খিল খিল করে হেসে উঠে বলল নেরিসা, তাতে হয়েছে কী? যেখানকার যা ভালো, তিল তিল করে তা সংগ্রহ করে আত্মসাৎ করেছেন তিনি। সে তো ভালেই হয়েছে!
সাথে সাথে উত্তর দিলেন পোসিয়া, আত্মসাৎ আর করতে পারলেন কই। পাঁচমিশেলি জিনিস তাদের স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য নিয়ে ফুটে উঠেছে তার দেহে। ঠিক সে ভাবেই তার আচার-আচরণের মাঝে যখন-তখন ফুটে ওঠে খাপছাড়া ঢং—যার একটার সাথে অন্যটার মিল নেই। লোকের চোখে তাকে একটা গরমিলের মতো মনে হয়।
ইংরেজ ভদ্রলোক সম্পর্কে হতাশ হয়ে এবার বলে উঠল নেরিসা, তাহলে ওর পড়শি স্কটিশ ভদ্রলোকটির কথা এবার ভাবুন!
ছেঃ ও তো একটা কাপুরুষ, বলল পোর্সিয়া, সেদিন দেখলি না। ইংরেজীটা কেমন ওর কান মলে দিল। আর ও কী বলল জানিস? বলল, সুযোগ পেলে দেখে নেব।
নোরিসা বলল, তই নাকি? তাহলে বাদ দিন ওর কথা। এবার ওই জার্মান ব্যারনটার কথা ভাবুন। ওই যে স্যাক্সনির ডিউকের ভাগনে।
পোর্সিয়া বললেন, কী বললি, ওকে? সকালবেলা ওকে দেখলেই আমার পা থেকে মাথা পর্যন্ত জ্বলে ওঠে। কেন, জনিস? সকাল থেকেই ও মদ গিলতে শুরু করে। আর বিকেলে? তখন তো জানোয়ারের সাথে ওর কোনও পার্থক্যই থাকে না। ওর গলায় মালা দেবার চেয়ে সারা জীবন আইবুড়ি থাকা অনেক ভালো।
কৌতুকে জ্বলে ওঠে নোরিসার চোখ। ও বলে, কিন্তু ও যদি সত্যি সত্যিই আসল বাক্সটা খুঁজে বের করে, তাহলে তো ওর গলাতেই মালা দিতে হবে আপনাকে। এ ছাড়া অন্য কোনও উপায় থাকবে না। আপনার। আর আপনি যদি বিয়ে না করেন তাহলে বাবার ইচ্ছের বিরুদ্ধাচারণ করতে হবে আপনাকে।
পোর্সিয়া বললেন, আমি সেটাও ভেবেছি বইকি! ও যাতে আসল বাক্সের কাছে যেতে না পারে তার একটা উপায়ও আমি বের করেছি। ও যদি বাক্সের পরীক্ষায় রাজি থাকে, তাহলে বাজে বাক্স দুটোর উপর দু-গ্লাস ভালো মদ রেখে দিবি। মদ দেখলেই ও সেদিকে হাত বাড়াবে আর হাত বাড়ানো মানেই তো বেছে নেওয়া।
আপত্তি করে বলল নোরিসা, ঠাকুরানি! সেটা তো জোচাচুরি হয়ে যাবে।
হোক না জোচ্চুরি, বললেন পোর্সিয়া অমন মাতালের হাতে পড়ার চেয়ে একটু-আধটু জোচ্চারির সাহায্য নেওয়া ঢের ভালো আর আমার বাবার আত্মা তাতে ক্ষুব্ধ হবেন না।
নোরিসা বলল, ঠাকুরানি, আমি আর জ্বালাতন করব না। আপনাকে। ওরা সবাই যে যার দেশে চলে যাচ্ছে। বাক্স পরীক্ষা করার মতো সাহস ওদের নেই।
পোর্সিয়া বললেন, তাহলে ফিরে যাক ওরা। বাবার নির্দেশ আমি অমান্য করতে পারব না। বাক্স তিনটের মধ্য থেকে আসল বাক্সকে যে বাছাই করতে পারবে না, তার গলায় মালা দেব না আমি। তাতে যদি সারা জীবন কুমারী থাকতেও হয় তাতেও আপত্তি নেই আমার। আমার সৌভাগ্য যে লোকগুলি চলে যেতে চাইছে। ওদের মধ্যে এমন কেউ নেই যে চলে গেলে আমার মনে দুঃখ হবে।
একটু দ্বিধার সাথে বলল নোরিসা, একটা কথা বলব ঠাকুরানি, আপনি কিছু মনে করবেন না। কতাঁর জীবিতকালে মনফেরাতের মাকুইসের সাথে একজন ভেনিসিও যুবক মাঝে মাঝে এখানে আসতেন। তিনি ছিলেন একাধারে বীর এবং বিদ্বান। তার কথা কি আপনার মনে পড়ে?
