অসহিষ্ণভাবে আন্তনিও বললেন, পরিষ্কার করে বলো না বাপু, দলিলে কী লেখা হবে। তোমার প্যাচালো কথা-বার্তা শুনে আমার সন্দেহ তো বেড়েই যাচ্ছে।
শাইলক বলল, না, না, সন্দেহের কিছু নেই। এতে। সন্দেহ করলেই তো সব কাজ পণ্ড হয়ে যায়। দলিলে যা স্পষ্ট করে লিখতে হবে তা হল নির্দিষ্ট দিনে ধার শোধ দিতে অপারগ হলে আন্তনিওর শরীরের যে কোনও জায়গা থেকে এক পাউন্ড মাংস আমি কেটে নিতে পারব। তোমরা যখন ইহুদিকে পিশাচ বলেই মনে কর, তখন এরূপ একটা পৈশাচিক শর্তই দলিলে লেখা থাক।
চমকে উঠলেন ব্যাসানিও, না, এরূপ একটা শর্ত কিছুতেই দলিলে লেখা যাবে না। আমি কিছুতেই এমন দলিলে সই করতে দেবনা আন্তনিওকে।
ব্যাসানিওর কথায় ক্ষুন্ন হয়ে বলল শাইলক, আরে, আমি কি সত্যিই তোমার বন্ধুর দেহের মাংস কেটে নেব? এতে আমার লাভ? গোরু-শুয়োরের মাংস হলে না হয় খাওয়া যেত। মানুষের মাংস কুকুরকে দিলেও সে মুখ ফিরিয়ে নেবে। আসলে পরিহাসের ছলে তোমাদের মনোভাব পরীক্ষা করছিলাম আমি। দেখছি, বিনা সুদে টাকা ধার দিতে রাজি হয়েও তোমাদের মনের অবিশ্বাস দূর করতে পারিনি আমি। যাই হোক, তোমরা যখন আমায় বিশ্বাস কর না তখন কী দরকার আমার সাথে কাজ-কারবার করে।
কথাটা বলেই নিজের বাড়ির দিকে যাবার উপক্রম করল শাইলক। আন্তনিও তাকে ডেকে ফেরালেন। তিনি নিজেও কম আশ্চর্য হননি শাইলকের কথা শুনে, তবে ভয় পাবার পাত্র তিনি নন। সুযোগ পেলেই শাঁইলক যে দেহের মাংস কেটে নিয়ে তার মৃত্যু ঘটাবে এটা আন্তনিওর বদ্ধমূল ধারণা। তবুও তিনি ভয় না পেয়ে বোঝাতে লাগলেন ব্যাসানিওকে, এতে ভয় পাবার কী আছে? একথা ঠিকই যে অভিসন্ধি নিয়ে ঐ রূপ একটা শর্ত আরোপ করতে চাইছে লোকটি। কিন্তু তাতে আমাদের কিছু এসে যাবে না। দুমাসের মধ্যেই আমাদের জাহাজগুলি বন্দরে ফিরে আসবে —অবশ্য দলিলে লেখা থাকবে তিন মাস। তাহলে পুরো একমাস সময় হাতে থাকবে আমাদের। ওই সময়ের মধ্যে জিনিস বেচে তিনহাজার ডুকাট তো সামান্য ব্যাপার, লক্ষ ডুকাট জোগাড় করতে পারব আমি। বন্ধু, এ নিয়ে তুমি আর ভেব না।
ব্যাসানিওর আপত্তি সত্ত্বেও আন্তনিও শাইলককে বললেন তিনি তার শর্তেই টাকা ধার করতে রাজি আছেন। এরপর দু-বন্ধু উকিলের কাছে দলিল লেখাতে গেলেন। স্থির হল খানিকক্ষণ বাদেই শাইলক ওই উকিলের বাড়িতে গিয়ে টাকা দেবেন। আর দলিলটা নিয়ে আসবেন।
বাড়ির দিকে যেতে যেতে নিজ মনে বলতে লাগল শাইলক, এবার দেখা যাবে কে কুত্তা। আমার সমস্ত অপমানের প্রতিশোধ এবার কড়ায় গণ্ডায় বুঝে নেব।
০২.
