কথাটা শুনেই জিভ কামড়ে বললে গ্রাসিয়ানো, বল কী বন্ধু! তোমার বিয়ের প্রস্তাবে ক্ষতি হতে পারে এমন কাজ কি আমার দ্বারা সম্ভব? তুমি দেখ, বেলমন্টে পৌঁছে আমি জিভের লাগাম টেনে রাখব, একটিও বেফাঁস কথা বেরুবে না। আমার মুখ দিয়ে। শেষমেশ বেলমন্টের উদ্দেশে রওনা হলেন ব্যাসানিও।
পোর্সিয়ার পাণিপ্রার্থী সম্মানিত অতিথিরা ইতিমধ্যেই পৌঁছে গেছেন তার বেলমন্টের প্রাসাদে। সবাই নিজ নিজ জায়গায় অবস্থান করছেন। কেউ আর জায়গা ছেড়ে যেতে চায় না। কোনও কারণে একজন দেশে ফিরে গেলে, সাথে সাথেই এক বা একাধিক প্রার্থী এসে হাজির হয় তার জায়গায়। পোর্সিয়া কাউকে চটাতে চান না, কিন্তু তার ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে যাবার জোগাড়। এরা কেউ পরীক্ষা দিতেও রাজি নয়। অথচ সবাইকে বলে দেওয়া হয়েছে বিয়ের ব্যাপারে পোর্সিয়ার কোনও নিজস্ব মতামত নেই। তারা প্ৰয়াত পিতা তিনটি বাক্স রেখে গিয়েছেন। বাক্সগুলির মধ্যে একটি সোনার, একটি রূপার এবং অবশিষ্টটি সিসার। যে কোনও পাণিপ্রার্থীই হোক, এই তিনটি বাক্সের সামনে হাজির হতে হবে তাকে। পাণিপ্রার্থী ব্যক্তিটি তার ইচ্ছেমতো যে কোনও একটি বাক্সর উপর হাত রাখবেন। তারপর সে বাক্স খোলা হবে। বাক্সের ভিতর থাকবে প্রার্থীর প্রার্থনার উত্তর। উত্তর সম্মতিসূচক হলে পোর্সিয়া তাকে বিয়ে করতে বাধ্য, নইলে নয়। পোর্সিয়ার পছন্দ অপছন্দের কোনও মূল্য দিয়ে যাননি তার পিতা। তার ভাগ্য নির্ধারণের ভার নির্ভর করছে বাক্সের লটারির উপর।
এ সব কথা জানা সত্ত্বেও বেলমন্টের প্রাসাদে ঠাই হয়ে বসে আছেন পাণিপ্রার্থীরা। তারা পরীক্ষাও দেবেন না বা প্রাসাদ ছেড়েও যাবেন না। এই নিয়ে পোর্সিয়ার সহচরী নোরিসা আজকাল বিদ্রুপ করতেও শুরু করেছে।
এ নিয়ে সেদিন কথায় কথায় পোর্সিয়াকে সে বলছিল, ঠাকুরানি! লটারির ঝামেলা না থেকে যদি ইচ্ছামতো পতি নির্বাচনের ক্ষমতা আপনার থাকত, তাহলে কার গলায় মালা দিতেন। আপনি? সে কি নেপলসের রাজা?
পোর্সিয়া তার শুভ্ৰ দাঁত দিয়ে ঠোঁট চেপে রেখে হাসি গোপন করার চেষ্টা করলেন। তা সত্ত্বেও তার চোখের কোন থেকে হাসির বিদ্যুৎ যেন ঠিকরে পড়তে লাগল। চটুল স্বরে তিনি উত্তর দিলেন, তা কি আর না দিয়ে পারি? কোথায় পাব এমন পাত্র? শুধু ঘোড়া আর ঘোড়া। ঘোড়া ছাড়া পৃথিবীর আর কিছুই চেনেন না নেপলসের রাজা। তার সবচেয়ে গর্বের বিষয় হল তিনি নিজে ঘোড়ার পায়ে নাল পরাতে পারেন। সুন্দরী নারী ছেড়ে একটা জুতসই ঘোটকীর সাথে বিয়ে হলেই ওর সুখের সম্ভাবনা বেশি।
এ কথা শুনে খিলখিল করে হেসে উঠল নোরিসা। তার হাসি যেন আর থামতেই চায় না। কোনও মতে হাসি চেপে রেখে সে বলল, বেশ তো, নেপলসের রাজা না হয়ে হোক জার্মানির প্যালটাইন কাউন্ট। এতে নিশ্চয়ই আপনার আপত্তি নেই?