এবার আর চিন্তা করতে হল না পোর্সিয়াকে। তিনি বললেন, আমি বুঝতে পেরেছি তুই কার কথা বলছিল–তিনি তো ব্যাসানিও। কী বললি, তার নাম ব্যাসানিও নয়?
সাহস পেয়ে বলল নোরিসা, সুন্দরী রমণীর পাণিগ্রহণ করতে হলে একজন পুরুষের যে সব গুণ থাকা দরকার, আমার দেখা সমস্ত পুরুষদের মধ্যে একমাত্র ব্যাসানিওর মাঝেই রয়েছে সে সব গুণ।
এ সময় একজন ভৃত্য এসে জানোল মরক্কোর সুলতানের বার্তা নিয়ে একজন দূত এসেছে। সুলতান আজ রাতেই এসে পৌছবেন বোলমন্টে। পোর্সিয়ার পাণিগ্রহণের জন্য যে কোনও পরীক্ষাতেই আপত্তি নেই তার।
ক্লাস্ত স্বরে বলে উঠল পোর্সিয়া, না, আর পারা যায় না। একদল যেতে না যেতেই আর একদল এসে হাজির। মরক্কোর সুলতান; সে তো নিশ্চয়ই কালো চামড়ার লোক। কিন্তু আমার বাবা এমন ব্যবস্থা করে গেছেন যে কালো চামড়ার লোক হলেও তাকে উপেক্ষা করার শক্তি আমার নেই। পরীক্ষা করার সুযোগ দিতেই হবে তাকে।
জেসিকা শাইলকের একমাত্র সস্তান। বাবার সাথে কোনও দিক দিয়েই মিল নেই তার। তার মুখখানা যেমন কোমল, অন্তরটিও সেরূপ। সে বিয়ে করতে চায় খ্রিস্টান যুবক লোরেঞ্জোকে, যে আবার ব্যাসানিওর ঘনিষ্ঠ বন্ধু।
জেসিকা ভালোভাবেই জানে তার বাবাকে। মেয়ের বিয়ের কথাটা ভাবাও শাইলকের কল্পনার বাইরে—কারণ বিয়ে মানে তো অহেতুক খরচ। শাইলক কখনও এমন মহাপাপ করতে পারে না। তার উপর আবার খ্রিস্টানের সাথে বিয়ে? যে খ্রিস্টান সম্প্রদায়কে শাইলক দু-চোখে দেখতে পারে না তাদেরই একজনের হাতে তুলে দেবে মেয়েকে? এ কখনও সম্ভব নয়। খ্রিস্টানরা যদি শুধু ডুকাট ধার নিয়ে সন্তুষ্ট থাকে, তাতে বিশেষ আপত্তি নেই শাইলকের। কিন্তু যে তার মেয়েকে বিয়ে করবে। সে তো তার সিন্দুকের দিকেও হাত বাড়াবে। পুত্ৰহীন শাইলকের একমাত্র উত্তরাধিকারী তার মেয়ে জেসিকা।
লোরেঞ্জোর সাথে বিয়ে দিতে তার বাবা রাজি হবেন। এ কথা কল্পনাও করতে পারে না জেসিকা। তাই সবকিছু সে সযত্নে গোপন রেখেছে। এ ব্যাপারে যা কিছু পরামর্শ করার দরকার তা সে লোরেঞ্জোর সাথেই করে। অবশ্য বন্ধুসমাজে কথাটা গোপন রাখতে পারেনি লোরেঞ্জো। কারণ কোনও ব্যবস্থা নেবার প্রয়োজন হলে সেটা তার একার পক্ষে নেওয়া সম্ভব নয়। সাহায্যের প্রয়োজন নিশ্চয়ই হবে এবং সেটা বন্ধু-বান্ধব ছাড়া আর কার কাছ থেকে আশা করা যায়!
