এ সব সামান্য ব্যাপারের অনেক উর্ধের্ব আন্তনিও, তাই তাকে বিরক্ত করতে সাহস হয়নি লোরেঞ্জোর। ব্যাসানিও অবশ্য এ সব ব্যাপারে সহানুভূতিশীল। কিন্তু তিনি তার নিজের প্রেমের ব্যাপারে সর্বদাই এত উন্মনা ও ব্যতিব্যস্ত যে এসময় তাকে জেসিকার কথা বলা সম্পূর্ণ নিরর্থক। ওদের দু-জনকে বাদ দিয়ে সে তার অন্য বন্ধুদের বলেছে এবং তার মধ্যে গ্রাসিয়ানো, স্যালিরিনো প্রভৃতি বন্ধুরা সবাই এককথায় রাজি হয়েছে তাকে যথাসম্ভব সাহায্য করতে।
শাইওলকের বিদায়ী ভৃত্য ল্যান্সলটের মারফত লোরেঞ্জার কাছে সেদিন একটা চিঠি পাঠিয়ে ছিল জেসিকা। ল্যান্সলটের প্রতি কোনোদিনই ভালো ব্যবহার করেনি শাইলক কারণ সে ছিল খ্রিস্টান। ল্যান্সলট একটু অলস প্রকৃতির, তদুপরি শৌখিন। শাইলকের ঘরে এ ধরনের ভৃত্যু বেমানান। এক কথায় সে ছিল ধনী ব্যক্তির ঘরে মানানসই একজন চাকর। শাইলক এ ধরনের লোককে মোটেও সহ্য করতে পারে না। তাই অনেকদিন ধরেই ল্যান্সলেট খোজ করছিল। অন্য কাজের। ভাগ্যক্রমে ব্যাসানিওর সাথে দেখা হয়ে যাওয়ায় নতুন কাজটা সে পেয়েছে। সে চাইছে যাবার আগে পূর্বতন প্রভুর যতটা সম্ভব ক্ষতি করে যাওয়ার। জেসিককে যথাসম্ভব সাহায্য করতে রাজি।
জেসিকার চিঠি পেয়ে লরেঞ্জো তার বন্ধুদের সাথে পরামর্শ করে ল্যান্সলেট মারফত একখানা চিঠি পাঠিয়েছে জেসিকাকে। লোরেঞ্জো বারবার সাবধান করে দিয়েছে ল্যান্সলিটকে সে যেন চিঠিটা অন্য কারও হাতে না দেয়।
বিয়ের উদ্দেশ্যে বেলমন্ট যাত্রা করছেন ব্যাসানিও। ভাগ্যপরীক্ষা করার আগে বন্ধুদের জন্য একটি ভোজের ব্যবস্থা করেছেন তিনি। গ্রাসানিও প্রমুখ বন্ধুরা তাকে পরামর্শ দিল। এই ভোজে শাইলককে নিমন্ত্রণ করা দরকার। কারণ তিনহাজার ডুকাট ধার দিয়ে সে যে ব্যাসানিওর উপকার করেছে সে জন্য তাকে কৃতজ্ঞতা জানানো উচিত। কেননা ওই টাকা না পেলে ব্যাসানিওর বেলমন্ট যাবার কোনও প্রশ্নই ওঠে না। অবশ্য টাকা ধারণ দেবার ব্যাপারে শাইলকের কোনও মহানুভবতা নেই। তার মতলব যে ভালো নয়, তা শুধু ব্যাসানিও কেন, অন্য সবারও অজানা নয়। তবে তার মতলব যাই হোক না কেন, সেটাই যথেষ্ট। যে টাকাটা পাওয়া গেছে তার কাছ থেকে। এটাই পরম লাভ। কাজেই কৃতজ্ঞতা প্রকাশের সুযোগ পেয়ে কেন তা থেকে বঞ্চিত হবেন ব্যাসানিও? ল্যান্সলটের হাত দিয়ে তিনি নিমন্ত্রণ পাঠিয়ে দিলেন শাইলকের কাছে।
ল্যান্সলিটকে দেখেই বিদ্রুপের স্বরে বললেন শাইলক, কীহে বাপু, কেমন আছ নতুন মানিবের বাড়িতে? বুঝলে, ওখানে আর এখানে অনেক তফাত। এখানে তো সকাল-বিকেল, যখন খুশি ইচ্ছামতো খেতে পারতে, সেখানে শুধু একবার সকালে আর একবার বিকেলে। তুমি কি ভেবেছি সেখানে পেটপুরে খেতে পাবে? রামঃ রামঃ সেই পাত্ৰই বটে খ্রিস্টানেরা! খিদে পেলে খেতে পাবে না। আর ঘুম পেলে শোবার জোগাড় নেই। আর পোশাকের কথা না বলাই ভালো। ছিড়ে ন্যাকড়া হয়ে গেলেও কিছুতেই নতুন পোশাক দেবে না। ওরা। তাই বলছি, কেমন আছ হে নতুন মনিবের বাড়িতে?