বিরক্তির সাথে উত্তর দিল পোর্সিয়া, তাতে কী আর আপত্তি হতে পারে? সমস্ত অসন্তোষ যেন এসে বাসা বেঁধেছে। ওর মাথায়। সব সময় ভু কুঁচকেই আছে। এই বয়সেই যার এত মেজাজ, ভবিষ্যতে সে যে একজন হিরাক্লিয়াস হয়ে উঠবেন তা কে বলতে পারে। হিরাক্লিয়াসের কথা জানিস কি? তিনি হলেন সেই রাগী দার্শনিক, মুখে হাসি ফোঁটাটাও যাঁর কাছে অমার্জনীয় অপরাধ।
নকল দুশ্চিন্তার ভান করে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল নেরিসা, তাহলে আপনার তালিকা থেকে কাউন্ট প্যালতিনও বাতিল?
বাতিল বলে বাতিল? দৃঢ়স্বরে জবাব দিল পোর্সিয়া, আমি মড়ার মাথাকেও বিয়ে করতে রাজি আছি তবুও ওই কাউন্টকে নয়।
দারুণ বিতৃষ্ণায় কুঁচকে ওঠে পোর্সিয়ার ঠোঁট — মসিয়ঁ লী বন? না, তাকে বারণ করার উপায় নেই কারণ স্বয়ং ভগবান তাকে পাঠিয়েছেন মানুষের আকারে। কাউকে বিদ্রুপ করা উচিত নয় তা আমি মানি। কিন্তু ওরূপ লোক সম্পর্কে মাথা ঠান্ডা রেখে কথা বলা খুবই শক্ত। বানরের মতো অনুকরণপ্রিয় স্বভাব ওই লোকটির। ওর স্বভাবের অন্যতম বৈশিষ্ট্য যে যা করছে তা নকল করা। পাখি গান গাইছে, আমনি শুরু হয়ে গেল লী-বনের রাগিণী। রাস্তায় ছাগলছানা লাফাচ্ছে, আর তিনিও ঘরের ভিতর নাচতে শুরু করে দিলেন। পৃথিবীর এক আজব চিজ এই লী-বননেপলসের রাজার চেয়েও বেশি তার ঘোড়াপ্রীতি, কাউন্ট প্যােলাটাইনের চেয়েও বেশি ভূভঙ্গ বিলাসী তিনি। হাতে যখন কাজ থাকে না তখন আরশির সামনে নিজের ছায়ার সাথে যুদ্ধ করতে থাকেন তিনি। ব্যক্তিত্ব বলে লোকটার কিছু নেই। কখনও সে হচ্ছে জ্যাক, কখনও ডিক, কখনও জন বা হ্যারিস আবার কখনও বা ডেভিডের মতো। যত সব অনাসৃষ্টির ব্যাপার।
হতাশ হয়ে নেরিস বলল, তাহলে ওই ইংরাজ ভদ্রলোকটি যার নাম ককসব্রিজ!
পোর্সিয়া ঘাড় নেড়ে বললেন, না বাপু, উনি না জানেন ফরাসি না ইংরাজি না ইতালিয়ান। আমি আবার ওদিকে ইংরেজি বুঝিনে। তবে ভাষাগত অসুবিধে সত্ত্বেও বলতে হয় লোকটা ছবির মতো সুন্দর।
বিজয়গর্বে হেসে উঠে বলল নেরিসা, এবার তাহলে পথে আসুন।
বিরক্তির স্বরে বলল পোর্সিয়া, তাহলে আর কী? ছবি ছাড়া আর কিছু নয় লোকটা। দেয়ালে টাঙিয়ে রাখা ছাড়া ওকে দিয়ে আর কী কাজ হবে? হাত, পা, মুখ, চোখ — ওর সবই আছে, নেই শুধু প্ৰাণ!
আপনি বড়ো নিষ্ঠুর, ঠাকুরানি, বলল নেরিসা।
মোটেই না, জবাব দিল পোর্সিয়া, ওর না আছে প্ৰাণ, না আছে ব্যক্তিত্ব। ওর পোশাকটার দিকে চেয়ে দেখেছিস কখনও? দামি পোশাক তাতে কোনও সন্দেহ নেই। কিন্তু সহজেই অনুমান করা যায় জ্যাকেটটা কেনা হয়েছে ইতালি থেকে, পাজামাটা ফ্রান্স থেকে আর টুপিটা? আমার দৃঢ় বিশ্বাস জার্মানি ছাড়া আর কোথাও ওরূপ টুপি তৈরি হয় না।
