেই চলে। কাজেই কেউ তাদের দেখার আগেই পালিয়ে গেল ওরা।
এদিকে মরক্কোর সুলতান এসে আতিথ্য গ্ৰহণ করে রয়েছেন পোসিয়ার প্রাসাদে। একটা রাজ্যের রাজা তিনি–রাজ্য ছেড়ে বেশিদিন বাইরে থাকা তার পক্ষে সম্ভব নয়। আগামীকাল তিনি নিজেই ভাগ্য পরীক্ষা দিতে চান। তাতে অবশ্য পোর্সিয়ার কোনও আপত্তি নেই। কারণ এ সব অবাঞ্ছিত অতিথিরা যত তাড়াতাড়ি বিদায় হন ততই ভালো। ঠাট্টা করে নোরিসা বলল, যদি এই অবাঞ্ছিত ব্যক্তিদের মধ্যে সঠিক বাক্সটা কেউ টেনে বের করে, তাহলে? এ কথা শুনে কালো ছায়া নেমে আসে পোর্সিয়ার মুখের উপর। কিন্তু পরীক্ষণেই তিনি বললেন, এ নিয়ে আমার কোনও আশঙ্কা নেই। আমি মনে করি ঈশ্বর কখনই আমার প্রতি এত নিষ্ঠুর হবেন না।
পরদিন সকালেই মরক্কোর সুলতানকে নিয়ে আসা হল এক সুসজ্জিত সুরম্য কক্ষে। সেই কক্ষের একপ্রান্তে ঝুলছে একটা স্বর্ণখচিত মখমলের পর্দা। টেবিলের উপর সারি দিয়ে সাজানো রয়েছে তিনটি ধাতুনির্মিত আধার। পর্দা সরাতেই সুলতান দেখতে পেলেন একটি আধার সোনার, একটি রূপার এবং শেষেরটি সিসার।
আধারগুলির কাছে গিয়ে সুলতান পরীক্ষা করতে লাগলেন প্রত্যেকটিকে। সোনার আধারটির গায়ে উৎকীর্ণ রয়েছে এই কথাগুলি : আমায় যে বেছে নেবে সে এমন কিছু পাবে যার জন্য পৃথিবীর সবাই উদগ্ৰীব।
রুপোর আধারটির গায়ে লেখা আছে এই ছত্রটি : আমায় বেছে নিলে নিজ যোগ্যতার পুরস্কার পাবে তুমি।
আর সিসের পাত্রটির গায়ে যা লেখা আছে তা এই : আমাকে যে বেছে নেবে সর্বস্ব পণ করতে হবে তাকে। হয়তো সর্বস্ব হারাতেও হতে পারে।
সবকিছু দেখার পর সুলতান বললেন, আমি কী করে বুঝব যে সঠিক পত্রিটি বেছে নিয়েছি? সুলতানের সাথেই ছিলেন পোর্সিয়া। সাথে সাথেই তিনি উত্তর দিলেন, ওই আধারগুলির মধ্যে একটিতে রয়েছে আমার প্রতিকৃতি। সেই আধারটি যিনি বেছে নেবেন তার গলায় মালা দেব আমি।