শাইলকের কাছ থেকে টাকা পেয়ে মনের আনন্দে ব্যাসানিও লেগে পড়লেন বেলমন্ট যাত্রার আয়োজনে। শৌখিন পোশাক-আসাক তৈরি করালেন নিজের জন্য। সুন্দর দেখতে চাকর-খানসামা জোগাড় করা, যাত্রার আয়োজন করা — এরূপ নানা কাজ রয়েছে, অথচ বিন্দুমাত্র সময় নেই হাতে। এ সময়, ল্যান্সলেট নামক এক যুবক এসে একদিন রাস্তায় ধরল তাকে। লোকটি দেখতে সুন্দর, কথাবার্তায় চটপটে, রসিক এবং চঞ্চল। সে একসময় শাইলকের ভূত্য ছিল। কিন্তু সেখানে তার মন টেকেনি। ব্যাসানিও যদি তাকে একটা কাজের জোগাড় করে দেন, তাহলে সেই মুহূর্ত থেকেই সে কাজে যোগ দিতে রাজি।
ঠিক এ ধরনের লোকই এ মুহুর্তে প্রয়োজন ব্যাসানিওর। কাজেই ল্যান্সলিটকে কাজে নিতে তার কোনও আপত্তি থাকার কথা নয়। তবু তিনি জিজ্ঞেস করলে ল্যান্সলিটকে, দেখ বাপু,শাইলক ধনী আর আমি নিতান্তই গরিব। ওখান থেকে চলে এসে আমার কাজে কি তোমার মন বসবে। —এ কথাটা তোমার ভেবে দেখা উচিত। ল্যান্সলেট সাথে সাথেই জানাল শাইলকের বাড়িতে কাজ করার আর তার পক্ষে সম্ভব নয়। নিজের মেয়ের প্রতি যেরূপ জঘন্য আচরণ করছে শাইলেক, তাতে ভূত্য হয়েও নীরবে তা দেখতে রাজি নয়। ল্যান্সলট। বিশেষ করে সে জন্যই সে শাইলকের কাজ ছেড়ে দিতে চায়।
শেষমেশ ব্যাসানিও ওকে চাকরি দিলেন। অন্য ভৃত্যদের তুলনায় তার জন্য দামি পোশাকের ব্যবস্থা করে দিলেন ব্যাসানিও। এবার ল্যান্সলট গেল শাইলকের কাছে বিদায় নিতে। এইখ্রিস্টানটাকে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দিতে পারলে শাইলকও বেঁচে যায়। এদের দৌরাত্ম্যে ইহুদিদের পারিবারিক সম্পর্ক পর্যন্ত ক্ষুন্ন হবার জোগাড়।
আজকাল লোরেঞ্জো নামে এক খ্রিস্টান যুবক যাতায়াত শুরু করেছে শাইলকের বাড়িতে। তার উদ্দেশ্য শাইলকের মেয়ে জেসিকার সাথে পরিচয় করা। জেসিকা এক সুন্দরী তরুণী, তাছাড়া খ্রিস্টধর্মের প্রতি তিনি যথেষ্ট অনুরাগিণী। সে চেষ্টায় আছে পিতৃগৃহ ছেড়ে দিয়ে লোরেঞ্জোর সাথে চলে যাবার জন্য।
ধীরে ধীরে এগিয়ে এল ব্যাসানিওর বেলমন্ট যাত্রার দিন। ইতিমধ্যে একজন সঙ্গীও পেয়ে গেলেন তিনি। তিনি হলেন তার বন্ধুদের মধ্যে অন্যতম নাম গ্রাসিয়ানো। গ্রাসিয়ানোর কেমন যেন ধারণা হয়েছে। বেলমন্টের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িয়ে আছে তার ভবিষ্য জীবন।
ব্যাসানিওর কোনও আপত্তি নেই গ্রাসিয়ানোকে সাথে নিতে। তবে একটা বিষয়ে তাকে সাবধান করে দেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করলেন তিনি। তিনি গ্রাসিয়ানোকে বললেন, দেখ বন্ধু, তোমার রসিকতা বড়োই চটুল ধরনের। সেখানে গিয়ে যদি তুমি রসনা সংযত না কর, তাহলে আমিও কিছুটা খেলো হয়ে পড়ব তোমার সহচর হিসেবে। হয়তো এ কারণে আমার বিয়ের প্রস্তাবটাই তুচ্ছ হয়ে যাবে পোর্সিয়ার বিচারে।