ল্যান্সলেট বিনীতভাবে জবাব দিলে, হে আমার প্রাক্তন মনিব! না খেয়েও আমি সেখানে ভালোই আছি। আমার বর্তমান মনিবের কাছ থেকে এই নিমন্ত্রণ পত্রটা নিয়ে এসেছি। আপনি নিমন্ত্রণ রক্ষা করতে যাবেন তো?
শাইলক বলল, না যাওয়াই উচিত কারণ ওরা তো ভালোবেসে নিমন্ত্রণ করেনি আমায়। নিশ্চয়ই কোনও মতলব আছে ওদের। খোশামোদ করে আরও কিছু টাকা নেবার ধান্দায় আছে ওরা। কিন্তু কিছুতেই আর সেসব হবে না। ইচ্ছে হলে, তোমার নতুন মনিবকে এসব কথা বলে দিতে পারল্যান্সলেট। কারণ ন্যাড়া একবারই বেলতলায় যায়। আন্তনিওর প্রতি আমার অনেকদিনের ভালোবাসা রয়েছে। তাই তার উপকারে এসেছি আমি। তবে সে টাকা এখন সমুদ্রে ভাসছে।
অবাক হবার ভান করে বলল ল্যান্সলেট, সমুদ্রে ভাসছে? এ কেমন কথা?
তাছাড়া আর কী বলব বল! বলল শাইলক, কেন যে নগদ টাকায় মাল কিনে লাভের আশায় সমুদ্রে পাঠিয়ে দেয় লোকেরা, তা বাপু আমার মাথায় ঢেকে না। ঝড় হল তো জাহাজ ডুবে গেল। আর বোম্বেটেরা লুট করলে তো হয়ে গেল। অথচ দেখ, সমুদ্রে মাল না পাঠিয়েও কেমন দু-পয়সা রোজগার হচ্ছে আমার।
ল্যান্সলেট বলল, ওটা তো সুদের টাকা। মানুষদের ঠকিয়ে… এ পর্যন্ত বলে জিভ কেটে চুপ করে সে। হাজার হলেও তো পুরনো মনিব। তার অসম্মান করা উচিত নয়। বেরসিক হওয়া সত্ত্বেও লোকটি অভদ্র নয়।
ল্যান্সলটি যতটুক বলেছে সেটাই যথেষ্ট শাইলককে রাগাবার জন্য— কী বললে, সুদ নেওয়া মানে লোক ঠকানো? আর কম দামে মাল কিনে চড়া দরে বেচা বুঝি লোক ঠকানো নয়? কে যে কতখানি সাধুতা আমার জানা আছে। তফাত এই আন্তনিও খরিদারদের ঠকায় আর আমি ঠিকই দোকানিদের। খরিদারের যেমন মাল কেনা ছাড়া গতি নেই, তেমনি দেনাদারও বাঁচে নাটাকা ধার করতে না পারলে। তাদের প্রয়োজনের সুযোগে আমরা দু-পয়সা লুটে নিই, ব্যাপারটা এই আর কী।
শাইলককে বাধা দিয়ে বলে উঠল ল্যান্সলেট, আমি আসল ব্যাপারটার কথা বলছি। মানে, আপনি নিমন্ত্রণে যাবেন তো?
আমার না যাওয়াই উচিত, বলল শাইলক, কিন্তু ভাবছি গেলে ওরা আর আমার কীই বা করবে। এমন কঁচা ছেলে আমি নই যে ওদের কথায় ভুলে গিয়ে হাজার দু-হাজার ডুকাট বিলিয়ে দিয়ে আসব। বরঞ্চ আমি গিয়ে ওদের কিছু খরচা করিয়ে দিয়ে আসব। শুনেছি। ওরা নাকি ভালো খায়-দায়। শুধু শুয়োরের মাংসটা না দিলেই হল।… ওরে জেসিকা কোথায় গেলি।
